তসলিমা নাসরিন দিনকয়েক আগে দিল্লির বাড়িতে মেঝেয় পড়ে গিয়ে হাঁটুতে খুব আঘাত পান। গুরুতর সেই আঘাত। আঘাতের নিরাময়ের নামে প্রতারক চিকিৎসকরা তাঁকে ভুল বুঝিয়ে, তাঁর ‘টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট’ করে শারীরিকভাবে তাঁকে পঙ্গু করে দিয়েছে বলে তসলিমা তাঁর ফেসবুকে একটি দীর্ঘ লেখা গত ১৯ জানুয়ারি পোস্ট করেছেন। সেই পোস্টটি গত ২০ জানুয়ারি ‘প্রদর্শিকা’ পত্রিকার সম্পাদক নবীউল ইসলাম রি-পোস্ট করেন। সেই প্রসঙ্গে নবীউলের অনুরোধ মেনে গত ২১ জানুয়ারি এটি লিখেছি। নবীউল এটি তাঁর ফেবুওয়ালে পোস্ট করেন।
গত শতাব্দীর নব্বই-এর দশকের গোড়ার দিকে তাঁর ‘নির্বাচিত কলাম’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আপ্লুত হয়েছিলাম। তখন আমি কলেজছাত্র। বেশ বেশি বয়সেই। ছাত্রাবস্থায় গৃহশিক্ষকতা করার টাকায় সেই গ্রন্থটি কিনে আমার ছোট বোনকে উপহার দিয়েছিলাম। আমার বোন তখন সবে বিবাহিত। শরৎসাহিত্য ও মার্কসবাদ মুখস্থ করা এক দাদা বোনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবরদস্তি সেই বিয়ে দেন। তাঁর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তার হাতে বইটি দিয়েছিলাম। ওইটি পড়ার পরেই সুকুমারী ভট্টাচার্যের গবেষণাগ্রন্থ পড়ার তাগিদ অনুভব করি এবং পড়িও। ধর্মের নামে অধর্ম কীভাবে, কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পরোক্ষভাবে নারীকে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, সেই সব বিষয়ে জানতে আরও আগ্রহী করে তুলেছিল সুকুমারী ভট্টাচার্য ও তসলিমা নাসরিনের গ্রন্থদুটি।
মুসলমান মৌলবাদীদের না-পসন্দ গ্রন্থ লেখার ‘অপরাধ’-এ ১৯৯৪ সালে তসলিমাকে তাঁর স্বদেশ থেকে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে যেতে হয়। তারপর ৮-১০টা দেশে তাঁকে উদ্বাস্তু-যাযাবরের জীবন কাটাতে হয়েছে। অবশেষে কলকাতায় তাঁর সাময়িক থিতু জীবন। দ্বিখণ্ডিত লেখার ‘অপারাধে’ ২০০৭ সালে সাংস্কৃতিক শহর কলকাতাও তাঁকে আর ঠাঁই দেয়নি। তিনি এখন দিল্লির বাসিন্দা। অতিথি। এই হতদশার লেখকজীবন মুসলিম মৌলবাদের পীড়নে বরাবর জেরবার হয়েছে। ছিন্নমূল তসলিমার এই নিদারুণ জীবনযন্ত্রণার তাপ-উত্তাপ তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষেই কোনও ভাবেই অনুভব করা সম্ভব নয়। মদিনা-সনদের স্রষ্টা হজরত মহম্মদ প্রচারিত ‘সাম্য’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ মূল্যবোধের নিরিখে বলব নিজের মত প্রকাশের জন্য এমন দুঃসহ দুর্দিন যেন কখনও কোনও শত্রুরও না হয়। চাইব, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সর্বদা অক্ষুন্ন থাকুক। ভিন্নমতও প্রকাশিত হোক। ভুল, খণ্ডিত হোক, হোক যুক্তিতথ্য সমৃদ্ধ ঠিক কথার অভিঘাতে, তরবারিতে নয়। এই জগৎ-সংসারে কেউই তো অবাঞ্ছিত নয়।
পরে তসলিমার আরও লেখাপত্তর যত পড়েছি, বিভিন্ন বিষয়ে যত তাঁর মতামত জেনেছি, তত মনে হয়েছে সুকুমারী ভট্টাচার্য ও তসলিমা নাসরিন এক গোত্রের নন। তাঁদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক নয়। সুকুমারী সত্য অন্বেষণের তন্বিষ্ঠ সাধক। আর তসলিমা আসলে ‘কাশ্মীর ফইলস’ নামের সিনেমার স্রষ্টাদের দলনেত্রী গোত্রের মুখ। যত দিন গিয়েছে ততই বুঝেছি, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম শানিত করার নিষ্পাপ তাগিদের থেকেও, নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থেকেও, নিজেকে সেলিব্রিটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদগ্র লালসায় বিশ্বরাজনীতির নির্দিষ্ট ধর্মীয় ধূর্তামির বোড়েকে তিনি কৌশলে নিজের মতো করে, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। সেই তাড়নায় নিজের কলমকে কুশলী কায়দায় যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন। মুসলিম বিদ্বেষী মনুবাদী মোদী-শাহের কাছে প্রিয় থেকে প্রিয়তর হয়ে উঠতে আরও আরও সচেষ্ট থেকেছেন। এই দাবির পক্ষে মাত্র দু-একটি উদাহরণ দেব।

তিনি ২০০২ সালের ‘স্টেট স্পনসর্ড ‘গোধরা গণহত্যাকাণ্ডে সহস্রাধিক মুসলমানের খুনের কথা ভালো মতোই জানেন, চোখের সামনে সাড়ে তিন বছরের কন্যাসন্তান-সহ পরিবারের ১৭ জনকে খুন করার পর ১১ জন করসেবক মিলে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানোকে ধর্ষণ করে, সেই ঘটনাও তসলিমা যথেষ্ট জানেন, করোনার প্রাক্কালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দিল্লির মার্কেজ মসজিদে আগত তাবলিগ জামাতের তীর্থযাত্রীদের উপর রাষ্ট্রীয় বর্বরতার কথাও তিনি জানেন, পুলিশকে পাশে নিয়ে ‘গোলি মারো শালেকো গদ্দারোকো’ আওয়াজ তুলে দিল্লিতে এনআরসি বিরোধী জমায়েতের উপর গণহত্যার ঘটনা তিনি হাড়েহাড়ে জানেন, ফ্রিজে মাংস রাখার জন্য গণপ্রহারে আখলাকের খুন করার কথাও তিনি জানেন, ২০১৮ সালে ৮ বছরের বালিকা আসিফাকে কাশ্মীরের একটি মন্দিরের ভিতরে আটকে রেখে কয়েকদিন ধরে গণধর্ষণ করে মেরে ফেলার কথাও তিনি জানেন, অসম-কর্ণাটক-সহ বিভিন্ন রাজ্যে নিরপরাধ মুসলমানদের মাথার উপরের ছাদ বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়ার বীভৎস নিষ্ঠুরতার কথা তসলিমা ভালোই জানেন, ত্রিশূলে ভ্রূণ গেঁথে… থাক, মুসলিম মহিলার মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করার হুমকিও তিনি শুনেছেন, এমনতর হাজারো বীভৎসতা ও বর্বরতার কথা তসলিমা জানেন, পড়েন ও শোনেন। তবুও ‘কাশ্মীর ফাইলস’ দেখার পর সাংবাদিকের কাছে তাঁর ‘অবুঝ’ মনের সংশায়িত প্রতিক্রিয়া, “মুসলিমরা তাদের হিন্দু-বিদ্বেষ নিয়ে যত দূর যেতে পারে, হিন্দুরা তাদের মুসলিম-বিদ্বেষ নিয়ে তত দূর কি যেতে পারে?” তাঁর আরও উপলব্ধি, “হিন্দুরা ক’টা মুসলমান মেরেছিল। মুসলমানরা ক’টা হিন্দু মেরেছিল তার হিসেব আমার কাছে নেই। সব কিছুর পরেও গোপনে বিশ্বাস জন্ম নেয় যে হিন্দুরা মুসলিম নিধন করবে না।” (এলিনা দত্ত, EiSanay.com, 21.3.22) কোন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের আলোয় তাঁর এমন খচ্চর মার্কা বোধদয়?
দিল্লির নামী হাসপাতালে চিকিৎসার নামে তাঁর আজকের এই ঘোরতর দুর্দিনে সেই সব মর্মন্তুদ, দ্বিচারী ও নষ্ট প্রসঙ্গ থাক। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু শিবিরের আহত সৈনিকেরও উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। স্বাধীনতা মানে তাঁর মতে, কেবল তাঁর ক্ষেত্রেই যথেচ্ছ ও বিকৃত যৌনাচারের ছাড়পত্র লাভ করা কি না সেই বিষয়ে আলোচনা করার যথেচ্ছ সূত্র তিনি নিজেই ছড়িয়ে রেখেছেন। তবু সেই প্রসঙ্গও আজ থাক। বহুগামিতা ও যৌন যথেচ্ছাচারে মগ্ন থাকা কারও পক্ষে অন্যকারও একাধিক বৈবাহিক জীবনের দিকে আঙুল তোলার নৈতিক অধিকার থাকে কি না সেই জিজ্ঞাসাও আজ থাক। শিল্পরস সমৃদ্ধ সাহিত্য ও মতলবি প্রোপাগান্ডার মধ্যে দূরত্ব কত যোজন সেই প্রসঙ্গও আজ থাক। বয়সে নিজের থেকে বছর পনেরোর ছোটও কোনও নাবিকের সঙ্গে শয্যাসুখ প্রাপ্তিকে মোক্ষলাভ মনে করা ও সেই যৌনতৃপ্তির কথা সাতকাহন করে খবরের কাগজে লিখতে পারেন এমন কারও পক্ষে ১৪০০ বছর আগে কারও নাবালিকা বিয়ে করা সঙ্গত ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তোলা জায়েজ কি না সে কথাও আজ থাক। অথবা বলা ভালো, উপরে উল্লিখিত প্রতিটি প্রসঙ্গই কারও বিরুদ্ধে চলে গেলেও তাঁর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার কোনও ভাবেই ক্ষুন্ন হতে পারে না। কোনও মতেই কেড়ে নেওয়া যেতে পারে না।
শোনা যায়, মরণকালে মানুষের নাকি সত্যোপলব্ধি হয়। সেই বোধ থেকেই কী আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটির আজকের উপলব্ধি, “আমাকে বাংলাদেশি মুসলিম রোগী হিসাবে দেখা হয়েছে। যার কাছ থেকে প্রচুর টাকা নিয়ে অপারেশন করা হবে।” বলব, এটা তাঁর খণ্ডিত উপলব্ধি। তবে কী ফ্রয়েডিয় অবচেতনার কারণে তাঁর মননেও ‘সাম্প্রদায়িক’ বোধ বাসা বেধে আছে? একলহমায় তিনি কী করে নাস্তিক থেকে ‘মুসলিম’ হয়ে গেলেন? একদা ভগবানস্বরূপ এই ডাক্তাররা ৪০-৪৫ বছর আগে থেকেই নিজেদের কসাই-এ রূপান্তরিত করতে শুরু করেছিল। সাইলক বিদ্যায় আজ তারা চ্যাম্পিয়ন। যেমন উকিলবাবুরা আজ ডাকাত, টিচাররা আজ চিটার, সাংবাদিকরা আজ সাংঘাতিক। তবে ব্যতিক্রম আজও অনেক আছে। কিন্তু ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। বাংলাদেশি-ভারতীয় ও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই, ছুরিকাঁচি হাতেধরা ডাক্তার নামের কসাইদের কাছে মুরগি বৈ আর কিছুই নয়। বলিপ্রদত্ত পাঁঠা ও কুরবানির খাসি মাত্র। ওই সব কসাইদের হৃদয়ে দয়া নেই, মায়া নেই, শুশ্রূষা নেই, রোগমুক্তির আলোটুকুও নেই। তারা আজ টাকা কামাই-এর কর্পোরেট-কসাই মাত্র। আমার পেশাগত জীবনের ৩৫টি বছর জুড়ে তা প্রত্যক্ষ করেছি। এই কসাইরা চিকিৎসার নামে প্রতিদিন গরু, ছাগল, জমিজিরাত বিক্রি করতে বাধ্য করে অজস্র মানুষকে নিঃস্ব করে দিয়ে পথে বসিয়েছে। আজও তাই করছে।
তসলিমা কেবল লেখকই নন, কেবল আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটিই নন, তিনি নিজে ডাক্তার ও বিদ্বেষবিভক্ত মোদী-শাহের প্রয়োজন মতো রসদ যোগান দেওয়া ‘বুদ্ধিজীবী’ও বটে। সেই তসলিমাও আজ মুরগি? এটিই বড় অবাক করা কাণ্ড। এরকম বিপন্নতর পরিস্থিতিতে জাতীয় ক্রেতাসুরক্ষা আদালতে মামলা করাই একমাত্র পথ। সাংবাদিক চন্দ্রপ্রকাশ সরকার ফেসবুকে তাঁকে সেই সুপরামর্শ দিয়ে ঠিক কাজটাই করেছেন। এ রকম ক্ষেত্রে ক্রেতাসুরক্ষা আদালত উপযুক্ত জায়গা। এ কথা তাঁর মতো চিকিৎসক ও পোড়খাওয়া লেখক জানেন না, এমনটা কোনও নাদানও বিশ্বাস করবে না। তসলিমার দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে সেই বিষয়টি সচেতন ভাবে অনুল্লিখিত কেন? বোধগম্য নয়। চিকিৎসার নামে শারীরিকভাবে তাঁকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। ভারত রাষ্ট্রের অতিথি তসলিমার প্রতি ঘটে যাওয়া এই বীভৎস রকমের তঞ্চকতার বিরুদ্ধে, নির্মম শঠতার বিরুদ্ধে, এই ক্রিমিন্যাল অফেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মোদী-শাহ ও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। নইলে ‘মুসলিম নিধন’ না-করতে পারা ‘হিন্দু’দের প্রতি সমানুভূতিশীল বিদুষিণীর প্রতি অবিচার করা হবে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ মাঠে মারা যাবে। ভারতের নাগরিক হিসাবে ও একজন মানুষ হিসাবে তাই তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
চিকিৎসার নামে আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটির সঙ্গে ভারতের রাজধানীর চিকিৎসকদের একাংশের শেক্সপিয়ারের শাইলকসদৃশ নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও কোনও জাতীয় মিডিয়ায় আজও খবর না-হওয়াটাও বড় বিষ্ময় জাগায়। তাঁকে দু’ দু’ বার আনন্দ পুরস্কার দেওয়া প্রকাশনা সংস্থার পত্রিকাতে ও চ্যানেলে চিকিৎসা পরিষেবার নামে এমন প্রতারণা, এমন ক্রিমিন্যাল অফেন্সের খবর না হওয়ায় কারও মনে কোনও রকম সংশয় জাগলে তা অমূলক হবে না আশাকরি। এ কারণে, প্রচারের আলোয় ভেসে থাকার অতিপরিচিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার এটিও একটি প্রকরণ বলে কেউ ভুল করলে তাঁকে একলহমায় দুরছাই বলে বিদায় দেওয়াও যাবে না নিশ্চয়।
দ্রষ্টব্য : অনল আবেদিন প্রবীণ সাংবাদিক। ২০ জানুয়ারি ‘প্রদর্শিকা’ পত্রিকার সম্পাদক নবীউল ইসলাম-এর তসলিমা নাসরিন সংক্রান্ত একটি পোস্টে তিনি দীর্ঘ একটি মূল্যবান মন্তব্য করেছিলেন। নবীউল ইসলাম তাঁকে অনুরোধ করেন মন্তব্যটি আর কিছুটা বিস্তৃত করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ হতে পারে। তাঁর অনুরোধে অনল আবেদিন এই নিবন্ধটি লিখে পাঠিয়েছেন।