জাতকের এই কাহিনীটা একটা বাঘকে নিয়ে। একদা মহাসত্য তার ভাইকে নিয়ে পাহাড় পথ দিয়ে যাবার সময় কঙ্কালসর্বস্ব এক বাঘিনীকে দেখলেন। খাদ্যের অভাবে বাঘিনী তার দুই বাচ্ছাকে খেয়ে ফেলার উপক্রম করছে, সেই দেখে মহাসত্য নিজেকে সমর্পণ করলো বাঘিনীর কাছে। কিন্তু বাঘিনী এতটাই দূর্বল ছিলো যে তাকে খাওয়ায় মতোও শক্তি ছিলোনা। তখন মহাসত্য তার নিজের শরীর ফুটো করে রক্ত খাইয়ে বাঘিনীর শরীরে শক্তি সঞ্চার করে। তারপর তাঁর শরীর ভক্ষণ করলো। এই মহাসত্যই বোধিসত্ত্ব রূপে ধরাধামে পুনর্জন্ম লাভ করেন।
জাতকের প্রতিটি কাহিনীতে একটি নৈতিক মূল্যবোধ থাকে। নিজেকে বাঘের কাছে সমর্পণ করা বাস্তব সন্মত নয় কিন্ত বাঘেদের স্বাভাবিক জীবনধারণের অধিকার দেওয়া আমদের কর্তব্য। চারপেয়েদের খাদ্য আর নগর সভ্যতার অগ্রাসনে বাসস্থানের জন্য জঙ্গল এখন দখল করছে দুপেয়েরা। কৃষি, শিল্প ইত্যাদির মতো বিভিন্ন কারণে বন উজাড় করে বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের প্রায় ৯৩% ক্ষতি হয়েছে।

যে জঙ্গলে ওরা বড়ো হতো, থাকতো, ছুটতো, শিকার করতো সহজেই, সেই জঙ্গলই ওদের বাসভূমির অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মানুষ নিজের স্বার্থে পৃথিবীটাকে ক্রমশঃ দূষিত করে তুলছে। প্রত্যাশা করছে, এখানে থাকতে গেলে সবাইকে আমাদের মতো করেই বাঁচতে হবে। এইভাবে চলতে থাকলে, ক্রমশ এমন এক রুক্ষ পৃথিবী তৈরি হবে, যেখানে আমরাই কখন বিলুপ্ত হয়ে যাবো নিজেরাই বুঝতে পারবো না।
ইতিহাসের সরণি বেয়ে যদি পিছনপানে যেতে থাকি তাহলে দেখা যাবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে দার্জিলিং, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, মালদা জেলায় বাঘের দেখা মিলতো। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টোপ’ গল্পটা মনে পড়ে, যেখানে রাজবাহাদুর একটি জীবন্ত শিশুকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করেছিলো শিকারের জন্য। প্রাচীণ ভারতের রাজাবাদশাদের শিকার বিলাসের অত্যাচারে প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছিলো বেড়ালের জাতভাইয়েরা। স্বাধীনতার পর কোনক্রমে রক্ষা পায় এদের বংশধরেরা।

দার্জিলিং জীবতত্ত্ব জাদুঘরের ইতিহাস ঘাঁটলে ব্রিটিশ আমলে সাহেবেরা কটা বাঘ মেরেছে তার কথা জানা যায়। বক্সা টাইগার রিজার্ভে সাম্প্রতিক বাঘের পায়ের ছাপ, বিষ্ঠা পাওয়া গেছে। নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে বাঘের দেখা মিলেছে। মহানন্দা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, জলদাপাড়া বা গরুমারার জঙ্গলে হাতি, ভারতীয় বাইসন, সম্বর বা চিতল হরিণ, গাউর সবই আছে। বাঘ নেই কেন, সেই বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের শুরু করা দরকার।
বাঘ আর মানুষের সহাবস্থানের কথা বললে, বলতে হয় সুন্দরবনের কথা। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন হলো একমাত্র বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল যেখানে বাঘ পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষায় সুন্দরবনে প্রায় ৯৬টি বাঘের সন্ধান মিলেছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বনদপ্তর ও সুন্দরবন উন্নয়ন বিভাগ সক্রিয়ভাবে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন সংক্রান্ত কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাঘ পর্যটন নিয়ে কিছু স্থানীয় অধিবাসীরা ভালো কাজ করছেন।
জুন থেকে আগস্ট মাস বাঘের প্রজনন সময়। তাই, বাঘের প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি-সহ অবাধ চলাচলের জন্য গোটা সুন্দরবনের অর্ধেকের বেশি বন সংরক্ষিত ঘোষনা করা হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং।

কিছু চীনা ওষুধের জন্য, বাঘের শরীরের প্রতিটি অংশের চাহিদা থাকায় বাঘ শিকারিদের সম্মুখীন হয়। অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসায় তারা চড়া দাম রাখে।
নানারকম রোগে মারা যায় বেশ কিছু বাঘ এবং তাদের মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করার সঠিক কোন উপায় নেই। কিছু কিছু রোগ মহামারী ছড়ায় যেমন ফেলাইন প্যানলিউকোপানিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদি। সুরক্ষা পরিকাঠামোর অভাব, দিনে দিনে পর্যটন বৃদ্ধিও বাঘের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
প্রতিবছর বাঘের হামলায় সাধারণ কিছু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তা সত্ত্বেও সাংঘাতিক গোছের বিদ্বেষ প্রদর্শন করেননি গ্রামের বাসিন্দারা। যাঁরা জঙ্গলের পাশে থাকেন, তাদের কথা সবার আগে ভাবা দরকার। সুন্দরবনের বাঘ বাঁচানোর জন্য রাজ্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। তাই সুন্দরবনে বাঘ এবং বাঘের আবাসের
সংরক্ষণ অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজ।

আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস। ২০১০ সালে, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বাঘ সম্মেলনে প্রতিবছর এই দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল-সহ ১৩টি দেশে বাঘের ঘনত্ব বেশি থাকায় এসব দেশে গুরুত্ব সহকারে দিবসটি পালন করা হয়।
বাংলা রূপকথার ও লোককাহিনীর একটি বড়ো অংশ জুড়ে বাঘের অবস্থান শুধু নয়, জঙ্গলময় বাংলার জীবনে নিকট আত্মীয় তিনি। তাইতো মধুর সম্ভাষণে ডাকা হয় “বাঘমামা”। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সেই আদিকাল থেকে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভয়ে স্মরন করে চলেছে এদের মানবজাতি। হলুদ-কালো ডোরাকাটা দাগের এই বঙ্গ শার্দুলের গতির দিকে তাকালেই বলা যায়, “তোমার উপমা তুমিই বাঘমামা।”
তথ্যঋণ: ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড ইন্ডিয়ার বন্যপ্রাণী বিভাগের নির্দেশক দীপঙ্কর ঘোষের তথ্য ও সম্পর্কিত বিভিন্ন জার্নাল।
খুব ভালো প্রতিবেদন।
Dhonyobad ????
একটি সুন্দর প্রতিবেদন। ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ আপনাকে ????
Great
Necessity
থ্যাংক ইউ মামা????