করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের জেরে দেশের উৎপাদন শিল্প থেকে অর্থনীতি-সব ক্ষেত্রেই ধ্বস নেমেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন, বহু ছোট ও মাঝারি মাপের সংস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যারা ধুকতে ধুকতে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রেখেছে তারাও আর বেশি দিন টিকে থাকবে না। গোটা দেশের এই পরিস্থিতির পাশে এ রাজ্যের উত্তরপ্রান্তের চিত্রেও কোনও ভিন্নতা নেই। গোটা উত্তরবঙ্গের একমাত্র অর্থনীতি নির্ভর করে যে শিল্প তথা কৃষিশিল্পের উপর সেই চা শিল্প বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টানা লকডাউনে।
সাধারণত পাহাড় বা দার্জিলিঙের চা বাগানগুলিতে ফার্স্ট ফ্ল্যাশের চা তোলার কাজ শেষ হয় মার্চ মাসের শুরুর দিকে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নিলামের মাধ্যমে সেই চা বিদেশে রফতানি হয়, বিশেষত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু গত বছর করোনা ও লকডাউনের কারণে ওই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ভিসা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞায় জাপান ও ইউরোপের দেশগুলি থেকে নিলামে যোগ দিতে পারেনি ক্রেতারা। এমনকী করোনা সংক্রামিত দেশগুলিতে বিমান পরিষেবা বন্ধ থাকায় যথেষ্ট পরিমানে দার্জিলিঙের চা রফতানি করা যায় নি। তখন থেকেই উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। এবারও একই সময় লকডাউন থাকায় ক্ষতি দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে।
প্রসঙ্গত, দার্জিলিংয়ের মোট উৎপাদিত চায়ের ২০ শতাংশই ফার্স্ট ফ্ল্যাশের। গুণমানেও এই চা সেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দামও অনেক বেশি। মরসুমের প্রথম এই পাতা থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ আয় করেন বাগান মালিকরা। কিন্তু করোনার প্রভাবে দার্জিলিঙের প্রথম মরসুমের চা নিলাম না হওয়ায় দাম অনেক পড়ে যায়। এরপর যোগাযোগ ব্যবস্থা গত বছর এবং এ বছর বন্ধ থাকার কারণে দার্জিলিং চা-এর রপ্তানির পরিমাণও খুব কম। ফলে চায়ের ভাল দামও মেলে নি। সব মিলিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গের চা শিল্প।
চা মরসুমের প্রথম যে পাতা থেকে বাগান মালিকরা প্রায় ৪০ শতাংশ রোজগার করেন, দেশ-বিদেশে সেই চা-পাতা খুবই জনপ্রিয়। তার চাহিদাও তুঙ্গে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের জেরে গবত বছর এবং এ বছর বাগান থেকে সব পাতা তোলা যায় নি। অনেক পাতা বাগানে পড়ে নষ্ট হয়েছে। ফলে বড়সড় ক্ষতি হয়েছে বাগান মালিকদের।
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে এখনও ৮৭টি বাগান সচল রয়েছে। মরশুমের প্রথম বিক্রি বাটার উপরেই নির্ভর করে ৮৭টি চা বাগানে কর্মরত ৫৫,০০০ স্থায়ী শ্রমিকের বছরভর গ্রাসাচ্ছাদন। যদিও অনেক কষ্টে ওই সব চা বাগানগুলির মধ্যে বহু চা বাগানের মালিকরা তাদের শ্রমিকদের বকেয়া ঠিকভাবে মেটাতে পেরেছেন। কিন্তু এখন চালু, অচল, বন্ধ-সব চা বাগানের হাল প্রায় একই রকম। লকডাউন বিধির জেরে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি শ্রমিক কাজ করতে পারছেন না। ফলে, চা গাছগুলি উপযুক্ত যত্ন পাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই, লকডাউন উঠে যাওয়ার পরও স্বাভাবিক ছন্দে বাগান চালু হলে উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলির কর্মকর্তারা।
এদিকে, গত বছর লুপার নামে পোকার আক্রমণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চা গাছের পাতাগুলি। অন্যদিকে, মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ শ্রমিক কাজ করার জন্য রোগ পোকা আটকাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় নি। চালু চা বাগানগুলির চেয়ে বন্ধ চা বাগানগুলিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক কারণেই খারাপ বরাবরই। এছাড়া, বন্ধ চা বাগানগুলির শ্রমিকরা পাতা তুলে বিক্রি করলেও মূলত আর্থিক সঙ্গতির অভাবেই সাধারণত খোলা চা বাগানের মতো গাছগুলির যত্নআত্তি করতে পারেন না। তবুও পিক সিজনে পাতা বিক্রি করে কিছুটা হলেও আর্থিক লাভ করেন বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক কর্মচারিরাও। কিন্তু লকডাউনের জেরে ভীষণভাবে বিপাকে পড়েছেন তাঁরাও। তবে লকডাউনের মধ্যেও তাঁরা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন চা বাগানকে। পঞ্চাশ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেও চেষ্টা করছেন যতটা সম্ভব চা গাছগুলির পরিচর্যা করার।
মার্চ এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি ভালো পাতা পাওয়া যায়। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই লকডাউনের খাঁড়া নেমে এসেছে। তার ওপর বাগানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পোকা। লকডাউনের জেরে বর্তমানে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি শ্রমিক কোথাও কাজ করতে পারছেন না। তাই, গাছগুলির যত্নআত্তি করা যাচ্ছে না। লকডাউন উঠলেও ব্যাপক আর্থিক আর্থিক ক্ষতি পূরণ করতে লেগে যাবে অনেকটা সময়। তখন সব বাগানের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো হয়ত সম্ভব হবে না।
করোনার কারণে বদলে যাচ্ছে চা বাগানগুলির স্বাভাবিক সমাজ জীবন। যার বড় প্রভাব পড়েছে বাংলার চা শিল্পে। দিশাহীন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে লাভজনক এই শিল্প। লকডাউনের কারণে চা বাগান থেকে শুরু করে চা ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখোমুখি। উৎপাদন এবং সরাবরহ সবেতেই দেখা দিয়েছে প্রবল প্রতিকূলতা। এই বিষয়ে চা ব্যাবসায়ীদের ব্যাখ্যা, লকডাউনের কারণে বাগানগুলিতে অর্ধেক কর্মী কাজ করছে। যার কারণে চা পাতা সংগ্রহ কমে গিয়েছে। উপযুক্ত সময়ে পাতা সংগ্রহ এবং তা থেকে চা তৈরি না হওয়ার কারণে চায়ের গুণগত মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা ৫০ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করতে পারছেন না। তাঁদের কথায়, ৫০ শতাংশ কর্মী দুই শিফটে কাজ করলে উৎপাদন অনেক ভালো হবে। তাদের আশঙ্কা; চা শিল্পের জন্য ভবিষ্যতে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে চলেছে। কারণ কাজ হচ্ছে ধীর গতিতে। দেশীয় বাজারে চাহিদা কমে গিয়েছে। লকডাউনের কারণে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না সরবারহ করার জন্য। অনেক পাতা এবং চা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে গোটা উত্তরবঙ্গে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ চা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছেন আরও অনেকেই। তরাই ডুয়ার্স মিলিয়ে বড় বাগানের সংখ্যা প্রায় ৩৫২টি। অসংখ্য ছোট বাগান রয়েছে উত্তরবঙ্গ জুড়ে। লোকসানের মাশুল গুনতে হলেও চা বাগান মালিক এবং ব্যবসায়ীরা করোনা ঠেকাতে রাজ্য সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা একেবারে যথাযথ বলে স্বীকার করছেন। কিন্তু আগামী দিন কি হবে সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
রাজ্যের নানা জায়গার কথ পাওয়া যায়, চা-শিল্পের মতো এত বড় একটা ক্ষেত্র বাদ পড়ে থাকে। বিস্তারিত জানা গেল।
ধন্যবাদ।
আমার গবেষণা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে। একটি বড় অংশ জুড়ে চা শিল্পের কথা.
একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে অলস বাঙালি মালিক (ক্রমে অবাঙালির হাতে মালিকানা চলে গেছে) ও নোংরা রাজনীতি শেষ করে দিচ্ছে ।
Empirical research. তৎকালীন উত্তরবঙ্গের 5 টি জেলার PS লেভেলে অনুসন্ধান করতে হয়েছে.
এক মূল্যবান বিষয়ে লিখেছেন,ধন্যবাদ