কে এই যদুনাথ সিংহ? (১৮৯২-১৯৭৮)
যে যদুনাথ সিংহ রাধাকৃষ্ণানের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর কথা একটু বলে নেওয়া যাক। সেখানে অনেক সমস্যা। রাধাকৃষ্ণান বিখ্যাত মানুষ। ক্ষমতাবান। এ কালে ক্ষমতার উৎস রাজনীতি। অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। সুতরাং তাঁর জীবনী বা তাঁর সম্পর্কে লেখা বহু বই আছে। রাধাকৃষ্ণানের পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। কিন্তু যদুনাথ তেমন সৌভাগ্যবান নন। আমি তাঁর কোন জীবনীগ্রন্থ খুঁজে পাই নি। খুঁজে পাই নি তাঁর সম্পর্কে লেখা কোন বই। তাঁর সম্পর্কে কিছু কিছু প্রবন্ধ আছে, আকার-আয়তনে সেগুলি খুবই ক্ষীণকায়। উইকিপিডিয়া, উৎপল আইচ ও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটি প্রবন্ধ এবং যদুনাথের ডায়েরি (যা এখনও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় নি) অবলম্বনে আমি যদুনাথ সিংহের কিছু পরিচয় দেবার চেষ্টা করছি।
বীরভূম জেলার কুরুমগ্রামে ১৮৭৮ সালের ১০ আগস্ট এক শাক্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যদুনাথ। তাঁর প্রপিতামহ কাশীনাথ সংসার ত্যাগ করে শাক্তপীঠ তারাপীঠে বাস করতেন। [পরে তিনি হিমালয়ে চলে যান। যখন যদুনাথের বয়েস মাত্র পাঁচ বছর তখন মৃত্যু হয় তাঁর পিতার। তিনি মানুষ হন এক যৌথ পরিবারে। সে পরিবারে ছিলেন তাঁর মা, পিতামহ, বড়দার স্ত্রী, দুই কাকা, দুই কাকিমা। যদুনাথের ছোটকাকা ছিলেন তাঁর বন্ধু ও রক্ষাকর্তা। শিবমন্ত্রে পরিবারের সকলে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁরা খুব সকালে উঠতেন, পিতামহের শিবমূর্তির জন্য ফুল সংগ্রহ করতেন, পিতামহ অসুস্থ হলে কেউ-না-কেউ শিবপুজোর ভার নিতেন। ছোটবেলায় কলেরা, টাইফয়েড, আমাশায় ভুগেছেন যদুনাথ। ১৯১১ সালে সুনীতিমঞ্জরিদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
স্কুলে খুবই উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন তিনি। স্কুলে থাকাকালীন অংশগ্রহণ করেন স্বদেশি আন্দোলনে। রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি তাঁর মধ্যে ধর্মীয় চেতনারও উন্মেষ হয়। শাক্ত সাধক বামাক্ষেপার সঙ্গে তাঁর একাধিক বার দেখা ও আলোচনা হয়। তাঁর জীবনে এই সাধকের গভীর প্রভাব। এই বামাক্ষেপা সম্পর্কে তিনি পরবর্তীকালে তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন —
“আমরা সকাল দশটায় তারপীঠে পৌঁছালাম। দ্বারকা নদীতে স্নান করে তারামার পুজো করে প্রসাদ গ্রহণ করলাম। বামাক্ষেপার দুটি মূর্তি দেখলাম; তাঁর জীবিত থাকাকালীন আমি তিনবার তাঁর দর্শন লাভ করেছি। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যা কিছু ভালো কাজ আমি করেছি, তা তাঁরই প্রভাবে। তাঁরই কৃপায় আমি বিশ্বমাতাকে নিজের ভেতর ও বাইরে দেখতে পেয়েছি। ভণ্ড সাধুদের হাত থেকে তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে আমি স্পষ্টভাবে মা তারার বাণী শুনেছি। এক অপূর্ব স্বর্গীয় চেতনায় ভরে গেছে আমার মন।”
বামাক্ষেপার আর একটি অলৌকিক কাহিনি যদুনাথের ডায়েরিতে আছে। ১৯৩৩ সালে তাঁর স্ত্রীকে ডাক্তার মৃত বলে ঘোষণা করেন। ডেথ সার্টিফিকেটও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তখন মিরাটে থাকতেন তাঁরা। মৃতদেহ পড়ে আছে প্রায় ৬ ঘন্টা। শবদাহের আয়োজন শুরু হচ্ছে। মৃতদেহের কাছে আছে পুত্র অমিয়কুমার সিংহ আর এক বন্ধু জ্যোর্তিময় ব্যানার্জী। এই দুজন হঠাৎ দেখলেন সুনীতির শরীরের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন বামাক্ষেপা, তাঁর ডানহাতটি বরাভয় দিচ্ছে। অমিয়রা বামাক্ষেপাকে প্রণাম করেন। একটু পরে সুনীতির কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তিনি বলছিলেন, ‘কি হয়েছে আমার?’ এর পরে সুনীতি আরও ২৩ বছর বেঁচেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৫৬ সালে।
স্ত্রীর মৃত্যুর এক বছর বাদে, ১৯৫৭ সালে, প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে কি হয়েছিল সে সম্পর্কে ডায়েরিতে যদুনাথ লিখেছেন —
“গোবর্ধন মুখার্জী কীর্তন গান করছিলেন। বড় মধুর গান। আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। আমার মনে হল এই কীর্তন গানে আমার স্ত্রীর আত্মা শান্তি লাভ করল।”
যদুনাথ ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স সহ বি এ পাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি ফিলিপ স্যামুয়েল স্মিথ ও ক্লিন্ট মেমোরিয়েল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এম এ পাশ করেন। তারপর তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য আবেদন করেন ১৯২২ সালে। যে বিষয়ে তিনি এই বৃ্ত্তির জন্য আবেদন করেছিলেন, তার বেশ কিছু অংশ মিরাট কলেজের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই বৃত্তির গবেষণাপত্রের কাজ শেষ হয় ১৯২৫ সালে। ১৯২৩ সালে তিনি ‘মৌয়াট’ পদক পান আর ১৯২৫ সালে পান ‘গ্রিফিত’ পুরস্কার। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ও ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানকে। ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হলে পরীক্ষক হিসেবে তাঁর স্থলাভিযিক্ত হন অধ্যাপক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি লাভ করেন ডক্টর উপাধি।
অধ্যাপক হিসেবে যদুনাথের জনপ্রিয়তা ছিল। তার একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। এম এ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই কলকাতার রিপন কলেজ তাঁকে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করে। এই সময়ে তিনি দর্শন, মনস্তত্ত্ব বিষয়ে বহু প্রবন্ধ রচনা করেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজেও তিনি কিছুকাল অধ্যাপনা করেন। শেষে তিনি চলে আসেন মিরাট কলেজে। যদুনাথ সিংহ অন্তত ৪০টি গ্রন্থের লেখক; এ ছাড়া পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তাঁর অজস্র প্রবন্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে : ইণ্ডিয়ান সাইকোলজি পারসেপশন (১৯৩৪), আ ম্যানুয়েল অব এথিক্স (১৯৬২), ইণ্ডিয়ান সাইকোলজি (১৯৩৪), আ হিস্ট্রি অব ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি (১ম খণ্ড, ১৯৫৬), আ হিস্ট্রি অব ঈণ্ডিয়ান ফিলোজফি (২য় খণ্ড,), আউটলাইন অব ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি (১৯৯৮)।
অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ
১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় রাধাকৃষ্ণানের ‘ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি’র ২য় খণ্ড। সম্ভবত এই বইটি যদুনাথের দৃষ্টিগোচর হয় নি। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হল রাধাকৃষ্ণানের ‘দ্য বেদান্ত অ্যাকডিং টু শংকর অ্যান্ড রামানুজ’। এই বই আসলে ছিল ‘ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি’র ২য় খণ্ডের ৮ম ও ৯ম অধ্যায়ের সংকলন। যদুনাথের দৃষ্টিগোচর হল এই বই। তিনি দেখতে পেলেন রাধাকৃষ্ণান তাঁর গবেষণাপত্রের প্রথম দুইটি অধ্যায় থেকে অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেছেন। না, কোনরকম স্বীকৃতি নেই তাঁর বই-এর। (আগামীকাল)