এর একটা প্রতিকার করা দরকার।
এই প্লেজিয়ারিজমের ব্যাপারটি সম্বন্ধে মানুষকে অবহিত করা দরকার। তাই তিনি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য চিঠি লিখতে বসলেন। কিন্তু কোন পত্রিকা? মনে পড়ল রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘মডার্ন রিভিউ’র কথা। একজন দক্ষিণ ভারতীয়কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করার ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেন নি তখনকার বেশ কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবী। সম্ভবত রামানন্দ ছিলেন তাঁদেরই একজন। রাধাকৃষ্ণানের বই সম্বন্ধে ‘মডার্ন রিভিউ’তে সমালোচনা করেই যাচ্ছিলেন রামানন্দ। বলছিলেন এই বইতে যথোপযুক্ত রেফারেন্স নেই, লেখকের ইংরেজিও ত্রুটিপূর্ণ, বাংলা ও বাঙালি সম্বন্ধে তাঁর অজ্ঞতা স্পষ্ট, সংস্কৃত ভাষার জ্ঞানের অভাব ইত্যাদি।
যদুনাথ তাই ১৯২৮ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রতিবাদপত্র পাঠালেন ‘মডার্ন রিভিউ’তে। পত্রটি প্রকাশিত হল ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসে। এর পর ওই সালের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে যদুনাথের আরও তিনটি চিঠি সেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রাধাকৃষ্ণানেরও দুটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল ‘মডার্ন রিভিউ’তে। যদুনাথের বিরুদ্ধে রাধাকৃষ্ণান চুরির অভিযোগ করে বলেন যে তাঁর নানা বক্তৃতা ও ক্লাশনোট থেকে চুরি করে যদুনাথ তাঁর গবেযণাপত্র তৈরি করেছেন।
পত্রিকায় চিঠি পাঠিয়ে চুপ করে যান নি যদুনাথ। ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসে তিনি উচ্চ ন্যায়ালয়ে রাধাকৃষ্ণানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগ : স্বত্বাধিকার লঙ্ঘন। তাঁর দাবি ছিল :
ক] ক্ষতিপূরণবাবদ ২০ হাজার টাকা দিতে হবে।
খ] অবিক্রিত বইগুলি তাঁর হাতে তুলে দিতে হবে।
গ] নতুন করে বই ছাপা হলে হয় যদুনাথের বই-এর অংশগুলি বাদ দিতে হবে।
উচ্চ ন্যায়ালয়ে যদুনাথের এই মামলা ছিল সেকালের ‘গরম খবর’ বা একালের ভাষায় ‘ব্রেকিং নিউজ। ‘বঙ্গবাণী’, ‘বসুমতী’, ‘দ্য হিন্দুস্থান টাইমস’, ‘দ্য পাইওনিয়ার’, ‘দ্য লিবার্টি’, ‘দ্য লিডার’ পত্রিকায় এই ‘গরম খাবর’ প্রকাশিত হচ্ছিল।
যদুনাথের মামলার উত্তরে রাধাকৃষ্ণানও ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর উচ্চ ন্যায়ালয়ে মামলা করলেন মানহানির; সে মামলায় যদুনাথের সঙ্গে জুড়ে দিলেন ‘মডার্ন রিভিউ’র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে। ক্ষতিপূরণ দাবি করলেন ১ লক্ষ টাকা।
মামলা চলেছিল ৪ বছর — ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত। সে মামলার বিবরণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু মামলা চলাকালীন, ১৯৩১ সালে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে রাধাকৃষ্ণান সেখানে চলে যান। এখানে তাঁর হয়ে কে মামলায় দাঁড়িয়েছিলেন, তাও আমাদের অজানা।
কে ঠিক, কে বেঠিক : বিচার ও প্রশ্ন
১] রাধাকৃষ্ণান যে তাঁর লেখা থেকে চুরি করেছিলেন, যদুনাথ ‘মডার্ন রিভিউ’র চিঠিতে অনুচ্ছেদ তুলে তার প্রমাণ দিয়েছিলেন। রাধাকৃষ্ণান প্রথমে বলেন দর্শনের মতো বিষয়ে পারিভাষিক শব্দের মিল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু যে পারিভাষিক শব্দ নয়, বাক্যে-বাক্যে, অনুচ্ছেদে-অনুচ্ছেদে মিলের ব্যাপারে কোন কথা বলেন নি।
২] আত্মপক্ষ সমর্থনে রাধাকৃষ্ণান বলেন যে যদুনাথ তাঁর বক্তৃতা ও ক্লাশনোট থেকে চুরি করে গবেষণাপত্র লেখেন। কিন্তু কোন প্রমাণ তিনি দেখান নি। তাছাড়া, রাধাকৃষ্ণান যদুনাথের গবেষণার পরীক্ষক ছিলেন, গবেষণাপত্র পড়ে কি তিনি যদুনাথের চুরি দেখতে পান নি? যদি দেখে থাকেন, তাহলে তখন কেন বলেন নি? যদুনাথ অভিযোগ করার পরই তিনি যদুনাথের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেন। যদুনাথ চুরি করেছেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলে তিনি আগেই প্লেজিয়াজিমের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যেতে পারতেন।
৩] রাধাকৃষ্ণান যে যদুনাথের লেখা থেকে চুরি করেছেন তার আর একটা প্রমাণ রাধাকৃষ্ণানের বইটি পরে প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে রাধাকৃষ্ণানের প্রকাশক অধ্যাপক মুয়ারহেড জানিয়েছেন যে রাধাকৃষ্ণান তাঁর পাণ্ডুলিপি ১৯২৪ সালে পাঠিয়েছিলেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার জন্য ৩ বছর পরে প্রকাশিত হয়। এটাকে সত্য বলে মেনে নিলেও প্রশ্ন থাকে যদুনাথের লেখাগুলি মিরাট কলেজের পত্রিকায় ১৯২২/২৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং রাধাকৃষ্ণান সেই লেখাই ব্যবহার করেন।
৪] নলিনী গাঙ্গুলী জানিয়েছেন যে রাধাকৃষ্ণান ১৯২২ সালে তাঁকে কিছু নোট (যা তাঁর ‘ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি’র ২য় খণ্ডে আছে) দিয়েছিলেন, তা জানিয়ে তিনি ‘মডার্ন রিভিউ’তে একটি চিঠি পাঠান কিন্তু সম্পাদক সে চিঠি প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন। পরে সে চিঠি ১৯২৯ সালে ‘দ্য ক্যালকাটা রিভিউ’তে প্রকাশিত হয়। এখানে প্রশ্ন : চিঠি ছাপার ব্যাপারে সম্পাদকের অস্বীকৃতির প্রমাণ কি পেশ করা হয়েছিল? যে চিঠি তিনি ‘মডার্ন রিভিউ’তে পাঠিয়েছিলেন, সেই একই চিঠি যে ‘দ্য ক্যালকাটা রিভিউ’তে প্রকাশিত হয়, তার প্রমাণ কি?
৫] গঙ্গানাথ ঝা-এর লেখা থেকে যদুনাথ চুরি করেন বলে রাধাকৃষ্ণান যে অভিযোগ করেন তার প্রমাণ কিন্তু দেওয়া হয় নি। গঙ্গানাথ ঝাও তেমন কিছু লেখেন নি।
কেন পিছু হটলেন যদুনাথ?
১৯২৯ সালে থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত মামলা চলেছিল। তারপরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হস্তক্ষেপে আদালতের বাইরে মামলার নিষ্পত্তি হয়। অ্যাক্টিং চিফ জাস্টিস ফণীভূষণ চক্রবর্তীর সামনে একটি ডিক্রির মাধ্যমে মামলা মিটিয়ে দেওয়া হয়। এখানে প্রশ্ন হল : অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইতে নেমে কেন যদুনাথ সিংহ পিছু হটলেন? আমাদের মতে কারণগুলি এই রকম :
১] মামলা চালাবার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা যদুনাথের ছিল না।
২] রাধাকৃষ্ণানের মতো রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল না যদুনাথের।
৩] রাধাকৃষ্ণানের সেই রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল আদালতে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেছেন। সে সময় যাঁরা যদুনাথকে সমর্থন করতেন, প্রকাশ্যে আসতে তাঁরাও ভীত হয়েছেন।
৪] সেই একই কারণে এত বড় একটা ঘটনার ব্যাপারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও আগাগোড়া নীরবতা পালন করে গেছেন।
একটা সুষ্ঠু মীমাংসার প্রয়োজন
যদিও ঘটনাটি প্রায় একশো বছর আগের, তবু যখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন এর একটা সুষ্ঠু মীমাংসা প্রয়োজন। রাজ্য সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে সব চেয়ে ভালো হয়। এই মীমাংসার জন্য যে সব উপাদান দরকার হবে সেগুলি হল :
১] মিরাট কলেজের পত্রিকায় যদুনাথের লেখা প্রবন্ধ।
২] ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় ও যদুনাথের ৪টি চিঠি ও রাধাকৃষ্ণানের ২টি চিঠি।
৩] ‘দ্য ক্যালকাটা রিভিউ’ তে প্রকাশিত নলিনী গাঙ্গুলির চিঠি।
৪] যদুনাথের ডায়েরি (এটি প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন )।
৫] পূর্বে উল্লিখিত সমকালীন পত্রিকার সমস্ত প্রতিবেদন।
৬] আদালতে মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী।
৭] আদালতের ডিক্রির পূর্ণ বিবরণ।
তাহলে শিক্ষক দিবস কবে?
যদি মেনেও নেওয়া যায় যে রাধাকৃষ্ণানের প্লেজিয়ারিজমের প্রমাণ অপেক্ষিত, তাহলেও বলতে হবে অভিযোগ যখন উঠেছে, তখন বিষয়টি বিতর্কিত। তাই রাধাকৃষ্ণানের জন্মদিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন না করাই যুক্তিযুক্ত। তাহলে শিক্ষক দিবস কবে? এই প্রশ্নের বিকল্পহীন একটিই উত্তর হতে পারে। শিক্ষক দিবস ২৬ সেপ্টেম্বরই। ওই দিনটি বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। বিদ্যাসাগর তেমনই এক শিক্ষক যিনি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং সংস্কৃত কলেজের সংসর্গে থেকেও ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষাকে — বিভাজনবাদী শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছিলেন; অর্জিত জ্ঞানকে যিনি বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন, যাঁর ভাবনা ও আচরণের মধ্যে বিন্দুমাত্র অসঙ্গতি ছিল না।