আজও মেয়েটাকে দেখতে দেখতে ঐ রাস্তাটা পেরিয়ে স্কুলের পথে হাঁটতে লাগলো তৃষা। এতদূরে স্কুল, আসতে যেতেই সব দম বেড়িয়ে যায়। তবু নিজের পরিচয়… নিজের পায়ের মাটি শক্ত করতে পেরে সে খুব খুশি।
মফস্বলি অঞ্চলে বেড়ে ওঠা তৃষা, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা এক সরকারি দপ্তরের কেরানির কাজ করতেন। চিরকাল মাসের শুরুতে সে দেখেছে টাকা পয়সা নিয়ে বাবা মায়ের মধ্যে কোন্দল। মা বরাবরই খুব সঞ্চয়ী মানুষ। নিজের জন্য মা কে কখনো কিছু কিনতে দেখে নি। পুজোর সময়ে আর নববর্ষে একটা নতুন শাড়ি ব্লাউজ… এইটুকুই মায়ের নিজের জিনিস কেনা৷ একবার ছোটবেলায় ওরা গ্রুপে করে দার্জিলিং গেছিলো ঘুরতে। সেই প্রথম পাহাড় দর্শন তৃষার। ওর সাথে সাথে বাবা-মায়েরও প্রথম পাহাড়ে আসা। জীবনের সবচেয়ে মধুর দিন বললে সেই ঘুরতে যাওয়ার কথাই মনে পড়ে। তখন তৃষা ক্লাস ফাইভ, পুজোতে ঘুরতে যাবে। তিনমাস আগে থেকে তৃষা একটা ক্যালেন্ডারে একের পর এক দিন কাটতে থাকে। আর বাকি দিনগুলোর হিসেব খাতায় লেখে। সেবার ঘুরতে গেছিলো ওদের সাথে কয়েকজন শিক্ষক দম্পতি। বাবাকে ওঁরা খুব শ্রদ্ধা করতো। যাই হোক, সেবার দার্জিলিং গিয়ে প্রথম মা নিজের জন্য একটা কার্ডিগান সোয়েটার কিনেছিলো অফ হোয়াইট রঙের। এখনো তৃষার মনে আছে, কি নরম তুলতুলে উলের সোয়েটার ছিল। মায়ের মুখে খুব তৃপ্তির হাসি দেখেছিল সে। তৃষাও আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল। হঠাৎ মা কেমন উদাস হয়ে যায়। মায়ের সেদিনের কথা এখনো মনে আছে — ‘নতুন জিনিস যখন নিজের টাকায় কিনতে পারবি, তার চেয়ে সুখ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ঐ কাকিমণিদের দেখ, ওরা কতটা ঝলমলে, নিজের পছন্দের মত সব করতে পারে। আমার মত পরজীবি হয়ে থাকিস না। বড় হলে বুঝবি’।
মায়ের এই একটা কথা নানাভাবে তৃষা জীবনে শুনেছে। দার্জিলিং থেকে ফেরার পরে সেই মাকেই দেখেছে শখ করে কেনা সোয়েটারটা তার বোনকে দিয়ে দিতে। মায়ের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তৃষার ছোটমাসি, তাকে বরাবর বাবা-মা স্নেহ করে গেছে। মাসির সব আবদার মেটাতো ওরা। সোয়েটার-টা দেখেই মাসি যখন বলে যে, আমাকে দিবি এটা পরতে? কি নরম-রে দিদি। মাকে একবাক্যে সেই প্রিয় জিনিস দিতে দেখে তৃষা। বাবাও কেমন নীরবে দেখে, পরোক্ষভাবে বাবারও সম্মতি দেখে সে। তৃষার সেদিন কি যে রাগ হচ্ছিল। কি করে মা তার প্রিয় সোয়েটারটা দিতে পারলো। তৃষা ওর রাগের বহিঃপ্রকাশ করে ফেলে সেই ছোট বয়সে। মা খুব শান্ত গলায় জানায়… আমি আর কয়দিন পরবো!! ও কলেজে যায়, ও ব্যবহার করলে জিনিসটা কাজে আসবে। তুই বুঝবি না এ সব, বড় হ আগে।
সেই তৃষা বড় হওয়ার আগেই এটা বুঝেছিল, নিজের আর্থিক স্বাধীনতাটা জরুরি। নাহলে মায়ের মত অনেক স্বপ্ন অধরা থাকবে৷ আর বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের সব পছন্দের জিনিস, শাড়ি কাপড়, শাল সব কিনে দেবে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে তৃষা স্কুল গেটের মুখে চলে এলো। প্রান্তিক অঞ্চলের এই স্কুলে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা খুব বেশি নেই। আর চারপাশে হতদরিদ্র অবস্হা। শীতকালে এদের ঠান্ডায় কাঁপতে দেখেছে তৃষা। বাড়িতে হয়ত একটাই চাদর বা সোয়েটার আছে… সেটা অদল বদল করে ওরা বাড়ির সবাই ব্যবহার করে। তৃষার খুব মন খারাপ হয়… যদি কিছু করতে পারতো ওদের জন্য। কিন্তু গ্রাম্য রাজনীতি অনেক জটিল, তার উপরে স্টাফ রুমে বাকিরা এটা নিয়ে নানা কথা বলবে। একবার তৃষা একটি মেয়েকে কিছু টাকা সাহায্য করেছিলো,যখন সে শুনেছিলো যে তার বাবা হঠাৎ মারা গেছে, মা মেয়ে মিলে শেষ এক সপ্তাহ নিজেদের খাবার জোগাড় করতে পারে নি। ওই মিড ডে মিলের খাবার মেয়েটি না খেয়ে বাড়ি নিয়ে যেত। সেই খাবার মা-মেয়ে মিলে রাতে খেত। এটা যখন জানতে পারে তৃষা,সে মেয়েটির হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলে যাতে ওরা প্রয়োজনীয় চাল আলু ডাল একমাসের মত কিনে আনে। কিন্তু ওর এই কাজের কথা স্কুলের এক সহকর্মী জানতে পারে। সেটা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। বাকিদের বক্তব্য এমন হয় যে, তৃষা এমন দান ধ্যান নিয়ে বসলে এর অযাচিত সুযোগ নেবে স্কুলের বাচ্চারা। সেই সাথে বাকি শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছেও আশা করতে থাকবে। অগত্যা,তৃষাকে চুপ হয়ে যেতে হয়। এরপর থেকে ও ঠিক করে যে,যদি কিছু করার হয় তবে সেটা গোপনে,নাম আড়াল করে করবে। এ কাজে ওকে এরজন্য স্কুলের মিড ডে মিলের দিদিদের সাহায্য নিতে হয়। অনেককে গোপনে নানাবিধ সাহায্য করে যাচ্ছে তৃষা৷ কিন্তু তার একটাই শর্ত… ওর নাম যেন প্রকাশ্যে না আসে।
পড়ন্ত বিকেলে যখন ট্রেনের জানলায় বসে নিজের জীবনের এই গতিময়তা নিয়ে ভাবতে বসে, তৃষা মনে মনে তৃপ্ত হয়… যদিও শরীর জুড়ে ক্লান্তি নেমে আসে।
একদিন এই দূরে চাকরি করা নিয়ে কত চিন্তা ছিল বাবা মায়ের। কি করে এতদূর যাবে আসবে তাদের রুগ্ন মেয়েটা। কিন্তু তৃষার কাছে এই চাকরিটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জীবনে। আত্মীয় স্বজন বলেছিল যে, সবে তো কলেজের গন্ডি পেরিয়েছে, পড়াশোনায় ভালো মেয়ে ও। পরের বার আবার চাকরির পরীক্ষা দিলে কাছাকাছি পোস্টিং পাবে মেয়ে। তাই ও যেন এবার জয়েন না করে। কিন্তু তখন মনের মধ্যে আরেক রকম অদম্য জেদ চেপে বসেছে।
কলেজে পড়ার সময়ে দুই বছরের সিনিয়র সুমিতদার সাথে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় ট্রেনে যাতায়াতের সূত্রে। পড়াশোনা নিয়েই ওদের আলোচনা চলতো। সুমিতদার বাড়িও এক দুবার গেছে তৃষা। তবে ওদের বাড়ি গিয়ে কেমন একটা রক্ষণশীলতা অনুভব হয়েছিল। তবু সুমিতদা বারে বারে বলতো যে, তুই গ্র্যাজুয়েশনের পরে কিছু একটা পড়তে থাকিস। আমি তো আইআইটি তে মাস্টার্স করার চেষ্টা করছি। তারপর একটা চাকরি পেলে আমরা সেখানেই সেটল করে যাবো। তোর অত চাকরি বাকরি নিয়ে ভাবতে হবে না। প্রথম প্রথম তৃষার বেশ লাগত স্বপ্ন দেখতে। একসময় সুমিতদার মুখে শুনতে লাগলো নানারকম পুরনোপন্থী কথা। ওর মা নাকি বাড়িতে কালো মানুষের হাতের জল খায় না। ঘোমটা ছাড়া পুরুষদের সামনে আসে না৷ তৃষাদের আর্থিক অবস্থা কমতি থাকুক, বাবা-মা ওকে খোলা মনের মানুষ তৈরি করেছে। তখন থেকেই ভাবনায় পড়লো তৃষা। সুমিত খড়গপুরে পড়তে গেল, ফাইনাল ইয়ারে একটা চাকরিও পেলো। ঠিক তখনই তৃষার এই সরকারি স্কুলে চাকরির খবর এলো। এবার শুরু অশান্তি। ওর গায়ের রঙ নিয়ে নাকি সুমিতের মায়ের আপত্তি। যদিও সুমিতের এ সব নাকি কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ও কিছুতেই বাবা মাকে বোঝাতে পারছে না। তৃষার কাছে সময় চাইলো সুমিত। কিন্তু কোথায় একটা আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো খুব তৃষার। সুমিত নানা কথার মাঝে এটাও বুঝিয়ে দিলো যে, তৃষা যেন চাকরিটা না করে। কারণ এত বাধা ওর পরিবারের, তার উপরে চাকরি করা মেয়েকে বৌমা করতেও আপত্তি। একে তৃষার চেহারা চাকচিক্যহীন, কালো, রুগ্ন.. তার উপরে এত দূরে চাকরি করা মেয়েকে বৌমা হিসেবে মানবে না ওর পরিবার।
তৃষা তখন ভীষণ ঘেটে যায়। একদিন নানা কথার মাঝে মাকে জড়িয়ে ধরে সব কথা জানায়। মা সুমিত এবং ওর পরিবারকে অল্প হলেও চেনে। সেসময়ে ওর আপাত শান্ত ঘরোয়া মা, খুব দৃপ্ত কন্ঠে জানায় যে, তৃষা যেন চাকরিটা না ছাড়ে। কারণ ওটা তৃষার একান্ত নিজের জায়গা, পায়ের তলার শক্ত মাটি। ওর মা ছোটবেলা থেকে একটাই স্বপ্ন দেখেছে যে, তৃষা নিজের মত উড়ে যাবে তার পথে। মায়ের মত যেন পরজীবি না হয়। তাই মায়ের একটাই বক্তব্য ছিল… চাকরিটা-সহ সুমিত ওকে গ্রহণ করলে তবেই যেন তৃষা এ সম্পর্কে এগোয়। সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কটায় তিক্ততা এলো। তৃষা বুঝতে পারলো, ওর রূপ নিয়ে কত রকম অপছন্দের জায়গা। যেন সব মিলিয়ে সুমিত করুণা করছে ওর উপরে। একসময়ে সুমিত নতুন চাকরি নিয়ে চেন্নাই চলে যায়। প্রথম দিকে ফোন করতো। কিন্তু প্রায় সেই কথোপকথন কথা-কাটাকাটিতে গড়াতো। ইতিমধ্যে তৃষা নতুন চাকরিতে যোগদান করেছে। তাই নিয়ে আরও সমস্যা শুরু। কথার পরিমাণ কমতে থাকলো। ফোন আসা ধীরে ধীরে বন্ধ হলো। আজ প্রায় তিনবছর হলো তৃষা এখানে চাকরি করছে। সুমিতের সাথেও ওর যোগাযোগ প্রায় এই তিনবছর বন্ধ। শুনেছে সামনের ডিসেম্বরে সুমিত ওর এক সহকর্মীকে বিয়ে করছে।
সময় এগিয়ে গেছে অনেকখানি। এখন তৃষার কাছে সব গত জন্ম মনে হয়। জীবনে কত কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। তবু এই ব্যস্ততাই ওর ভালো লাগে।
এমনই এক পুজোর আগে, তৃষা স্কুলে আসার পথে ঐ রাস্তার মোড়ের বাড়িটায় নেমে পড়লো। উঠোনে একটা চেয়ারে বসে আছে ১০/১১ বয়সের একটি মেয়ে। ওকে দেখে রোজ হাত নাড়ে মেয়েটা। আজ তৃষা ওর সামনে, কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সে
‘কি নাম তোমার?’ — তৃষার প্রশ্ন শুনে মেয়েটা কেমন মুখ বেঁকিয়ে হাসলো। তারপর খুব জড়ানো গলায় বললো… রাধা।
কি সুন্দর নাম তোমার, তেমন সুন্দর তুমি— এ কথা শুনে সে মেয়ের কি হাসি। তৃষা লক্ষ্য করলো মেয়েটির ডান হাত আর পা অল্প বাঁকা আর সরু।
ওদের কথার মাঝেই টালির ঘরের দরজা থেকে এক মহিলা এসে উপস্থিত।
‘কি রে রাধু, কার সাথে কথা কস?’— বলতে বলতে সেই আটপৌরে মহিলা এসে উঠানে দাঁড়ালো। তৃষাকে দেখে তো সে অবাক।
‘আরে দিদিমণি আপনি আমাগো বাড়ি? বসেন বসেন’— বলে সে একটা টুল এনে বসতে দেয়।
‘রোজ যাতায়াতের পথে রাধা আর আমি হাত নাড়াই। আজ ভাবলাম ওর সাথে আলাপ করে যাই। কি মিষ্টি মেয়েটা!’ — তৃষার কথা শুনে ওর মায়ের মুখ কেমন যেন থতমত হয়ে যায়।
এবার কথায় কথায় তৃষা জানতে পারে যে, রাধা এক বিরল রোগের শিকার। সেরিব্রাল পলসি…
কিন্তু রাধার মধ্যে অদম্য ইচ্ছে পড়াশোনা করার। ওর এক পিঠোপিঠি ভাই আছে যে ক্লাস ফোরে পড়ে। তার সাথে সাথে বসে রাধা অ আ কখ থেকে যোগ বিয়োগ করা শিখেছে। হয়ত অনেক সময় লাগে বলতে, তবু কি দারুণ করে সে বই পড়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে সে লিখতেও জানে। তৃষাকে ওর খাতা এনে দেখায় ওর মা। সত্যি তো,মেয়েটা কত প্রতিবন্ধকতা জয় করে চেষ্টা চালাচ্ছে পড়াশোনা করার। রাধার সাথে আরও কিছু ক্ষণ কথা বলে সেদিনের মত বিদায় নেয় তৃষা।
ওর মায়ের সাথে কথায় কথায় জানতে পারে যে, ওর আরও এক দিদি আর এক ভাই আছে। ওদের বাবার কাছে এ মেয়ে অভিশাপের মত। তাই সারাদিন ওকে এই চেয়ারে বসিয়ে রাখে। তবু ওর মা হাত ধরে বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, স্নান করানো, খাওয়া এ সব করায়। কিন্তু ইদানিং, রাধা একা একাই হাঁটছে, হয়ত পা বেঁকে খুব ধীরে হাঁটে। নিজের হাতে খায়, মুখ থেকে ভাত চারপাশে পড়ে যায়। তবু সে চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাধা কানে কানে তৃষাকে একটা কথা বলেছে, তৃষা যখন বিদায় নিচ্ছিলো ওদের বাড়ি থেকে।
‘দিদিমণি, আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে? আমিও ভাইয়ের মত স্কুলে যেতে চাই, পড়তে চাই। আমাকে একটা রঙ পেনসিল দেবা?’
এই কথা কটা কানে সারাক্ষণ বাজতে লাগলো তৃষার। কোন একটা উপায় বের করতেই হবে ওকে।
মাঝেমধ্যে ফাঁক পেলেই তৃষা, রাধাদের বাড়ি যেতে লাগলো। একদিন হাতে করে একটা আঁকার খাতা, রঙ পেনসিল, স্কেল, রবার সব নিয়ে রাধাকে দিলো। সেদিন রাধার মুখ ছিল দেখার মত। বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে সে জিনিসগুলোকে পরম মমতায় আদর করতে লাগলো। জড়ানো গলায় বললো যে, ‘আমি ছবি এঁকে তোমাকে দেখাবো দিদিমণি’..
দিনের শেষে বাড়ি ফিরে এক পরম তৃপ্তি বোধ করলো তৃষা। তবু কোথাও একটা অসম্পূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। কিছু স্থায়ী ব্যবস্হা করা দরকার রাধার জন্য।
ওদিকে তৃষার আরেকটা কাজ বাকি রয়ে গেছে… মহালয়া আসার আগে সেকাজও সম্পন্ন করতে হবে। শেষ তিন বছর এক বিশেষ দিনের জন্য কিছু টাকা জমিয়েছিলো। হিসেব করে দেখলো, সে টাকা দিয়ে তার স্কুলের ৪০০ বাচ্চার সোয়েটার কেনা যাবে। কিন্তু সেটা দেওয়ার ব্যবস্থা গোপনে করতে হবে। এ কথা তার সহকর্মীদের জানালে চলবে না। অগত্যা তখন তৃষা স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তৃষার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মানুষটি ভালো। তৃষা তাঁর সাথে ঐ সংগঠনের যোগাযোগ করায়। ঠিক হয় পুজোর আগে স্কুলের সব ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে শীতপোষাক বিলি করতে এক সবিনয় স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন আসছে।
তৃষার মনে পরিতৃপ্তির হাসি ফোটে।
কিন্তু রাধাকে নিয়ে চিন্তা ওকে ব্যতিব্যস্ত করে। কিছু করতেই হবে ওকে। অনেক খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে যে, শিক্ষার অধিকার আইনে এমন ধরনের বাচ্চাদেরও স্বাভাবিক স্কুলে পড়ার সুযোগ আইন সব আছে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সেই অর্ডার বের করে তৃষা। স্থানীয় স্কুল পরিদর্শকের সাথে যোগাযোগ করে যাতে রাধার মত বাচ্চারা এ অধিকার থেকে বিচ্যুত না হয়।
একদিন খুব জড়তার সাথে হেড স্যারের কাছে আর্জি জানায়, যাতে তার স্কুলে রাধাকে ভর্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বা বিদ্যালয় পরিদর্শকের সম্মতি সব তৃষা জোগাড় করার কথাও জানায়। হেডস্যার বরাবরই তৃষার ব্যবহার আর কাজের জন্য ওকে স্নেহের নজরে দেখেন। উনি কথা দেন যে, সামনের বছরের শিক্ষাবর্ষে সে অবশ্যই রাধাকে এ বিদ্যালয়ে ভর্তি নেবেন। এ কথা শুনে তৃষার মনে সে কি পরিতৃপ্তি।
পরের দিন সকালে তৃষা বেশ সেজেগুজে আসে। স্কুলে ঢোকার আগে রাধাদের বাড়ি ঘুরে যায়। রাধার মাকে জানাতে যায় যে, রাধার স্কুলে যাওয়ার সব ব্যবস্থা সে করেছে। রাধা তার স্কুলে পড়বে আর রাধার সব দায়িত্ব তৃষার। শুনে রাধার মা অঝোরে কেঁদে ফেলে তৃষার দিকে হাত জোর করে দাঁড়ায়। লজ্জায় পড়ে তৃষা। সে রাধার কাছে যেতেই দেখে যে, রাধা একটা কাগজ এগিয়ে দেয় ওর দিকে। সাথে সেই আঁকার খাতাটা। পৃষ্ঠা উল্টে দেখতে দেখতে তৃষারও চোখ বেয়ে জল নামে। কত কি স্বপ্নের বুনন খাতার পাতা জুড়ে। হয়ত লাইন সোজা নেই, রঙ বেড়িয়ে গেছে… তবু কি যত্ন নিয়ে এঁকেছে সে। আর যে কাগজটা আলাদা করে তৃষার হাতে ধরিয়েছে… তাতে একটা মেয়ে হাত ধরে হাঁটছে একজন মহিলার। তাতে লেখা আছে… রাধা আর দিদিমণি। সেই সাথে লেখা শুভ শিক্ষক দিবস।
তৃষা তো দেখে আরও অবাক… এও সম্ভব। রাধা জানলো কি করে? ভাইয়ের মুখে শুনে রাধা তার কল্পনা দিয়ে এ ছবি এঁকেছে তার প্রিয় দিদিমণির জন্য।
সেই অমূল্য কাগজ হাতে নিয়ে স্কুলের পথে পা বাড়ায় তৃষা। সেখানে গিয়ে জানতে পারে… আজই ঐ সংগঠনের তরফে শুরু করবে একটা ক্লাসকে সোয়েটার দেওয়া। এ যে তৃষার জীবনের চরম সুখের সময়।
সারাদিনের শেষে ট্রেনের জানলায় বসে তৃষার চোখে ভেসে আসছে ঐ নিষ্পাপ ক্লাস ফাইভ সিক্সের বাচ্চাগুলোর খুশির হাসি। সোয়েটারগুলো হাতে পেয়ে সে কি আনন্দ তাদের। আর মাঝেমধ্যে তৃষা ব্যাগ থেকে বের করে ঐ অমূল্য কাগজটা বের করছে, যেখানে রাধা নামের এক মেয়ের স্বপ্নের উড়ানের সঙ্গী হতে চলেছে তৃষা।
সন্ধ্যা নামছে… বাড়ি ফিরে মায়ের ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে ঐ কাগজটা দেখায় সে। মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকে… দেখো, আমি পেরেছি, নিজের জমি শক্ত করতে। আশীর্বাদ করো, আমি রাধাকেও ওর চলার পথ সুগম করতে সাহায্য করতে পারি যেন!!
তারপর আবারও কেমন দুঃখী হয়ে পড়ে সে। বলতে থাকে মায়ের উদ্দেশ্যে… কত শখ ছিল তোমার জন্য এবার থেকে মনের মত শাড়ি, শাল,সোয়েটার কিনে দেবো। সে সুযোগ দিলে কোথায়? দিব্যি তো গেলে চলে নিজের ঐ আটপৌরে জীবনকে সঙ্গে করে। আমি আজও ভুলি নি মা… দার্জিলিং থেকে কেনা সোয়েটারের কথা,যা তুমি ভোগ করতে পারলে না। আমার দেওয়া উপহারও তোমার শরীর ছুঁয়ে দেখলো না। কিন্তু আজ থেকে অনেকগুলো বাচ্চা সেই শীতের দিনের কাঁপুনি থেকে বাঁচবে… এ চেষ্টা করলাম, মা!! তোমার দেওয়ার শিক্ষাই আজ আমার জীবনের পাথেয় করেছি। তুমিই আমার জীবনের শিক্ষক। এমন করে পাশে থেকে সঠিক দিশা দেখিও অলক্ষ্যে বসে…
মোবাইলে ভেসে উঠলো… শুভেচ্ছা বার্তা… শুভ শিক্ষক দিবস, দিদিমণি। আমি জানি, আজ স্কুলে সোয়েটারগুলো কার হাত ধরে বাচ্চাদের কাছে পৌঁছেছে। এমনই থাকবেন, আপনার সব সহকর্মী একরকম নয়। আপনার পাশে আছি নীরবে। দরকারে জানাবেন।
মুচকি হাসিতে তৃষার মুখ উজ্জ্বল হলো।