‘যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক।’—এ পি জে আবদুল কালাম ।
আজ ৫ সেপ্টেম্বর, জাতীয় শিক্ষক দিবস। দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক এবং শিক্ষক ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের ১৩৪তম জন্মদিন। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সকল শিক্ষককে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।।
শিক্ষা হল শেখার একটি প্রক্রিয়া বা জ্ঞান অর্জন। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ’শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ এডুকেশন এসেছে ল্যাটিন শব্দ এডুকেয়ার বা এডুকাতুম থেকে। যার অর্থ ভেতরের সম্ভাবনাকে বিকশিত করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “শিক্ষা…. বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।”
শিশুমনের সুকোমল মনোবৃত্তিকে সদর্থক অর্থে বিশ্বের কাছে আর্শীবাদধন্য করে তোলার জন্য সদগুরুর প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। গুরু-শিষ্যের মণিকাঞ্চনযোগে শিক্ষাদানে সাফল্য আসে।
জন্মের পর থেকেই শিক্ষার হাতেখড়ি শুরু হয় বাড়ীতে। বাবা-মা আমাদের প্রথম ও পরম গুরু। জীবনযাপনের পরবর্তীতেও তাঁদের স্নেহে, শিক্ষায়, সহমর্মিতায়, প্রশ্রয়ে, মরমী সমালোচনায়, চরিত্র গঠনের দৃঢ় শিক্ষায় আমরা ঋদ্ধ হতে থাকি ক্রমশ।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অর্থ্যৎ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের মহান দায়িত্ব অর্পিত থাকে ‘জাতি গঠনের কারিগর’ শিক্ষকদের উপর। শিক্ষক তার নিজের অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীদের।
সুদূর অতীতকাল থেকেই এদেশে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে একটি সাবলীল, মধুর, স্বতঃস্ফূর্ত অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ শ্রদ্ধার সম্পর্কের ঐতিহ্য রয়েছে। শিক্ষাকে জাতীয় জীবনে ফলপ্রসূ ও কল্যাণপ্রদ করে তোলার জন্য ছাত্র-শিক্ষকের এ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অপরিহার্য।
শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বিতরণ নয় আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে ছাত্রছাত্রীদের তাদের দায়িত্বজ্ঞান, রাজনীতি, দেশপ্রেমের শিক্ষা দেন শিক্ষক। সুপ্ত গুণগুলি বিকশিত করার প্রয়াস করেন।
‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম’ জ্ঞানলাভের প্রাথমিক শর্ত হলো শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু শ্রদ্ধার অর্থ প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়। আদি শঙ্করাচার্য এর সময় থেকে पूर्व पक्ष /পূর্বাপক্ষ অর্থাৎ তর্ক-বিতর্কের মধ্যে দিয়ে কোন বিষয়ের আলোচনা চলে আসছে। শিক্ষক প্রশ্ন করতে শেখান। শিক্ষক শিখ্যার্থীর সম্পর্ক এতটাই মজবুত হোক যেখানে প্রতিপক্ষের দৃষ্টি ভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অবকাশ থাকে।
মনে আছে, সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ উদয়ন পন্ডিতের কথা। রাজার নির্দেশে জোর করে পাঠশালা বন্ধ করে শেখানো হচ্ছিল, ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’ কারণ রাজা জানতেন, ‘ওরা যত বেশি পড়ে, যত বেশি জানে, তত কম মানে’। সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করার সাহস দেখিয়ে ছিলেন পন্ডিত মহাশয়। শিক্ষকরা এইভাবেই সমাজকে চেনান, শেখান এবং প্রশ্ন করার সাহস যোগান।
কোনি’তে ক্ষিদ্দার চরিত্রটি মনে পরে? কিভাবে সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে ‘ফাইট -কোনি- ফাইট’ করতে শিখিয়েছিলেন। অথবা
আমির খানের ‘তারে জামিন পর’ সিনেমাতে ‘নিকুম্ব স্যার’।
এইরকম অজস্র উদাহরণ আছে অনেকের জীবনেই।
১৯৬৭ সাল, সর্ব্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের একদল ছাত্রছাত্রী মেতে উঠেছিল তাঁদের শিক্ষকের জন্মদিন উদযাপনে। শিক্ষক নিজেই আর্জি জানালেন, “শুধু আমার জন্মদিন হিসেবে উদযাপন না করে দিনটা যদি সব শিক্ষকের দিন হিসেবে পালন করো, খুব খুশি হব”। ব্যস! শিক্ষকদের মনে রেখে একটা দিন উৎসর্গ করা হল তাঁদের জন্য। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে দিনটি পালন হলেও ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ইউনেস্কো দ্বারা ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ দিনটি সূচিত হয়। ভারতে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালিত হয়। সকল ‘শিক্ষক’ পেশাজীবীদের জন্য আজকের দিনটি সেরা সম্মানের।
করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় গত ১৭ মার্চ থেকে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এই সময়ে অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষকরা ঘরে বসে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। রঙ্গিন কাগজ, বেলুন, ফুল, মিষ্টি ও উপহার দিয়ে যে দিনটার ছবি আঁকা হয় মনের মণিকোঠায় এ বছর তা সম্ভব হবে না। কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব।
শিক্ষার উপযুক্ত রসদ এ বিশ্ব সংসারে ভরপুর রয়েছে। সে প্রসাদ বিতরণের উপযুক্ত শিক্ষকের অনুপ্রবেশ ঘটুক সকলের জীবনে। যাঁর কাছে যথাসর্বস্ব সমর্পণ করে দিয়ে বলা যেতে পারে— ‘শরণাগত কিংকর ভীত মনে দয়া কর দীন জনে’।