আপনি একটি গল্প দিয়ে শুরু করুন। কারণ শিশুরা গল্প শুনতে ভালোবাসে।
গল্পটা এরকম হতে পারে — “আমি আজ রাত ২ টোর সময় ঘুম থেকে উঠে ২ টো বিস্কিট দিয়ে ২ কাপ চা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলাম। ২ কিমি যেতে না যেতেই অটোর ২ টো টায়ার পাংচার হয়ে গেল। অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম। ২ কিমি হাঁটার পর পথে ২ জন পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল। জানলাম তারাও আমার সঙ্গে কলকাতা যাবে। বাসে উঠলাম। জমিয়ে ২ ঘন্টা গল্প হল। ততক্ষণে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।” এবার এখান থেকে ছোট ছোট প্রশ্ন করুন। যেমন — আজ আমি কটার সময় ঘুম থেকে উঠেছিলাম? কটা বিস্কিট খেয়েছিলাম? কয় কাপ চা খেয়েছিলাম? ইত্যাদি। তাহলে বোঝা যাবে তারা গল্পটা আদেও শুনেছে কি না। এই গল্পটার মধ্যে একটা শব্দ তাদের মনে Strike করবে। সেটা- ‘২’ (দুই)। অর্থাৎ তারা প্রথমে ২ শব্দটা শুনল। তারা মুখে ২ সংখ্যাটা বলল।এবার গোণা। পরিচিত কিছু টি.এল.এম যেমন-তেঁতুল বীজ, কাঠি, প্লাস্টিকের স্ট্র ইত্যাদি হাতে নিয়ে তারা সেগুলির থেকে ২টি গুনল সকলকে দেখিয়ে দেখিয়ে।এভাবে তারা গোণা শিখল। এবার পড়া। আপনি বোর্ডে লিখে দিলেন ২ কীভাবে লিখতে হবে। বার বার তার উপর হাত বুলিয়ে তার Direction টা দেখিয়ে দিলেন। অনেকে উল্টো লেখে, সেই বদ অভ্যাস কাটানোর জন্য।তারা আপনার সঙ্গে ২ সংখ্যাটি পড়ল সমস্বরে। সবশেষে লেখা। তাদের আপনি ২ সংখ্যাটি খাতায় লিখতে বললেন। দুই একজনকে নাম ধরে বোর্ডে ডেকে নিয়ে লিখতে বললেন। এতে তাদের ভয় কাটবে। এভাবেই ২ শেখার বৃত্তটা সম্পন্ন হবে। যদিও এটা একদিনের কাজ নয়। তবে এভাবে করুন, বাড়ির বাচ্চাদের শেখান।
ভাষা শিক্ষার যেমন চারটি স্তম্ভ রয়েছে “শোনা-বলা-পড়া-লেখা”, তেমনি গণিত শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষত সংখ্যার ক্ষেত্রে এই পাঁচটি স্তম্ভ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে আপনার বাচ্চাটির সামনে অ্যাবাকাস, কিছু তেঁতুল বীজ, রঙবেরঙের সংখ্যা কার্ড দিন। এগুলো নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে দিন। সে খুব তাড়াতাড়ি গোণা শিখে যাবে। যারা একদম প্রথম প্রথম শিখছে তাদের একটি করে সংখ্যা বেশ কিছু দিন ধরে শেখান। সিরিয়াল বাই সিরিয়াল অর্থাৎ পরপর কোন সংখ্যা আপনাকে শেখাতেই হবে এমন কোন মানে নেই। অর্থাৎ ১,২,৩,৪,৫,৬ এরকম না শিখিয়েও ৪,৩,৬,২,১,৫ এরকমটাও শেখাতে পারেন। মোট কথা সে যেন সংখ্যা শিখতে পারে। সংখ্যা সম্পর্কে তার যেন সঠিক বোধ জন্মায়। যেমন — ধরুন বাচ্চাকে ‘১’ শেখাবেন। কয়েকটি সাদা কাগজে রঙিন পেন দিয়ে ১ সংখ্যাটি লিখে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় আঁঠা দিয়ে সেঁটে দিন। শোবার ঘরে,বেসিনের পাশে, বারান্দায় অর্থাৎ আপনার বাচ্চাটি যেখানে বেশি ঘোরাফেরা করে। সে সব সময় যাতে সংখ্যাটি দেখে। দেখার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ওর সাথে সংখ্যাটি উচ্চারণ করবেন। এভাবে ৪-৫ দিন চলুক। তারপর আবার নতুন সংখ্যা দেবেন। আমি নিজে এই পরীক্ষা করেছি আমার বাচ্চার উপর। ভালো ফল পেয়েছি।
আবার যখন বাচ্চাদের ত্রিভুজ চতুর্ভুজ বৃত্ত আয়তক্ষেত্রের জ্যামিতিক চিত্র সম্পর্কে পাঠ দান করছেন, তখন সেগুলির মডেল যদি আপনি তৈরি করে নিয়ে যান তবে তারা মডেলগুলিকে নেড়েচেড়ে দেখবে ও বিষয় সম্পর্কে তাদের ধারণা আরো Concrete হবে। আবার বিজ্ঞান ক্লাসে বা পরিবেশ ক্লাসে TLM-এর ব্যবহার প্রচুর। হাতে-কলমে না দেখালে এগুলি সম্পর্কে তাদের ধারণা অস্পষ্ট থেকে যায়। যেমন একটা উঁচু ক্লাসের কথা ধরা যাক। ধরুন আপনি অষ্টম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের আলো চ্যাপ্টারের সরল পেরিস্কোপের গঠন ও কার্যপ্রণালী পড়াচ্ছেন। আপনি নিশ্চয়ই TLM হিসেবে ব্ল্যাকবোর্ডে সরল পেরিস্কোপ এর ছবি এঁকে শেখাবেন বাচ্চাদের। আলোর প্রতিফলন কীভাবে হয়, দর্পণটা কীভাবে ৪৫ ডিগ্রি কোণে সেট করতে হয়, এর কাজ কী এগুলো যদি ক্লাস রুমে বসে একজন শিক্ষক হাতে-কলমে পেরিস্কোপ তৈরি করে দেখিয়ে দেন আশাকরি বোর্ডে এঁকে বোঝানোর চাইতে অনেক প্রাণোবন্ত হয়ে উঠবে। শেষ বেঞ্চের বখাটে ছেলেটাও, যে পরীক্ষায় বারবার করে সেও আগ্রহী হয়ে ওঠে বাড়িতে পেরিস্কোপ তৈরি করে শিক্ষককে দেখাবে। হাতে কলমে শিখবে পেরিস্কোপের কাজ। কোথায় কোথায় পেরিস্কোপ ব্যবহৃত হয় সেটাও জানবে। আবার আলোকরশ্মি সরলরেখায় চলে এই সূত্রের উপর ভিত্তি করে সূচিছিদ্র ক্যামেরা তৈরি করে হাতে কলমে তার নীতি, গঠন ও কাজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়। সূচিছিদ্র ক্যামেরার ছিদ্রটি বড়ো করলে কী হয়, ছোট করলেই বা কী হয়, ছিদ্র থেকে বস্তুর দূরত্ব বাড়ালে বা কমালে প্রতিকৃতির আকার কেমন হবে, সেটা স্পষ্ট না অস্পষ্ট হবে ইত্যাদি তারা হাতে কলমে শিখে নিতে পারবে, মনেও থাকবে। এমনকি পরীক্ষার খাতা তে তার প্রতিফলন হবে। তাই শুধুমাত্র জ্ঞান আহরণ নয়, Understanding এবং সবশেষে তার Application বা প্রয়োগই হল আধুনিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য। তাই প্রতিটি শিশু যাতে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে সঠিক ভাবে শিখতে পারে, তার প্রয়োগ করতে পারে তার দায়িত্ব সম্পূর্ণ শিক্ষকদের। এজন্য পাঠদান কালে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষামূলক প্রদীপন ব্যবহার করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। টতে শিখন হয়ে ওঠে শিশুর কাছে সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। যে ক্লাসগুলি অনেকটা ম্যাড়মেড়ে হয়, শিশুর কাছে সেই ক্লাস পছন্দের হয় না। দেখবেন আমরা যা করতে ভালোবাসি সেটা না করলে থাকতে পারি না। যেমন কেউ গান গাইতে ভালোবাসে, সে গান ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাকে গাইতেই হয়। ঠিক তেমনি ক্লাসের পড়ার মজাটা একবার যদি কোনো শিক্ষার্থী পেয়ে যায় তখন আপনি কিছুতেই তাকে সেখান থেকে Distract করতে পারবেন না। ভয় পেয়ে যে শিশুটা কোন কিছুতেই অংশগ্রহণ করত না, তখন দেখবেন সে সব কিছুতেই অংশগ্রহণ করছে। এভাবে বিষয়ের প্রতি, বিদ্যালয়ের প্রতি, শিক্ষকের প্রতি তাদের আলাদা একটা ভক্তি জন্মাবে। তখন সেই হয়তো মনে মনে ভাববে — “এমন একটা ক্লাস আবার কবে পাবো?” এই সহজবোধ্যতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা যাতে প্রত্যেকটা শিশুর মধ্যে যাতে গড়ে ওঠে তার দায়িত্ব শিক্ষকদের।
পাশাপাশি Poor Learner বা Slow Learner যারা, তারা নাকি অন্যান্যদের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। কেন তারা পিছিয়ে এটা নিয়ে কেউ আমরা মাথা ঘামাই না। শুধু তার গায়ে Poor Learner বা Slow Learner এর ট্যাগটা লাগিয়ে দিই। কারন এটা খুবই সহজ। কিন্তু অনুসন্ধান করি না কেন সে পিছিয়ে পড়ছে বা সে কি সত্যিই পিছিয়ে পড়া? ক্লাসরুমে কোন কোন জিনিসের ঘাটতি হচ্ছে, তার চাহিদা কী? আমার Teaching Method টা ঠিক আছে তো?এগুলো নিয়ে আমরা সমালোচনা করি না, নিজেকে কাটাছেঁড়া করিনা, বাড়িতে গিয়ে নিজেকে ক্রিটিসাইজ করি না। ক্লাসটাকে যদি আরেকটু আকর্ষণীয় করে তোলা যেত, যদি একটু Joyful করে তোলা যেত তাহলে তো আখেরে লাভবান হতো ওই আপাত পিছিয়ে পড়া বাচ্চাগুলো। কিন্তু যাকে আমরা পিছিয়ে পড়া বলি সত্যি কিসে পিছিয়ে পড়া? আপাত অর্থে যাকে পিছিয়ে পড়া বলে আমরা ভাবি কিন্তু তারই I.Q হয়তো অন্য সকলের মতো। সে হয়তো মাথা খাটায় না বা ইচ্ছে করেই এমনটা করে,ব্রেইনটাকে ঘষামাজা করে না, তবে আর বুদ্ধি খুলবে কীভাবে? এভাবেই সে পিছিয়ে পড়ে। তাছাড়া আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, তার পরিবার, পরিবেশও এর জন্য অনেকটা দায়ী। এই সমস্ত পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য দরকার কার্যকরী সমাধান। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কালে নিত্যনতুন শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার, হাতে কলমে কাজের সুযোগ, Activity Based Learning (ABL), প্রয়োজনে তাদের জন্য রেমেডিয়াল টিচিং (Remedial Teaching)-এর ব্যবস্থা করে তাদেরকে শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে।
শিক্ষামূলক প্রদীপণের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের অধিক মনে রাখা নিশ্চিত করে ও তার ফলে শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়। তারা যখন যেটা শিখছে,সেটা TLM হিসাবে হাতের কাছে পেলে তাদের পড়াটা কংক্রিট হবে। এজন্য ভূগোল ক্লাসে মাঝে মাঝে প্রকৃতিপাঠ (Nature Study), শিক্ষামূলক ভ্রমণ (Educational Excursion), প্রকল্প (Project) ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। বইতে পড়া জিনিস যখন তারা নিজের চোখে দেখে তখন তাদের শিখন হয় দীর্ঘস্থায়ী।
শিক্ষামূলক প্রদীপণ বা Teaching Aids ব্যবহারে স্বল্পসময়ে শিখন সম্ভব হয় অর্থাৎ তারা খুব সহজেই অনেক জটিল বিষয়ও আয়ত্ত করতে পারে। নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র যদি তারা বইতে পড়ে শুধু তোতাপাখির মতো মুখস্ত করে, “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে”- কিন্তু যদি প্রয়োগ বা অ্যাপ্লিকেশন না জানে, তাদের মুখস্ত করা বৃথা হয়ে যায়। তাই বিজ্ঞান শিক্ষক যদি একদিন তাদের নৌকায় চড়ান এবং নামার সময় তাদের প্র্যাকটিক্যালটা দেখিয়ে দেন এবং বলেন যে আমি নৌকার উপর ভর দিয়ে ডাঙায় উঠলাম (ক্রিয়া) এর ফলস্বরূপ নৌকাটা কিছুটা পিছিয়ে গেল (প্রতিক্রিয়া), তাহলেই নিউটনের তৃতীয় সূত্র পড়ার বৃত্তটা পূর্ণ হল। কিন্তু অ্যাপ্লিকেশনটা করলাম না শুধু তাদের দিয়ে মুখস্ত করিয়ে নিলাম ও পরীক্ষায় এলো, তারা লিখল, নম্বর পেল — কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন লাভ হল না। তার শিক্ষাটা পুঁথিতেই আটকে থাকলো। এজন্যই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা বলেন —
” পুস্তকস্থা তু যা বিদ্যা
পরহস্তগতং ধনম্।
কার্যকালে সমুৎপন্নে
ন সা বিদ্যা ন তদ্ ধনম্।।”
তাই শিক্ষামূলক প্রদীপণের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সাথে যোগসূত্র স্থাপনে সহায়তা করে। শিশু যখনই যা শিখবে, তা যেন বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে সেটার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব।এ জন্যই শিশুর বিনা ব্যয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন-২০০৯ (RTE Act-2009) এর পঞ্চম অধ্যায়ের ২৯ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সকল শিশুকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দিতে হবে এবং আরও বলা হয়েছে —
“Comprehensive and continuous evaluation of child’s understanding of knowledge and his or her ability to apply the same.” এখানে দুটি জিনিসকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে —
অর্থাৎ
ক) অর্জিত জ্ঞানের বোধ (Understanding of knowledge) এবং খ) প্রয়োগের সামর্থ (Ability to apply)। অর্জিত জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, তার প্রয়োগের সামর্থ্য যেতে গড়ে ওঠে সেদিকে শিক্ষকদের খেয়াল রাখা একান্ত কর্তব্য। যেহেতু UNESCO-র মতে “Every child is Special.”।