সাধারণত শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত দ্রব্য সামগ্রীকেই শিক্ষা উপকরণ বা শিক্ষামূলক প্রদীপণ বলা হয়।অন্যভাবে বলতে গেলে যে সব উপকরণ উত্তমরূপে ব্যবহার করে বিষয়বস্তুকে আরো আকর্ষণীয় ও প্রাঞ্জল ভাবে ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করা যায়, পাঠের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করানো যায় এবং শিক্ষাদান কার্যকর ও স্থায়ী হয়, তাকেই শিক্ষামূলক প্রদীপণ বা Teaching Aids বলা হয়।Trudy K. Stewart বলেছেন —
“Teaching aids are helpful tools for teaching in a classroom or with individual learners. Teachers can use them to help learners improve reading and skills, illustrate or reinforce a skill, fact or idea and relive anxiety, fears or boredom, since many teaching aids are likely games.”
গুণভেদে শিক্ষা উপকরণকে বেশ কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।যেমন —
ক) Auditory Teaching Aids (শ্রবণভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ) :
রেডিও, টেপ রেকোর্ডার, মাইক্রোফোন।
খ) Visual Teaching Aids (দর্শনভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ):
পাঠ্যপুস্তক, পত্র পত্রিকা, ম্যাগাজিন, চার্ট, মডেল, চক, ব্ল্যাকবোর্ড, প্লিপ চার্ট, Over Head Projector (OHP), Slide, বিভিন্ন রেফারেন্স বই, হোয়াইট বোর্ড, মার্কার, বুলেটিন বোর্ড, পকেট বোর্ড, মানচিত্র বা ম্যাপ, গ্লোব, বিভিন্ন ছবি, পোস্টার, পেপার ইত্যাদি।
গ) Audio-Visual Teaching Aids (শ্রবণ-দর্শনভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ) : টেলিভিশন (T.V), DVD Player, মনিটর, কম্পিউটার, চলচ্চিত্র ইত্যাদি।
এছাড়াও
ঘ) অনুসন্ধানমূলক উপকরণ বা (Investigatory Teaching Aids) : পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য সামগ্রী, পরিমাপক যন্ত্র, দূরবীন, বিভিন্ন পরীক্ষণ যন্ত্র।
ঙ) কর্ম সম্পাদন মূলক উপকরণ বা (Work Oriented Teaching Aids) : খামার, দর্শনীয় বস্তু, দর্শনীয় স্থান, মিউজিয়াম, প্রকৃতি-পরিবেশ ইত্যাদি।
শিক্ষামূলক প্রদীপন এর প্রয়োজনীয়তা :
★ শিক্ষার্থীর প্রেষণা জাগ্রত করে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিখনে উদ্দীপ্ত করে,পাঠগ্রহণে অংশগ্রহণকারীগণ সক্রিয় থাকে।
★ শিক্ষা উপকরণ বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করে তোলে।
★ অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের শিখন সহজ ও স্বতস্ফূর্ত হয়।
★ Poor reader ও Slow Learner-ও সহজে বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করে।
★ অধিক মনে রাখা নিশ্চিত করে এবং শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
★ স্বল্পসময়ে কার্যকরী শিখন সম্ভব হয়।
★ জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়বস্তুর মধ্যে সমন্বয় সাধনে সহায়তা করে।
★ বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র স্থাপিত হয়।
★ শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের একঘেয়েমি দূর হয় ও পাঠদান আকর্ষণীয় হয়।
★ শিক্ষার্থীদের সৃজনীশক্তি, কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তির বিকাশ লাভের সুযোগ ঘটে।
★ শিক্ষার্থীগণ হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায়।
★ সমস্যা সমাধানের এবং সঠিকভাবে কাজ করার অভ্যাস সৃষ্টি হয় ফলে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয়।
★ সহজে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাদান সম্ভব হয়।
★ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়; ফলে শিক্ষাগ্রহণ আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় হয়।

১৯৯৩ সালে যশপাল কমিটির রিপোর্টে ‘লার্নিং উইদাউট বার্ডেন’ (Learning Without Burden) বা বাধামুক্ত শিখনের কথা বলা হয়েছিল। শিক্ষাকে বাধামুক্ত করতে গেলে বেশ কয়েকটি বিষয়ের সরলীকরণ করতে হয়। যেমন বইয়ের বোঝা কমানো, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ কে আনন্দদায়ক করে তোলা অর্থাৎ ‘জয়ফুল লার্নিং সিচুয়েশন মেকিং’, যাতে একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ের প্রতি বা শিক্ষকের প্রতি কোনো ফোভিয়া বা ভয় তৈরি না হয়। তাই বিদ্যালয়কে ও তার শ্রেণীকক্ষের পরিবেশকে জয়ফুল করে তোলার মূল শর্তই হলো পাঠদানকালে নিত্যনতুন Teaching Aids বা T.L.M এর ব্যবহার।
টি এল এম গুলি low-cost, No cost এরও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ তেঁতুল বীজ, ছোট পাথরের টুকরো, প্লাস্টিকের স্ট্র ইত্যাদি গণিত ক্লাসে গোনার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এবার আমরা এর প্রয়োজনীয়তা গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
শিক্ষামূলক প্রদীপণগুলি শিক্ষার্থীর প্রেষণা জাগ্রত করে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিখনে উদ্দীপ্ত করে। পাঠগ্রহণে অংশগ্রহণকারীগণ সক্রিয় থাকে। তাহলে আমাকে আগে জানতে হবে প্রেষণা কী?প্রেষণা হল কোনও কাজ করার আগ্রহ বৃদ্ধি। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মোটিভেশন’ (Motivation)।এটি এমন এক ধরনের পজিটিভ রি- এনফোর্সমেন্ট, যেটা শিক্ষার্থীদের উদ্দীপ্ত করে এবং শ্রেণী শিখনে শিক্ষার্থীকে Active থাকতে সাহায্য করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পূর্বে সেই শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে কিনা এটা দেখা অত্যন্ত জরুরী। এজন্য বর্তমানে কন্টিনিউয়াস কম্প্রিহেনসিভ এভালুয়েশন (Continues Comprehensive Evaluation or CCE)-র Formative Evaluation এর ৫ টি ইন্ডিকেটর বা সূচকের মধ্যে পার্টিসিপেশন (Participation) বা অংশগ্রহণকে প্রথমে রাখা হয়েছে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা পাঠে অংশগ্রহণ না করলে শ্রেণিকক্ষে পরবর্তী স্তর গুলি পরিচালনা করা একজন শিক্ষকের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয় না। আর হলেও তা ফলপ্রসূ হয় না। শ্রেণিকক্ষে এমন কিছু শিক্ষার্থী থাকে যারা শ্রেণিকক্ষে ফিজিক্যালি প্রেজেন্ট (Physically Present) থাকে কিন্তু মেন্টালি প্রেজেন্ট (Mentally Present) থাকে না অর্থাৎ পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব লক্ষিত হয় বা Mentally Dropout থাকে।শিক্ষক প্রতি মুহূর্তে যা পড়াচ্ছেন, সে হয়তো শুনছে না বা তার মাথায় কিছু ঢুকছে বলে।ফলে সে এড়িয়ে যাচ্ছে। আপনারা ‘তারে জমিন পর’ সিনেমার সেই ছোট্ট ঈশানের কথা মনে করুন।অনেকটা ঠিক তার মত। সুতরাং — “Participation means not only attained in the class by physically but also mentally.” — অর্থাৎ অংশগ্রহণ মানে শুধু মাত্র ক্লাসে সশরীরে হাজির থাকাই নয় তাকে মানসিকভাবেও ক্লাস রুমের ভেতর হাজির থাকতে হয়। সুতরাং শিশু শিক্ষার্থীকে ক্লাস রুমের মধ্যে অংশগ্রহণ করাতে চাইলে, ক্লাসগুলিকে প্রাণোবন্ত করে তুলতে চাইলে অবশ্যই শ্রেণি শিক্ষণের কাজে শিক্ষককে শিক্ষামূলক প্রদীপণ ব্যবহার করতে হবে।আধুনিক শিক্ষায় বিদ্যালয় বলতে শুধুমাত্র ‘দশটা-চারটের আন্দামান’ নয়, বিদ্যালয় মানে —
“শিশুর কাছে বিদ্যালয়
নয়তো শুধু বিদ্যারই আলয়।
নাচবে সেথা,গাইবে সেথা
গড়বে তাকে মিত্রালয়।”
দিনের একটা বড়ো অংশ শিশুরা বিদ্যালয়ে কাটায়।তাই বিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি বাড়ির মত করা যায়,তবেই সেখানে শিক্ষাদানও প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠবে।
শিক্ষা উপকরণ বিমুর্ত ধারণাকে মূর্ত করে তোলে। বইতে লেখা বেশিরভাগ জিনিসই শিশুর কাছে বিমূর্ত বা Abstruct। এই বিমূর্ত বিষয়গুলি শিক্ষার্থীরা সহজেই অনুধাবন করতে পারে না এবং বিমুর্ত বিষয়গুলিকে আয়ত্ত করাও শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে বা বাড়িতে পাঠদান কালে একজন শিক্ষার্থীকে কিছু মূর্ত জিনিস বা TLM বা শিক্ষা উপকরণ দিয়ে চাক্ষুষ দেখালে সেই বিষয় সম্পর্কে তার ধারণা আরও পাকাপোক্ত হবে।( তাই আধুনিক শিক্ষা আরোহমূলক বা Inductive। এখানে প্রথমে কিছু সহজ উদাহরণ দেওয়া হয় এবং তারপর সেই উদাহরণ থেকে আসা হয় সংজ্ঞায়। অর্থাৎ এর গতি Abstruct to Concrete,Particular to General,Example to Definition।) উদাহরণস্বরূপ গণিত ক্লাসের একটা চিত্র তুলে ধরা হলো । Early grade এর অনেক শিশুই ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যা গটগট করে মুখস্ত করে বলে দেয় কিন্তু অনেকেরই সংখ্যা সম্পর্কে ধারনা থাকে না। তাদের কাছে সংখ্যা বিমূর্ত বা Abstruct থেকে যায় এবং এর মূল কারণ সংখ্যার নাম, মান এবং চিহ্ন সম্পর্কে ধারণা অস্পষ্ট থাকা। যেমন যারা এখনো সংখ্যা শেখেনি ধরুন তাদের প্রথম দিনই আপনি ১ শেখাবেন। এখন ১ তো একটা বিমুর্ত ধারণা। আদেও সে জানেনা ১ কী?তো বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার করার জন্য প্রথমে একটি মূর্ত জিনিস হাতের কাছে রাখবেন। এক্ষেত্রে দেখার সুবিধার্থে প্লাস্টিকের স্ট্র ব্যবহার করতে পারেন। গুণে দেখাবেন ‘১’। অর্থাৎ ১ বললে আপনার হাতে একটি কাঠি থাকছে। পরে তারা নিজে নিজে ১ গুণবে ও সকলে একটি করে কাঠি নেবে গুনে। তারপর সকলকে বলবেন আমার হাতে এখন কটি কাঠি আছে? সবাই বলবে ১। তাহলে এই ১ (এক) সংখ্যাটাই তাদের কাছে মূর্ত হয়ে উঠল বস্তুটির মাধ্যমে। অর্থাৎ তারা গুনতে শিখলো। এরপর লেখা। বোর্ডে বড় বড় করে এক লিখে দিলাম একের উপর হাত বুলিয়ে তার ডাইরেকশন দেখিয়ে দিলাম। অনেকে উল্টো করে এক লেখে। কেউ যাতে ভুল না লেখে তাই বারবার তার ডাইরেকশন টা দেখিয়ে দেওয়া শিক্ষকের কর্তব্য।পরে অবশ্য সংখ্যার মানটাও শিখিয়ে দিতে হবে।প্রত্যেক সংখ্যার ২ টি করে মান থাকে একটি স্থানীয় মান ও একটি প্রকৃত মান।সংখ্যাটা কোন স্থানে আছে একক না দশক, এটা মানেই তার স্থানীয় মান বা Place Value আর সংখ্যাটার ফেস বা মুখ কী বলছে?অর্থাৎ সংখ্যাটার অঙ্কগুলিই হল তার প্রকৃত মান বা Face Value। আবার সংখ্যা সম্পর্কে আরো একটি জিনিস বেশ কার্যকর সেটি হল —
” শো-ব-গো-প-লে”।
অর্থাৎ
শোনা, বলা, গোণা, পড়া, লেখা।
এটা একটু ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাক।
ধরুন আপনি বাচ্চাকে ২ শেখাবেন।কীভাবে শেখাবেন? ধরুন সে যদি হয় একদম Early Grade এর একজন বাচ্চা,যে কোনদিন বাড়িতে ২ শেখেনি।
তাদের এভাবে শেখাতে পারেন —
(চলবে)
ধন্যবাদ