১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে পরাজিত করে বাংলায় এখানে রাজত্ব করতে শুরু করল। তখন অবশ্য মুঘল আমলের শেষ দিক। জাহাঙ্গীরের (মির্জা নুর উদ্দিন মোহাম্মদ সালিম) আমল থেকেই ইংরেজরা এখানে ব্যবসা করতে শুরু করেছিল (১৫৫৯-১৬২৭)। মুঘল আমলে বিশেষ করে অরঙ্গজেবের আমলেও ধর্মভিত্তিক খাজনা ছিল। হিন্দুদের জন্য বেশী, মুসলমানদের জন্য কম খাজনা। মূলত উৎপাদিত ফসলের অংশের মাধ্যমেই খাজনা দেওয়া হত। ছোটা চাষিরা ফসলের মাধ্যমে খাজনা দিতেন। জমিদার সেটা অর্থে পরিবর্তন করে নবাবকে দিতেন। বড় কৃষকরা নগদে দিতেন। এছাড়া পন্য চলাচলের জন্য শুল্ক দিতে হত; এই খাজনা থেকেই মুঘলদের অনেক অর্থ উপার্জন হত এখানেই অনেকটা ব্যয় করতেন। ইংরেজদের খাজনার অর্থ পাচার করত ইংলন্ডে। দুটো পদ্ধতির মধ্যে অনেক তফাৎ ছিলো। মনসবদার তহশিলদাররা খাজনা আদায় করত। খাজনার জন্য জমির উর্বরতাও একটা মাপকাঠি ছিল মোঘলরা উপার্জিত অর্থ মোঘলদের আদিবাসস্থন উজবেকিস্তানে পাচার করতেন না।

তখন গোটা ভারতবর্ষেরই বিশেষ করে বাংলাতেও কুটির শিল্প এবং কৃষির একটা মেলবন্ধন ছিল। ওদের কাছে বাংলা ছিল স্বর্গরাজ্য। এখানে কি না হত! প্রায় ৩০ রকমের দ্রব্য রপ্তানী হত। আবার কৃষক জমিতে চাষ না করলে বা চাষ ছেড়ে চলে গেলে খাজনা আসবে কি করে? কৃষক যদি নানা কারণে চাষ না করে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে আানার ব্যবস্থা ছিল। ঔরঙ্গজেবের সময়ও তাঁদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হতো। খাজনা আদায় করা ছাড়া সেই আমলে এই ক্ষুদ্র কুটির শিল্প এবং কৃষকদের কাজের ওপর সরাসরি কোনরকম আধিপত্য বিস্তার তারা করতেন না। একজন তাঁতিরও কৃষিজমি ছিল। তিনি চাষও করতেন অন্য সময় তিনি তাঁতের কাজও করতেন।

১৭৫৭ এরপর চিত্রটা পুরো পাল্টে গেল। বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লার হত্যাকাণ্ড এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য বিস্তার। ব্রিটিশ শিল্পায়ন শুরু হলো। আস্তে আস্তে কুটির শিল্পের ধ্বংস শুরু হল। ইতিহাস আপনারা জানেন এখানকার বস্ত্র বনাম আমাদানী করা সস্তার ম্যানচেস্টার কাপড়। আমাদের খদ্দরের কাপড়ের উপরে ব্রিটেনে প্রচুর শুল্ক চাপানো হতো যাতে এখানকার তাঁতীরা বিদেশে বস্ত্র রপ্তানি করতে উৎসাহ হারায়। বেশ কিছু বছর এই ভাবে চলে ছিল। বহু কুটিরশিল্পী বাধ্য হয়ে তাদের নিজস্ব পেশা ত্যাগ করে কৃষক হতে বাধ্য হয়েছিলেন। নানাভাবে মসলিন কাপড়ের তাঁতীদের উপর অত্যাচার করা হলে আস্তে আস্তে জগৎ বিখ্যাত মসলিন উঠেই গেল। এখান থেকে রাজস্ব আাদায়ের পাচার করা টাকা থেকেই আজ ইংল্যান্ড ফুলে ফেঁপে উঠেছে। শশী থারুর মহাশয় তার ‘An Era Of Darkness’ গ্রন্থে খুব ভালো ভাবেই তুলে ধরেছেন এবং লন্ডনে গিয়ে সাহেবদের মুখের উপর বলে আসেন।

১৭৭৬ এর গণহত্যা
গনহত্যা কথাটা শুনে ঘাবড়াবেন না। ১৭৭৬ সালের দুর্ভিক্ষ গণহত্যায় রূপান্তরিত হল তৎকালীন ব্রিটিশের মন্বন্তর রুখতে না চাওয়ার স্বেচ্ছাচারিতায়। এক বিধ্বংসী মারনযজ্ঞ যেটাকে উপনিবেশের বন্ধুরা বলেন দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর। বাস্তবে ওটা পরিকল্পিত গণহত্যা। প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গোটা বাংলার অর্থনীতি, কুটির শিল্প ও কৃষি সব ওলোট পালোট হয়ে গিয়েছিল। শাসক আর কৃষকের মাঝে মধ্যে জমিদার ছাড়াও মধ্যস্বত্তভোগী লোকজন ছিলেন অনেক — নায়েক, সেরেস্তা, তালুকদার, গোমস্তা, পাইক, ঠিকাদার,পত্তনিদার,জোতদার,বরকন্দাজ, জায়গীরদার এরকম বিভিন্ন শ্রেণীর দালাল। ১৭৬৫ সালের দেওয়ানী লাভের পর উপনিবেশিক শাসক এবং শোষকদের দ্বৈত শাসন, একশালা ও পাঁচশালা বন্দোবস্তের মাধ্যমে আশানুরূপ রাজস্ব আদায় হয় নি।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত : কফিনে শেষ পেরেক
১৭৯৩ সালে ফিলিপ ফ্রান্সিসের তাত্ত্বিক অবস্থানকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে লর্ড কর্নওয়ালিস চালু করলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার ভূমি মালিক বা জমিদারদের সঙ্গে এক স্থায়ী চুক্তি। কোম্পানি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব পেয়ে যাবেন। নির্ধারিত রাজস্বের শতকরা ৯০ ভাগ সরকার পাবেন এবং ১০ ভাগ জমিদার পাবেন। সেটা সুনিশ্চিত করবেন একটি বিশেষ পদলেহনকারী জমিদার শ্রেনী। জমিদাররা জমির অধিকার-মালিকানা স্বত্ব পেয়ে গেলেন রাতারাতি। কিন্তু চাষ করা কৃষকরা কিন্তু জমির অধিকার সত্ব পাননি। এর আগে জমিতে চাষ হলে উৎপন্ন ফসলের একাংশ রাজস্ব হিসেবে দিতে হত, চাষ না করতে রাজস্ব দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্ততে প্রত্যেক জমি রাজস্বদায়ী হল – চাষ হোক ছাই না হোক।

কৃষকের সাথে রাজা বাদশা, উজির বা শাসকের কোন সম্পর্ক ছিল না। তোলা আদায় (খাজনা) করার জন্য মধ্যস্বত্ত ভোগীকে আরো বেশি ক্ষমতা দেওয়া হলো মানে জমিদার আর তার অধস্তনদের। ইংরেজরা সেই সময়ে বিপুল সংখ্যক রাজ কর্মচারী নিয়োগ করার বদলে মধ্যস্বত্ত ভোগীদের দিয়ে খাজনা আদায়ের কাজটা করেছিল। কিন্তু এইখানে একটা আমূল পরিবর্তন হলো। খাজনা দিতে হবে নগদে। ফসল উৎপাদন কম হোক আর বেশি হোক। দূর্ভিক্ষে, খরা ও বন্যায় কোন ছাড় নেই। কিন্তু কৃষকের কোন দায় দায়িত্ব এমনকি তাদের ভালো-মন্দ দেখার আর কেউ নেই। যে জমিদার উপযুক্ত খাজনার যোগান না দিতে পারবে তাকে আর রাখা হবে না, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। বছরের শেষে অনেক জমিদারই ব্রিটিশ নির্ধারিত রাজস্ব জমা দিতে পারেননি। সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী অর্থাৎ নির্দিষ্ট দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর জমিদার তার জমিদারিত্ব হারাবেন। ফলে অনেক জমিদারির অবসান ঘটে। সেই সুযোগে বাংলার অনেক লোকই বড়লোক হয়ে গিয়েছিল রাতারাতি। তাহলে কৃষককে বাধ্য হয়েই বাজারমুখী হতে হলো এবং বাজারে বিক্রি করে যে পয়সা আসবে সেখান থেকেই খাজনা দিতে হবে। তখন এখনকার মত বাজারমুখী কৃষি ব্যবস্থা ছিল না। সবাই বাজারে ও হাটে পণ্য নিয়ে আসার ফলে পণ্যের দাম কমে গেল। কৃষকের ফসল উৎপাদন কমলেও সেই কম উৎপাদন থেকেই তাদেরকে বেশি খাজনা দিতে হবে। দেনার দায়ে কৃষকরা গ্রামীন মহাজনের থেকে ঋণ নিয়ে রাজস্ব মেটাতো এবং ঋণের দায়ে কৃষকরা জর্জরিত হয়ে মহাজনরা কাছে সর্বস্ব খোয়াতে হয়। বাধ্য হয়ে কৃষকরা সাধারণ প্রচলিত ফসল ছেড়ে বেশি রোজগারের জন্য অর্থকরী ফসলের দিকে বেশি ঝুঁকলেন যেমন নীল পাট চাষ। এই বানিজ্যিক ফসল চাষের ফলে খাদ্যাভাব দেখা দিতে শুরু করল। অসহনীয় ও অমানবিক অব্যবস্হার সৃষ্টি হল। বলা হয়েছিল জমিতে স্থায়ী অধিকার পেলে জমিদাররা নাকি কৃষি এবং কৃষকের প্রভূত উন্নতি করবে ফলে দেশের সম্পত্তি সম্পদ বাড়বে। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র দত্ত এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তোর স্বপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। অন্যদিকে কোম্পানিরও লাভ হবে। আসলে শুধুমাত্র কোম্পানিরই লাভ হয়েছিল। জমিদাররা কৃষকদের উপর অত্যাচার চালিয়ে নির্ধারিত রাজস্বের থেকে অনেক বেশি রাজস্ব আদাই করত। দেখা যাচ্ছে ১৭৯৩ সালে নির্ধারিত রাজস্ব ৩৫ লক্ষ পাউন্ডের জায়গায় ১ কোটি ৩৫ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আদায় করে। সেই অর্থ ইংলন্ডে পাচার হত, দেশের উন্নয়নে সামান্য ব্যয় হত। ফলত কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়। স্বাভাবিকভাবে খাজনা দেওয়ার জন্য কৃষকের প্রাণ-ওষ্ঠাগত। পৃথিবীর কোন দেশেই কৃষককে এত বিপুল পরিমাণ খাজনা দিতে হয়নি সেটা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ইংরেজ প্রবন্ধকার ডিগবি স্বীকার করেছেন। (চলবে)