কৃষক বিদ্রোহ
তখন সামান্য সংখ্যক আধুনিক কল কারখানার ভাবনা চিন্তা হচ্ছে। শ্রমিকদের মালিকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। বরং লক্ষ লক্ষ কৃষক একই পেশায় নিযুক্ত এবং তারাই সবথেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। প্রভূত বঞ্চনার বিরুদ্ধেই কৃষকরাই গর্জে উঠতে পারেন। অথচ তাদের উৎপাদিত খাদ্য খেয়েই এই শাসক, প্রশাসক, জমিদার তার পদলেহনকারী মধ্যস্বত্ত ভোগী মানুষজন বেঁচে থাকে। আজও তাই।
১৭৬৩-১৮০০ পর্যন্ত সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বা তন্তুবায় বিদ্রোহ চলে। মসলিন কাপড়ের তাঁতি ও অন্যান্য তাঁতিদের উপর বহু নির্যাতনের জন্যই তারা গর্জে উঠেছিলেন। এরপরে সাঁওতাল বিদ্রোহ ১৮৫৫-১৮৮১ পরে ওয়াহাবি বিদ্রোহ ১৮২৪-১৮৭০।
ইংরেজরা জোর করে কৃষকের জমিতে নীল গাছের চাষ করতে বাধ্য করে। নীল গাছের পাতা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাপড়ের রং করার নীল রং তৈরি করা হয়। সেটা ভেষজ রঙ এবং তার খুব চাহিদা ছিল ইউরোপে এর বাজারে। এই নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গোটা বাংলা জুড়েই নীল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে ১৮৫৯ -১৮৬১। আগে বাংলার সব কৃষক পরিবারেরই জমি ছিল। আস্তে আস্তে কৃষক জমির অধিকার হারিয়ে ভূমিহীন কৃষকে পরিনত হল। এই মুহূর্তে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে কম নয়। ধীরে ধীরে এই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ভারতে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৫৬ শতাংশ।

নীল চাষ
জমিদার জোরদারের অধীন বহু ভাগচাষী জমিতে চাষ করে আসছেন বর্গা প্রথায়। ওই ভাগচাষীদের জমির উপর কোন স্বত্ত ছিল না। জমিদার ইচ্ছা করলেই বা তাঁর মনের মত না চললেই জমি থেকে উৎখাত করে দিত। কৃষকের শ্রম ও উপকরণ দিয়ে যে ফসল উৎপাদিত হতো সেই ফসলের বেশিরভাগটাই চলে যেতো জমির মালিকের কাছে। প্রায় অর্ধেক বা তারও বেশি। একে বলা হত আধিয়ারী পদ্ধতি। এই সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। তেভাগা হল মোট উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ পাবে চাষি ও এক ভাগ পাবে জমির মালিক। বেশিরভাগ জমিদাররাই কৃষকদের উপর খাজনা আদায় জন্য চাপ দিতেন এবং কৃষকদেরকেও নানাভাবে অত্যাচার করা হত। আগেই বলা হয়েছে কিভাবে এই খাজনা পরিশোধের জন্য মহাজনের থেকে ঋণ নিয়ে জালে জড়িয়ে পড়তো। স্বাভাবিকভাবে নতুন করে আর এক কৃষক বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৩৬ সালে গঠিত হলো সর্বভারতীয় কৃষক সমিতি। ১৯৩৭ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা। ওই সভার থেকে দাবি তোলা হয় বিনা খেসারাতে জমিদার প্রথার উচ্ছেদ চাই এবং লাঙ্গল যার জমি তার। ১৯৪৪ সালে তদানন্তীন বাংলার কৃষক প্রজা পার্টির সরকারের মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব ফজলুল হক মহাশয় ক্লাউড কমিশনের সুপারিশ মেনে বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারে প্রস্তাব দেয়। ওই কমিশনে সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে কৃষকদের সরাসরি সরকারকে কর দিতে হবে এবং উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুই ভাগ মালিককে প্রদান করতে হবে এই সুপারিশ কিছুতেই বাস্তবায়িত করছিল না।

সাঁওতাল বিদ্রোহ
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো ১৯৩৯ সালে তারপরে ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ গণহত্যা যেটাকে বলা হয় দুর্ভিক্ষ। তৎকালীন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল মহাশয়ের জনবিরোধী নীতি গ্রহণ এবং জাপানি আগ্রাসনের ভয়ে খাদ্য মজুদ করার ফলে বাজারে কোন খাবার ছিল না। গোডাউনে মজুত থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হল খাবার খাবার না পেয়ে। এখনও উপনিবেশিকের পদলেহনকারী মানুষজন একে দুর্ভিক্ষ বলেন এবং বলা হয় তখন নাকি খাবারের অভাব ঘটেছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য অধ্যাপক অমর্ত্য সেন দেখিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর কোন দুর্ভিক্ষই খাবারের অভাবের জন্য হয়নি, রাজনৈতিক কারণে খাবারের অভাব তৈরি করে পরিকল্পিত গনহত্যা (দুর্ভিক্ষ) ঘটানো হত। ১৯৪৩ এর তথাকথিত দুর্ভিক্ষ এর ব্যতিক্রম নয়। এরপর ১৯৪৬ এর ভাতৃ-ঘাতী দাঙ্গা পরেও সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে হিন্দু মুসলমান সবাই মিলেই এই তেভাগা আন্দোলনে যোগ দেয়।

তেভাগা আন্দোলন
১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় আর ১৯৪৭ সালের পরেও চলে। সেই হিসেবে তেভাগা আন্দোলনের ৭৫ বছরে পা দিল (১৯৪৭-২০২২)। হিন্দু মুসলমান, ওরাও, সাঁওতাল, রাজবংশী ইত্যাদি বিভিন্ন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এই গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মহিলারাও ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তার মধ্যে নাচোল উপজেলার ইলা মিত্রের নাম আমাদের অবশ্যই স্মরণ করতে হয়। আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ। কবি, শিল্পী, সুরকার, সাহিত্যিক এই আন্দোলনের উপর বিভিন্ন দলিল, দস্তাবেজ, ছবি, গান ও সাহিত্য রচনা করেছেন। দুই বাংলাতেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। সোমনাথ হোড়, সলিল চৌধুরী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, চারু মজুমদার প্রমূখ।আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল অধুনা বাংলাদেশের দিনাজপুর ও রংপুর জেলায়। পশ্চিমবঙ্গে মালদহ জলপাইগুড়ি ,২৪ পরগনা ,মেদিনীপুরেও বেশ তীব্রতা ছিল। তবে কাকদ্বীপ থেকে বেশ বড় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। প্রায় ৭০ লক্ষের বেশি কৃষক ক্ষেতমজুর সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে অংশ নেন আন্দোলনে প্রথম শহীদ ছিলেন দিনাজপুর জেলার চিনির বন্দর উপজেলার তালপুকুর গ্রামের সামির উদ্দিন ও শিবরাম মাঝি। চলে অকথ্য পুলিশি ও জোতদারের লাঠিয়ালের নির্যাতন। তেভাগা ছাড়া অন্য দাবিগুলো ছিল ভাগ চাষীকে দখলে স্বত্ব দিতে হবে রশিদ ছাড়া কোন ধান দেওয়া হবে না, চাষযোগ্য পতিত জমিতে আবাদ করতে হবে, জোরদার এর পরিবর্তে ভাগচাষীদের ধান তুলতে হবে এবং জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ। দাবি উঠেছিল তেভাগা চাই, নিজ খোলানে ( খামারে) ধান তোল , জান দিব তবু ধান দিবো না। (চলবে)
অনুপম পাল, কৃষি বিশেষজ্ঞ
সত্যিই, জমির উপর প্রকৃত কৃষকেরই সত্ত্বাধিকার থাকা উচিত। কারন কৃষকরাই সকলের মুখে অন্ন তুলে দেন।