ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীন হলো ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। ছিন্নমূল উদ্বাস্ত মানুষের স্রোত দিকে দিকে, ছিল না অন্ন ও বাসস্থানের কোন নির্দিষ্ট সংস্থান। খাদ্য সংকটও ধীরে ধীরে দেখা দিচ্ছিল। তখন পরিকল্পনার অভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্দোলনের ধারা স্থিমিত হতে লাগলো দেশ বিভাগের জন্য। কৃষকদের উপর বঞ্চনা না কমে বরং বেড়েই চলছে। ওই আন্দোলনে মোট ১২০০ কৃষক কারাবরণ করেন, আহত হন প্রায় দশ হাজার কৃষক এবং ৭০ জন কৃষক নিহত হয়। বহু কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তেভাগা আন্দোলনের দাবি মেনে নেয়। তেভাগা আন্দোলনকেই ইংরেজ আমলের সব থেকে বড় কৃষক আন্দোলন বলা যেতে পারে।
১৯৫২ সালের বর্গাদার আইন তৈরি হয় আর ভূমি সরকারের কাজ শুরু হয়। ১৯৭২-১৯৭৭ এই সময় রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় তা কার্যকরী হতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা সরকারিভাবে কার্যকরী হয়। সরকারিভাবে ভূমি সংস্কার চালু হয় ষাটের দশক থেকে তবে ঢিমেতালে।

তেভাগা আন্দোলনের পরেও কিন্তু কৃষকদের অভাব অভিযোগ কিন্তু মেটেনি। ১৯৫৮ সাল থেকেই খাবারের অভাব দেখা দিতে শুরু করে। রাজ্যজুড়ে অনাহার ও অর্ধাহার দেখা দেয়। ১৯৫৯ সালে শুরু হলো খাদ্য আন্দোলন। খাবারের দাবীতে আন্দোলন। বিদেশি শাসকরা চলে গেলেও স্বাধীন দেশের শাসকদের শ্রেণী চরিত্র কিন্তু একই। সুবিধাভোগী জোতদার, জমিদার কালোবাজারি ও আড়তদাররা এক হয়ে গেলেন। গরিব কৃষকের অবস্থা যে কে সেই। এহেন ব্যবস্থায় ছিল প্রচুর গলদ, প্রশাসনিক অব্যবস্থা। চোরাকারবারি আর মজুদদারদের রমরমা। বহু গ্রামে দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা সৃষ্টি হল। সমস্যার সমাধানে মন না দিয়ে তখনকার দিনের সরকার দমন পীড়নের রাস্তাই অবলম্বন করলেন — সব শাসকের যা চরিত্র আর কি।
দাবি উঠেছিল ধান চাল সংগ্রহ করে খাদ্য ভান্ডার সৃষ্টি করতে হবে, রেশনিং ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। ৩১ আগস্ট ১৯৫৯। তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রীর অপসারণ ও খাদ্যের দাবিতে এবং পুলিশি দমন পীড়নের প্রতিবাদে কলকাতার কার্জন পার্ক থেকে মিছিল শুরু হল ডালহৌসি স্কয়ারের দিকে। মিছিলে শামিল কৃষক, কৃষক রমণী, কোলে শিশু-সহ রমনী, শিক্ষক, সাধারণ মানুষের লক্ষাধিক মিছিল। পুলিশি বর্বরতার শিকার হলেন ৮০ জন, নিখোঁজ ২০০ জন। সেই সময় থেকে বামপন্থী দল ও সংগঠন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন ৩১ আগস্ট প্রত্যেক বছরই শহীদ দিবস পালন করার। আজও পালিত হয়। স্লোগান উঠলো — আমরা বাংলার জনগণ খাদ্য চাই, ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দাও নইলে গদি ছেড়ে দাও। ১৯৫৯-এর এই খাদ্য আন্দোলনের ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা থাকবে। এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন বামপন্থীরা। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ল, কিছু কিছু জায়গায় খাদ্যের যোগান বাড়লো।

কিন্তু ১৯৬৬ তে আবার খাদ্য সংকট ঘনীভূত হল। বসিরহাটে স্বরূপনগরের ষষ্ঠ শ্রেণি স্কুল ছাত্র নুরুল ইসলামের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছিল। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ কলকাতা ছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বসিরহাট, বেলডাঙ্গা, পলাশী, রানাঘাট ও আসানসোল সর্বত্রই এর প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। চালের দাম ২ টাকা ৮০ পয়সা প্রতি কেজি, ৩-৪ গুন দাম বেড়ে গেল। যা জনগণের ক্রয়ক্ষমতার সামর্থের বাইরে ছিল। রেশনে দেওয়া হচ্ছিল পূর্ণবয়স্কদের জন্য মাথাপিছু মাত্র ৫০০ গ্রাম চাল আর এক কেজি গম। তাও ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে এবং অসচ্ছ একটি ব্যবস্থাপনা। সবাই যে পাচ্ছেন তারও নিশ্চয়তা ছিল না। বাজারের সবজি অমিল এবং অমূল্য হয়ে গেল। সরকারি নিদান এলো খাদ্যাভ্যাস পাল্টানোর। ভাত রুটি ছেড়ে কাঁচকলা ও কানা বেগুন খাওয়ার। কাঁচকলা খাওয়া নিয়ে নানা টিটকিরি মন্তব্য করা হয়েছিল। উল্লেখ্য কাঁচকলা ও বেগুন নিয়ে যে নেতিবাচক মন্তব্য করা তখন হয়েছিল বাস্তবে তা নয়। কাঁচকলা ও বেগুন যথেষ্ট পুষ্টিগুণে ভরপুর। বহুগুণের সমাহার হল বাইগুণ, সেখান থেকে বেগুন।পরে ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে খাদ্য সমস্যার অনেকটা সমাধান করা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস সেরে যায়। পরে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় তার অনেক পরে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার। ওই আমলে ভূমি বন্টন বর্গা ও পাট্টা বিতরণ নিয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। অনেক ছোট জোতের জমি বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৯৫%। পরবর্তী কালে অনেক ছোট জোতের পাট্টাধারী কৃষক অর্থের অভাবে পুঁজি নির্ভর রাসায়নিক চাষ করতেও অপারগ ছিলেন।
শেষের কথা
সমাজে মূলত ২ ধরনের শ্রেনীর বাস। উৎপাদক আর অনুৎপাদক গোষ্ঠি। কৃষি উৎপাদিত ফসল হতে পারে, কুটির শিল্পজাত দ্রব্যও হতে পারে। বেশীর ভাগ শহুরে মানুষ কোন উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত নয়। কিন্ত কৃষি কাজকে নিকৃষ্ট বলে গন্য করা হয়। চাষা ভুষো বলে গালিগালাজও করা হয়। কিন্ত তাঁদের উৎপাদিত পন্য খেতে অসুবিধা নেই, কোন কুন্ঠা বোধ নেই। কৃষি যাতে লাভজনক না হয় তার চেষ্টা তলে তলে চলছে। কৃষকরা বলছেন চাষে লাভ নেই। সুষ্ট বিপনন এবং একজানলার রপ্তানীর ব্যবস্থা সেই ভাবে গড়ে ওঠে নি। কীটনাশক বিষ, ঘাসমারা বিষ, ভারী ধাতু যুক্ত রাসায়নিক সার চালু রাখা আছে যাতে জমি নষ্ট হয়। বিশ্ব বানিজ্য চুক্তির পর এটা প্রকট হয়েছে।নিয়ামকরা চাইছেন কৃষি ছেড়ে কৃষকরা যেন শহরে নির্মান শিল্পের সাথে যুক্ত হয়। এখন গ্রাম থেকে সরাসরি বাস চেন্নাই ও দিল্লীতে যাচ্ছে। কৃষকরা চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন। ফসল আকাশে চাষ হবে না আর মানুষ টাকা চিবিয়ে খায় না। এক সংকটজনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যাদের জন্য সভ্যতা টিকে আছে সেই পেশা কেন গর্বের হবে না? যুব সমাজ স্বাধীন মাথা উঁচু করে চলার এই পেশাকে খারাপ চোখে দেখছে, বড়ং প্রচার সেই ভাবে প্রচার করে। চাকরির বাজারও সংকুচিত।

এবার আসি স্বনির্ভরতা কাকে বলে? কি ভাবে সম্ভব? কৃষকরা স্বাধীন কি? এখন কৃষকের নিজের কাছে নিজের বীজ নেই। সব কৃষি উপকরন বাইরের থেকে কিনতে হয়। আগে সবই কৃষকের কাছে ছিল। যার প্রয়োজন ছিল না তাকেই এখন অত্যাবসকীয় পন্য আইনে যুক্ত করা হয়েছে।রাসায়নিক সার , বিষ ও বীজ। হাজার বছর ধরে কষকরা চাষ করে আসছেন, কত সভ্যতা পার হয়ে গেল। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর বোমা, গ্যাস ও বন্দুকের ব্যবসার মন্দার পর কৃষি উন্নতির দোহাই দিয়ে শিল্পের প্রয়োজনে কারকানার তৈরী রাসায়নিক সার ও বিষ কৃষকের জমিতে ব্যবহার ও বিক্রির দরকার পড়ল। প্রচার এমন চলল ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হলে ওই গুলোই লাগবে, জনমানসে প্রোথিত হয়ে গেল। সবুজ বিপ্লব, উন্নত বৈজ্ঞানিক কৃষি বলে যাকে চালানো হল। কারখানার তৈরী সার, সার খেয়ে বেড়ে উঠবে এমন আধুনিক বীজ যা বছর বছর কিনতে হবে। আবার ওই উন্নত গাছে পোকা লাগবেই তার জন্য কারখানায় তৈরী কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। হাজার বছরের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, দেশজ উন্নত বীজ, বেশী ফলনের জাত, মিশ্র ফসল, চাষ পদ্ধতি, ভেষজ রোগ পোকা নিয়ন্ত্রক, ঝুম চাষ –সবই অবৈজ্ঞানিক হয়ে গেল? বেশী উৎপাদনের ধান ও অনান্য ফসলের সরকারের নিজের তথ্য সবুজ বিপ্লবের সময় চেপে যাওয়া হল। একেই বলা হয় খাদ্য রাজনীতি। মার্কিন কর্তারা আমাদের বোঝালেন খাদ্য সংকটের কথা। আমরাও সাদা চামড়ার লোকেদের অন্ধবিশ্বাস করলাম। পি এল ৪৮০ ছিল খাদ্য রাজনীতির একটা অঙ্গ। ১৯৬৫-৬৬ সালে খাদ্য সংকট একটা হয়েছিল উত্তর ভারতে। আমরা খাদ্য আমাদানি করছিলাম। কিন্ত চাপে পড়ে ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে আমেরিকার কৃষি চুক্তি সই হল? চট জলদি সমাধান করতে গিয়ে কি করলাম? কি কি নষ্ট করলাম যা আমেরিকার ছিল না? বিকল্প ছিল না, না চাপে পড়ে চোখ বন্ধ করে ছিলাম? আজও কি খাদ্য সমস্যার নিরসন হয়েছে, অপুষ্টি কমেছে কতটা? দেশজ ফসলের পুষ্টিগুন আধুনিক ফসলের থেকে বেশী এবং বিষমুক্ত সেটা নিয়ে প্রচার করতে আমরা কুণ্ঠাবধ করি?
ভবিষৎ প্রজন্মের কথা ভেবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কৃষি কাজ কেন গর্বের পেশা এই বার্তা মানুষের কাছে, যুব সমাজের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কিছু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, আমেরিকায় বসবাসকারী মানুষ ভারতে এসে জমি কিনে চাষবাসকে নিজেদের জীবিকা করেছেন। দেশজ কৃষি ব্যবস্থা ও এখনো জীবিত থাকা বিপুল ও বৈচিত্রময় ও পু্ষ্টিকর ফসলের কথা প্রচার করতে। চাষবাস খুব খরচেই করা যায়। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে লেখা সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরনের বিরুদ্ধে সজাগ ছিলেন। কিন্ত আমরা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি।
অনুপম পাল, কৃষি বিশেষজ্ঞ