ভূমিকা
আপনাদের অনেকেরই হয়তো মনে নেই ষাটের দশকের উত্তাল খাদ্য আন্দোলনের কথা। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে বোম্বাই পর্যন্ত ১৮০ কিমি এক বিশাল পদযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন কৃষকরা। কেন? খরার জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, জমির অধিকার রক্ষা, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, শস্য বীমা এবং সেচের ব্যবস্থা ইত্যাদির দাবিতে লং মার্চ। স্বাধীন গনতান্ত্রিক ভারতে জন সাধারনের ভোটে জেতা সরকার কৃষকের বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণের চেষ্টা করেনি, করছেও না। কৃষিকাজ যেন তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিকদের কাজ। তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলিতে গদিতে থাকা রাজনৈতিক দল ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সাধারনত পালন করে না, ভোট বৈতরনী পার হওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায় করে। রাষ্ট্র কৃষকদের করুনার চোখে দেখে, আর ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকরা আরো অবহেলিত। তাদের স্বনির্ভর করার কোন আন্তরিক চেষ্টা নেই। বিশ্ব বানিজ্য চুক্তিতে বলা হয়েছে জমির উপর কৃষকের নির্ভরতা কমাতে হবে মানে কৃষক উচ্ছেদ করা হবে। করপোরেট চাষ হবে। বিল গেটস মহাশয়ের বিল ও মেলিন্দ গেটস ফাউনডেশন আমেরিকা সব থেকে বেশী প্রচুর চাষের জমি কিনেছে। ২০২২ সালে এর শুধু আমেরিকায় পরিমান ছিল ২,৬৮,০০০ একর। আফ্রিকায় বিভিন্ন চুক্তি চাষ চলছে। কৃষি উন্নতির নামে নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে ভারতেও।

২০২০ সালে কোভিড প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে ভারতের সংসদ প্রায় অচল। সংসদে কৃষি সংক্রান্ত আইনের বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়নি, অগণতান্ত্রিক ভাবে ওই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর রাজ্যসভায় ধ্বনি ভোটে পাস করানো হয় কৃষি সংক্রান্ত আইন। সরকার পক্ষের লোকজন বলছেন এক দেশ “একই কর ও এক ধরনের বাজার” হলে ভালো। চুক্তি চাষ, নুন্যতম সহায়ক মূল্য তুলে দেওয়া, অত্যবশকীয় পন্য আইন সংশোধন — এই তিনটি কৃষক বিরোধী কৃষি বিল নিয়েই আন্দোলন। গোটা ভারতে কৃষক সংগঠন সাধারণ অকৃষক মানুষও এটার বিরুদ্ধে সোচ্চার। এর মধ্যে অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশন কমিটি উল্লেখ্য। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা উপেক্ষা করে এক বছরের বেশী সময় ধরে পশ্চিম উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাবের হাজার হাজার কৃষক দলমত ও ধর্মমত নির্বিশেষে দিল্লী ও হিরিয়ানার সীমান্তের সিংঘুতে হাজির হয়ে ওই আইন প্রত্যাহারের জন্য প্রতিবাদ চালিয়েছেন। ধর্ণা ও অবস্থান বিক্ষোভ করেছেন ওই জন বিরোধী আইন পরিবর্তনের জন্য নয়, বাতিলের জন্য। পাজ্ঞাবের মালেরকাটলা থেকে এসে লঙ্গর খুলেছিলেন হাজি মহম্মদ জামিল। ৭০০-র বেশী কৃষক শহীদ হয়েছেন। এই নিয়েও চলছে অনঅভিপ্রেত রাজনৈতিক তর্জা। একবছর ধরে চলা ওই প্রতিবাদ বিক্ষোভ কোন বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ছিল না। যদিও বিরোধী রাজনৈতিকদল গুলি ওই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।

শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর গুরু নানকের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী ওই তিন কৃষি আইন প্রত্যহারের কথা ঘোষনা করেন। হয়ত সেটা করা হয়েছে ভোট রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই। ওই আইন কার্যকর হলে ফসলের দাম বাড়বে কিংবা বাজারে ফসলের যোগান কিছু কোম্পানীর উপর নির্ভর করবে (এক্ষেত্রে তাই)। কৃষকের ও সাধারন মানুষের কল্যানের কথা ভেবে নয়। আজ কৃষকরা ক্ষতি গ্রস্ত হলে আমাজনতাকে ফল ভুগতে হবে। আমজনতা ও অন্নদাতা কৃষকদের নৈতিক জয় হল। ইংরেজ আমলে সংঘটিত হওয়া কৃষক আন্দোলনের মত এই আন্দোলনও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে রাজনৈতিক দল ছাড়াও গনআন্দোলন ফলপ্রসু হয়। দাবী আদায় সম্ভব হয়, দমন পীড়ন মূলক আইনকে প্রত্যাহার করে নিতে সরকারও বাধ্য হয়। কিন্ত সচেতন কৃষকরা কিন্ত আশঙ্কায় রয়েছেন। এরপর নিয়ামকরা আবার কি করেন!
ভারতে ইংরেজ আমল থেকে কৃষকের সমস্যা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে এবং এই সমস্যা কিন্তু আজকের নয় বহুদিন থেকেই। আমাদের অন্নদাতারা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। স্বাধীনতার সময় হয়েছিল তেভাগা আন্দোলন। মূলত দুই বাংলা জুড়েই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। মোট উৎপাদনের তিনের দুই ভাগের দাবি করেছিলেন ভাগচাষিরা। তার আগেও অবশ্য অনেক কৃষক আন্দোলন হয়েছে।

এই প্রবন্ধে সেই সমস্যা জর্জরিত কৃষকের বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও কৃষক আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করব।
ভূমি ব্যবস্থা ও কৃষক
ভারতবর্ষ কৃষি প্রধান দেশ অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ মানুষই কৃষি কাজ করে জীবন ধারণ করেন। ভারতবর্ষের বহু জমি তথাকথিত জমিদার ও নবাব/রাজার নিয়ন্ত্রনের আওতায় ছিল না অর্থাৎ তাঁদের নাগালের বাইরে। সেখানেও মানুষ চাষ করতেন এবং এখনও করছেন। জমিটা সেই অর্থে রাজার নয় কৃষকেরও নয়। বনবাসীরা বনের খাদ্যদ্রব্য ফলমূল সংগ্রহ করতে, তারা নির্দিষ্ট ভূমি খন্ডে চাষও করতেন। ব্রিটিশপূর্ব সময় সরকার জঙ্গলে খাজনা আদায় করত না। জঙ্গল নির্ভর এলাকায় মানুষ খাদ্য, ফলমূল সংগ্রহ করতেন। উত্তর পূর্ব ভারত, ওড়িষ্যার কালাহান্ডি এলাকার পাহাড়ি জায়গায় ঝুম চাষ করা হয় যৌথ ভাবে এখনও। বনভূমিকে সরকার ঘোষনা করছে নিজেদের বলে। এমনকি বানবাসীদের প্রবেশ ও গোচারন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ এমন কোন প্রমান নেই বনবাসীরা জঙ্গলের ক্ষতি করেছে। রামচন্দ্র গুহ ও মাধব গ্যাডগিল মহাশয় Fissured Land: An Ecological History of India বনবাসীদের শাসকের (ইংরেজ ও বর্তমান) বঞ্চনা ও শোষনের বিরুদ্ধে লড়াই এর কথা তুলে ধরেছেন। আদিবাসীদের উপর ইংরেজরা খাজনার দাবী করলে ওনারা বলেছিলেন হাজার হাজার বছর ধরে তারা জমিতে চাষ করছেন, কাউকে কিছু দিতে হয় নি, এখন বাইরে থেকে এসে জুড়ে বসে জমির মালিক হল কি ভাবে? ইংরেজরা লোধাদের বলেছিল “অসংশোধনীয় অপরাধী”। ভেবে দেখুন। সাধারনত আমরা কৃষক আন্দোলনের কথা বলি কিন্ত বনবাসীদের আন্দোলন নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় না। ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ ছিল। উচ্চবর্গের মানুষরা সমতল ভুমির কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারা জমির অধিকার বজায় রাখতেন। পরবর্তীকালে রাজারা এলেন এবং চাষ করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা একটা আদায় করত। সেই অর্থে এখনকার মত কোন জমির কেনা-বেচার স্থায়ী দলিল হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। (চলবে)
কভার ছবি : সোমনাথ হোড়
অনুপম পাল, কৃষি বিশেষজ্ঞ