দলিত এবং কৃষিজীবী মানুষের প্রতিবাদে প্রতিরোধে বার বার থেমে যাচ্ছে ভারতের স্বাভাবিক জনজীবন। তাঁদেরই প্রতিনিধিস্থানীয় এক প্রতিবাদী রমণীর কথা এই প্রতিবেদনে পেশ করা হচ্ছে। তাঁর হাত ধরে আদিবাসী এবং দলিত ভারতের মহাভারত গোটা পৃথিবীর সামনে উপস্থাপিত হলো। কিংবদন্তির আরেক নাম তিজন বাই।
১৯৫৬ সালের ২৪ এপ্রিল অধুনা ছত্তিশগড়ের ভিলাই থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে গনিয়ারি গ্রামে তিজন বাইয়ের জন্ম। তিনি পারধি তফশিলি উপজাতিভুক্ত এক পরিবারের কন্যা। গনিয়ারি অঞ্চলটি ছিল সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়া। পারধিদের সঙ্গে মূল গ্রাম সমাজের জল-অচল সম্পর্ক। ছোঁয়াছুঁয়িতেও হাজার বিধি-নিষেধ। তা ছাড়া তিজন বাই নারী।
তিজনের বয়স যখন ১২ বছর, তখন তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে শেখানো হয়, এখন থেকে স্বামীকে অনুসরণ অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কিশোরী তিজন এই সম্পর্ক অস্বীকার করে। কারণ তাঁর গুরুপ্রদেশে তখন নেশা জেগেছে। ভয়ংকর সে নেশা। তা হলো মহাভারতের নেশা, পাণ্ডবানির নেশা।
পাণ্ডবানি হলো বিশেষ এক গান এবং অভিনয় সংক্রান্ত লোকশিল্প যার ব্যাপক চর্চা হয় ছত্তিশগড়ের (তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ) এইসব অঞ্চলে। পাণ্ডবানি অর্থাৎ পাণ্ডবদের কথা।

তিজনের যখন বয়স ১৩-১৪, তাঁর মাতামহ ব্রিজলাল পারধিকে তিনি গাইতে শোনেন মহাভারতকথা। সে কোন মহাভারত? না, সংস্কৃত বা উচ্চবর্ণের তৎসম শব্দ মেশানো হিন্দি ভাষায় নয়। ছত্তিশগড়ের কবি সবল সিং চৌহান স্থানীয় ভাষায়, গরিব গুরবো-র ভাষায়, দলিত, আদিবাসীর ভাষায় রচনা করেছেন মহাভারত। ব্রিজলাল পারধি গাইছিলেন সেই পাণ্ডবকথা। শুনতে শুনতেই একের পর এক অধ্যায় মুখস্ত হয়ে যায় তিজনের। তিনি স্থির করেন, পাণ্ডবানি গাইবেন।
গোটা গ্রাম তাঁর ওপর খড়গহস্ত। একে নিম্নবর্গের পারধি, তারপরে মেয়ে- সে কি না গাইবে পাণ্ডবানি! গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। খড়কুটো আর বাঁশ দিয়ে ফাঁকা জায়গায় কুঁড়েঘর বানিয়ে তিজন বসবাস শুরু করেন একা। গুরু উমেদ সিং দেশমুখ তিজনের আগ্রহের কাছে হার মানেন। তাঁর কাছেও শিক্ষা করেন তিজন। তার পর ধীরে ধীরে পাণ্ডবানি শুরু করেন। তিনি মঞ্চে গাইতে উঠলে আক্রমণ করে গ্রামের মাতব্বররা। কী করে তিজন এগোবেন?

এহেন পরিস্থিতিতে একজন বলেন, তোমাকে একজনের কাছে নিয়ে যাবো। তিনি যদি বোঝেন, তুমি ভালো পাণ্ডবানি করছো, তাহলে অনেক সুযোগ পাবে। যাঁর কাছে তিজন গেলেন, তিনি হাবিব তানভীর— আধুনিক ভারতীয় নাট্যচর্চার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁর নাটক ‘চরণদাস চোর’, ‘আগ্রা বাজার’ তখন বিশ্বজোড়া সমাদর পেয়েছে।
হাবিব সাহেবকে তরুণী তিজন বাই দেখালেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ এবং দুঃশাসন বধ। এতদিন লোকে জানতো, দুঃসাশনের বুক চিরে দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম রক্তপান করে দ্রৌপদীর চুলে রক্ত মাখিয়ে দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার প্রতিকার করেছিলেন। তিজন শোনালেন, ভীম যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পেড়ে ফেললেন দুঃসাশনকে, তখন উদ্যত অসি হাতে ধেয়ে এলেন দ্রৌপদী নিজে। এই নারীর মধ্যে তখন শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন স্বয়ং মহাকালীকে। কৃষ্ণ বুঝলেন, সৃষ্টি আজ রসাতলে যাবে। তখন মাটিতে হাঁটু গেড়ে জোড়হাতে মহাকালীর বন্দনাগান শুরু করলেন ‘পুরুষোত্তম’ শ্রী কৃষ্ণ। দ্রৌপদীর ক্রোধ, বিদ্রোহ তাঁকে রূপান্তরিত করলো রণচণ্ডিকায়।

মুগ্ধ হাবিব তানভীর বললেন, এ তো অভূতপূর্ব। পাণ্ডবানি শুনেছি, কিন্তু তিজনের পাণ্ডবানি অকল্পনীয়। হাবিব বললেন, জামাকাপড় গোছাও, তোমাকে যেতে হবে একজনের কাছে। তিনি জানুন যে দলিত ভারতবর্ষ জাগছে। তার পর হাবিব তানভীরের সঙ্গে ট্রেন ধরে দিল্লি গিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পাণ্ডবানি উপস্থাপন করলেন তিজন বাই। মুগ্ধ শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বললেন, এভাবে মহাভারতের কথা কেউ কখনও শোনায়নি।
তার পর তো তিজন পৌঁছোলেন এডিনবরো ফেস্টিভালে। সারা পৃথিবীর রসজ্ঞ মানুষের সামনে মেলে ধরলেন মহাভারতকথার শাখা প্রশাখা। সমাজ-পরিত্যক্ত তিজন আজ পদ্মভূষণ সম্মানের অধিকারী। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, সব মেয়েরাই চাইলে এমনটা হতে পারে, সে হোক না নিচু ঘরের। আসলে দলিত মানুষের মহাভারত নির্মাণ করলেন তিজন বাই।