“জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বনেদিয়ানা অনেকদিনের। মা লক্ষ্মীর পদ্মের অনেকগুলি সোনার পাপড়ি দ্বারকানাথের ঘরে এসে পড়ার আগে পর্যন্ত এই বাড়িটে বোধহয় ধনে-মানে আর পাঁচটা ধনীগৃহের তুলনায় স্বতন্ত্র ছিল না। দ্বারকানাথের মনটিও ছিল সেকালের বাবুদের মতোই দরাজ। বেপরোয়া খুশির প্রমোদে গা ঢেলে দিয়ে কতবার তাঁর সাজানো বাড়িতে বসেছে রাজকীয় ভোজসভা। একা দ্বারকানাথের ডিনার বাবদই নাকি খরচ হতো তিনশ টাকা। অপরদিকে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে দিগম্বরী দেবী আহার করতেন স্বপাকে, একবেলা। পরাণ ঠাকুর তাঁর রান্নার সামান্য উপকরণ গুছিয়ে দিত হাতের কাছে। সদর ও অন্দরের এই বৈপরীত্যই বোধহয় তৎকালীন ধনী পরিবারের স্বাভাবিক চিত্র।” — জানা যায় চিত্রা দেবের লেখা থেকে।

বেগুন পোস্ত
প্রশ্ন জাগে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক ফেল করার পরেও কি মহর্ষি পরিবারে এ রীতি অক্ষুণ্ণ ছিল? না অনের অদল বদল হয়েছিল। ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক-এর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবার পর এই পরিবার আর্থিক দুর্দশার সম্মুখীন হয়। সেই সময় দেবেন্দ্রনাথ ডিনারের সমারোহ বন্ধ করে দিয়ে ডাল-রুটি খাওয়ার প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালেও ঠাকুরবাড়ির রোজকার ব্যঞ্জন ছিল ডাল, মাছের ঝোল ও অম্বল। বড়ি ভাজা, পোর ভাজা, আলু ভাজা ছিল ভোজের অঙ্গ। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী লিখছেন — “একবার জমিদারীর আয় কমে গিয়েছিল। তখন আমার শ্বশুর বলে পাঠালেন বউদের রান্না শেখাও।” এমনিতেও প্রত্যেক মহলে আলাদা আলাদা রান্নার ব্যবস্থা ছিল, তোলা উনুনে গিন্নীরা নিজের নিজের রুচি ও স্বামীর ফরমাশ অনুযায়ী নানারকম রান্না করতেন। এরপর মহর্ষির নির্দেশে বাড়ির প্রতিটি কন্যা এবং বধূকে রান্নার তালিম নিতে হতো। রন্ধনপটিয়সী এক আত্মীয়া বধূদের শিক্ষার ভার নিয়েছিলেন। পছন্দমতো রাঁধবার জন্যে কন্যা এবং বধূরা প্রতিদিন প্রত্যেকে একটি করে টাকা পেতেন। মাছ ও শাক-সব্জি কেনা হতো সেই টাকায়। মহর্ষি পরিবার ব্রাহ্ম হলেও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের আনন্দ বর্জন করা হয়নি। সাবেকী আমল থেকে যে সব নিয়ম চলে আসছে সেগুলি সবই পালিত হতো এখানে।

লাউ পোস্ত
কার্তিক মাসে ভাইফোঁটা, অগ্রহায়ন মাসে নবান্ন, পৌষমাসে পিঠেপার্বণ, মাঘমাসে মাঘোৎসব তো ছিলই, সরস্বতী পুজো পুরুষমহলে সারস্বত সম্মেলনে পরিণত হয়েছিল, বসন্তোৎসবের আবির খেলা বা নববর্ষের মিলনোৎসবও বাদ যায়নি। এদের ধর্মীয় দিনটিকে গ্রহণ না করলেও আনন্দানুষ্ঠানকে বর্জন করেননি মহর্ষি। ঠাকুরবাড়িতে একসময় অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে রন্ধনশিল্পও চরমোৎকর্ষ লাভ করেছিল। দেশী, বিলিতি রান্না তো বটেই সেই সঙ্গে বাড়ির নারী এবং পুরুষেরাও নানারকম নতুন রান্না আবিষ্কারের নেশায় মেতে ওঠেন। মহর্ষির নিজেরও এ অভ্যাস ছিল। প্রথম দলে যাঁরা ব্রাহ্ম হয়েছিলেন তাঁদের নিয়ে তিনি চাঁদ দানির বাগানে যেতেন মাঝে মাঝে। বামুন-চাকর সঙ্গে যেত, গাছতলায় উনুন খুঁড়ে রান্নাবান্না হতো। কেউ কেউ শখ করে রাঁধতেন। উপাসনার পর রান্নার আয়োজন হলে মহর্ষি একবার বললেন, “পায়েসটা আমি রান্না করব ; আমি পায়সান্ন পরিবেশন করে খাওয়াব সবাইকে।” রান্না হলো। খেতে বসে সবাই চুপ। দেবেন্দ্রনাথ বললেন, ” কী কেমন হয়েছে পায়েস? ভাল হয়েছে তো?” সবাই ঘাড় নাড়লেন, ভালো হয়েছে। একজন বলে ফেললেন, “তবে একটু ধোঁয়ার গন্ধ।” দেবেন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “ধোঁয়ার গন্ধ হয়েছে তো ? ওইটিই আমি চাইছিলুম, আমি আবার পায়েসে একটু ধোঁয়াটে গন্ধ পছন্দ করি কিনা।” আসলে পায়েসটা রান্নার সময় ধরে গিয়েছিল।

বেগুনবড়া দিয়ে সুক্তোনি
নতুন নতুন রান্নার ‘একসপেরিমেন্ট’ করতে ভালবাসতেন রবীন্দ্রনাথ এবং অবনীন্দ্রনাথ দুজনেই। তাঁদের অনেক গল্পই আমরা শুনেছি। রান্নাঘরে মোড়ায় বসে কবি স্ত্রীকে নতুন রকমের রান্নার ফরমাশ করতেন। মৃণালিনীদেবীর গৃহিণীপনায় সব রান্নাই উতরে গেলে কবি তাঁকে রাগাবার জন্য বলতেন, “দেখলে, তোমাদেরই কাজ, তোমাদের কেমন এই একটা শিখিয়ে দিলুম।” পরবর্তীকালে কবি প্রতিমাদেবীকে বলতেন, “বৌমা, তোমার শাশুড়িকে আমি কত রান্নার মেনু জোগাতুম, আমি অনেক রান্না তাঁকে শিখিয়েছিলুম, তোমরা বিশ্বাস করবে না জানি।” বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা বলতেন, “তিনিও তো খুব ভালো রাঁধিয়ে ছিলেন, আমরা শুনেছি।” কবি হেসে বলতেন, “তা ছিলেন নইলে আমার মেনুগুলো এত উৎরত কী করে ?’

কড়াইশুঁটির চপ
ঠাকুরবাড়িতে মেয়েরা পুরুষদের সামনে বা একসঙ্গে বসে কখনও খেতেন না। সেটাই ছিল তখনকার দস্তুর। মহর্ষি পরিবারে এই রীতিটি তুলে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তাঁর ইচ্ছের কথা জানতে পেরে মহর্ষিই সে ব্যবস্থা করে দেন। সৌদামিনী লিখেছেন, “বাড়ির ছেলেমেয়েরা সকলে একসঙ্গে বসিয়া খাইবে মেজদাদার এই ইচ্ছা জানিতে পারিয়া পিতৃদেব একটি বড় ঘরে খাইবার স্থান নির্দেশ করিয়া আমাদের সকলের একত্রে খাওয়া নিয়ম করিয়া দিলেন। প্রথম প্রথম আমরা লজ্জায় খাইতেই পারিতাম না — অল্প কিছু মুখে দেয়া বসিয়া থাকিতাম, ক্রমে ক্রমে আমাদের লজ্জা ভাঙিল।”
শুধু তাই নয়, রান্না সম্বন্ধে নানারকম পরীক্ষার পালাও শুরু হয় এসময় থেকে। হেমেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে প্রজ্ঞাসুন্দরী শুধু রন্ধন পটিয়সী ছিলেন না, রান্নার বইও লিখেছিলেন। তাঁর বইয়ের অধিকাংশ রান্নাই ঠাকুরবাড়িতে হতো। এ বাড়ির সব রান্নাতেই মিষ্টি পড়ত বেশি, মশলা রুচিভেদে কোথাও বেশি, কোথাও কম। রবীন্দ্রনাথের জন্য রান্না করা খুব শক্ত ছিল। মিষ্টি তিনি পছন্দ করতেন না। মশলা ছাড়া স্বাদু ঝোল তিনি ভালবাসতেন। চৈয়ের গন্ধ, মৃদু ঝাল স্বাদ তাঁর প্রিয় ছিল। যশোরের এই বিশেষ মশলা বা শিকড়টি পাওয়া যেত শীতের দিনে। ঠাকুরবাড়িতে গরমকালে চায়ের পাট ছিল না। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও বলেছেন, “শীতকালে আমাদের চায়ের বরাদ্দ ছিল। এ চা চীনদেশের চা — তখনও আসামের চা আমাদের দেশে প্রচলিত হয় নাই। সে চায়ের কী সুগন্ধ।” সারা বছরের খাবারের মধ্যে বৈচিত্র আনতে গরমকালে যেমন শীতকালের কথা ভেবে তৈরি করে রাখা হতো আমসত্ত্ব, আমচুর, আমের আচার বা কাসুন্দি, আবার একই ভাবে শীতকালে গরমকালের কথা ভেবে তৈরি করে রাখা হতো বড়ি, কুলকুটো, কুলের আচার, তিলকুটা, গুলকুল, গুড় তেঁতুল ইত্যাদি। এই বাড়িতে ফুলকপি, আলু, সিম দিয়ে আচার হতো — সবগুলো কেটে একসঙ্গে সেদ্ধ করে মশলা ও তেল দিয়ে।

ফুলকপির পাতুরি
রবীন্দ্রনাথের মতো অবনীন্দ্রনাথও রান্নার একসপেরিমেন্ট করতেন। বাড়ির ছোটদের নিয়ে তিনি যেমন রান্নার ক্লাস খুলেছিলেন তেমনি নিজেও বই দেখে রান্না শেখাতেন অন্যদের। অবনীন্দ্রনাথ প্রচলিত রান্নাকে একটু আধটু উল্টে পাল্টে নতুন রান্না তৈরি করতেন। যেখানে প্রথমে পেঁয়াজ ভাজবার কথা, সেখানে ভাজতেন শেষে। যেখানে সেদ্ধ করার কথা সেখানে ভেজে ফেলতেন, এভাবেই তৈরি হয়েছিল নুতন পদ — মুরগীর মাছের ঝোল আর মাছের মাংসের কারি। ঠাকুরবাড়ির অধিকাংশ মানুষেরই প্রিয় খাদ্য ছিল স্নাইপরোস্ট।
ঠাকুরবাড়ির পিঠে একটু অন্যরকম হতো। যেমন ধরা যাক সেদ্ধপিঠে। চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে গড়ে তাতে ক্ষীর-নারকেলের পুর দিয়ে জলের ভাবে সেদ্ধ করে তৈরি হয় সেদ্ধপিঠে, সেই পিঠে খাওয়া হতো নলের গুড়ের রসে ডুবিয়ে। কিন্তু ঠাকুর বাড়িতে সেদ্ধপিঠেটিকে আবার সেদ্ধ করা হতো দুধ ও গুড় মেশানো পাতলা ক্ষীরের সঙ্গে। তাতে স্বাদ বাড়ত, পিঠের নামও বদলে হতো ক্ষীরপিঠে। পাটিসাপটাও ভাজার পরে রসে ফেলা হতো। এছাড়া নানা রকম পায়েস হতো এই বাড়িতে। যেমন কমলালেবুর পায়েস, আতার পায়েস, আখের পায়েস, খেঁজুর গুড়ের পায়েস প্রভৃতি। ঠাকুরবাড়ির সৃষ্টি করা উল্লেখযোগ্য কিছু রান্না হলো — বেগুন পোস্ত, লাউ পোস্ত, বেগুনবড়া দিয়ে সুক্তোনি, কড়াইশুঁটির চপ, টমেটো মাছ, ফুলকপির পাতুরি, কপি কড়াইশুঁটি বড়া, টমেটো ভাপা, শিমের পোরভাজা, লাউয়ের কোপ্তাকারি, কড়াইশুঁটির ধোঁকা, লাউপাতা ভাজা ইত্যাদি। এর সব রান্নাই হয়ত ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব নয়, বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মতো এও মিশে গেছে ঠাকুরবাড়ির ভোজনরসিক মানুষের শিল্পরুচির সঙ্গে।
কভারের ছবি টমেটো মাছ
দারুণ সব মুখরোচক রান্না। খুব ভালো লাগলো।