জাতিবর্ণ বিভাজিত হিন্দু সমাজ, অস্পৃশ্যতা এবং কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় মতুয়া ধর্ম আন্দোলন। হরিচাঁদ ঠাকুর ছিলেন মতুয়া আন্দোলনের স্রষ্টা। হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল ১৮১২ সালে (১২১৮ বঙ্গাব্দ) পূর্ববঙ্গ অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার সফলডাঙ্গা গ্রামে।
উচ্চ বর্ণবাদ বিরোধী অনেক আন্দোলন বাংলার ধর্মীয় ও সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চায় তেমন ভাবে আলোচিত হয়নি সে সব আন্দোলনের কথা। মতুয়া আন্দোলন ছিল এই ধারার সবচেয়ে ক্ষুরধার এক প্রকাশ। হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের মত ধুরন্ধর দুই যুগপুরুষের নেতৃত্ব সংগঠিত মতুয়া আন্দোলন বাংলার রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখতে পেরেছে। এখন তো জাতপাত ভিত্তিক রাজনীতিকে যারা বিষবৎ পরিত্যাজ্য মনে করেন তারাও মতুয়াদের পাশে পেতে কম ঘাম ঝরাচ্ছেন না! রাজনীতির ঘনীভূত আধারে মতুয়া সম্প্রদায় এখন এক সম্পদ বিশেষ!
বর্ণ বিভক্ত সমাজ ধর্মকেই হরিচাঁদ ঠাকুর বেছে নেন তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে। এর আগে অনুন্নত শ্রেণির নিজস্ব কোন ধর্ম ছিলনা। হরিচাঁদই পতিত ও অনুন্নত শ্রেণির মানুষের জন্য নিজস্ব ‘মতুয়া’ ধর্মের প্রচলন করেন। ধর্ম-কর্মে যারা মাতোয়ারা তারাই মতুয়া। পতিত মানুষের মুক্তির জন্য একদিকে লোকধর্ম এবং অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের বিশাল ক্ষেত্র। তাই মতুয়ারা দ্বিজ- কর্মের ও ধর্মের। মতুয়া সমাজ বিপ্লবের প্রতীক ‘ডঙ্কা, শিঙা ও লাল নিশান।’ আপাতদৃষ্টিতে এই আন্দোলন ধর্মীয় হলেও অন্তর্বস্তুতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক। হরিচাঁদ ঠাকুর এই লোকধর্মের সূচনা করেন।
বাংলার নিম্নবর্ণের নমঃশূদ্র, কাপালি, পৌন্ড্র, নোয়ালা, মালো ও মুচিদের মধ্যে মতুয়া আন্দোলন জনপ্রিয় হয়। অবশ্য এর প্রধান ভিত্তি ছিল নমঃশূদ্ররা। সংখ্যার দিক থেকে নমঃশূদ্ররা ছিল পূর্ববাংলার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। হরিচাঁদের বার্তা কৃষিজীবি ও মৎস আহরণকারী নমঃশূদ্রদের মধ্যেই বেশি প্রভাব ফেলেছিল।
‘হাতে কাম মুখে নাম’— এই কথার মাধ্যমে হরিচাঁদ বলেন যে নমঃশূদ্ররা কারোর চেয়ে হীন বা নীচু নয়। কাজ করা বড় ধর্ম, শ্রমে অংশ নাও, গার্হস্থ জীবনে থাকো। কারও কাছে দীক্ষা নিওনা, তীর্থস্থানেও যেতে হবেনা। ঈশ্বরসাধনার জন্য ব্রাহ্মণদের প্রয়োজন নেই। সে সময় এসব কথা বলা ছিল পাপ, ধর্মদ্রোহীতার সামিল। সেক্ষেত্রে হরিচাঁদ ছিলেন এক ‘রেবেল’, যিনি এক নতুন ধর্ম বিপ্লবের সূচনা করেন।
তিনি প্রচলিত উচ্চ বর্ণের হিন্দু ধর্ম তত্ব অস্বীকার করে ‘দ্বাদশ আজ্ঞার’ মাধ্যমে নিপীড়িত, অবহেলিত মানুষের সামনে এক নতুন পথ খুলে দেন। তাঁর দ্বাদশ আজ্ঞা ছিল— (১) সত্য বলবে (২) সৎ পথে চলবে (৩) পিতা মাতাকে সম্মান করবে (৪) ভাই বোন, স্বামী ও স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে (৫) এক স্বামী বা এক স্ত্রী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে (৬) সব মানুষই আত্মীয়, কারোর প্রতি বৈষম্য করবে না (৭) গার্হস্থ কর্ম কর, সন্যাসের প্রয়োজন নেই (৮) দীক্ষা নিও না (৯) গুরুর প্রয়োজন নেই (১০) তীর্থস্থানে না গেলেও ঈশ্বর লাভ সম্ভব (১১) অপরের দুঃখ দূর করার চেষ্টা কর (১২) সব জীবের প্রতি সদয় হও।
হরিচাঁদ দেখেছিলেন নিম্নবর্ণের মানুষ বলে তাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের কোন ব্যবস্থা নেই। উচ্চ-বর্ণের বিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই তিনি নিজেদের উদ্যোগে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রসর হন। মতুয়াদের চারণকথায় এর উল্লেখ আছে—
তরিতে কাঙালজনে বুকে দিতে আশা
অন্ধপ্রাণে দিতে আলো মূক মুখে ভাষা
মরা দেহে দিতে প্রাণ জাগাতে সবারে
প্রাণদাতা হরি এল সফলা নগরে।
মতুয়া ধর্মান্দোলনের শুরু থেকে ধর্ম কর্ম সাধন ভজনে নারীর সমানাধিকারের কথা বলেন হরিচাঁদ। নারী পুরুষের ভেদাভেদ অগ্রাহ্য করে তিনি বলেন— ভেদাভেদ জ্ঞান নাই নারী কি পুরুষ। শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত তে বলা হয়েছে—
মেয়ে পুরুষেতে বসি একপাতে খায়।
মেয়েদের এঁটো খায় পদধূলালয়।।
ব্যতিক্রমী মতুয়া ধর্মে হরিচাঁদের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ‘করিবে গৃহস্থ্য ধর্ম লয়ে নিজ নারী’, ‘সংসার মাঝে তুই কারও দায়ী নাই/ একমাত্র দায় রইলি রমণীর ঠাঁই। হরিচাঁদের মতুয়া ধর্মে মানুষকেই মুখ্য করা হয়েছে। সমাজে পতিত নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য স্ত্রী শান্তা দেবীকে তিনি নির্দেশ দেন – আমি শিক্ষা দিব যত পুরুষের দলে/নারী শিক্ষা পাবে তব ছায়া সুশীতলে। নারী মুক্তি প্রচেষ্টায় রানমোহন ও বিদ্যাসাগরের অবদানকে আত্মসাৎ করেছিল উচ্চবর্ণবাদী মধ্যবিত্ত সমাজ, হরিচাঁদের প্রচেষ্টা নাড়া দিয়েছিল অজ্ঞাত-কুলশীল সমাজের নীচের অংশকে।
পতিত জমি উদ্ধার ও আবাদ করার কাজে কৃষকরা যাতে উদ্যোগী হয় সেজন্য হরিচাঁদ নিজেই লাঙল নিয়ে পতিত জমি আবাদ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি অর্থনীতি সম্পর্কেও সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই মতুয়ারা ব্যবসা করুক, স্বাবলম্বী হলে তারা উচ্চবর্ণের প্রতিস্পর্ধী শক্তি হবে বলে মনে করতেন। হরিচাঁদের সময়কালে দেশের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসা বিদ্যা ছিল অনুন্নত। আর অজপাড়াগাঁয়ে চিকিৎসার কোন সুযোগই ছিলনা। ব্যাধিমুক্ত জীবনের জন্য হরিচাঁদ নানা উপদেশ দেন। পোশাক পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন রাখা, ময়লা জল না খেতে ও মহামারীর সময় জল ফুটিয়ে খেতে তিনি পরামর্শ দেন।
ধর্মের মোড়কে বস্তুবাদী দর্শনের কঠিন অনুশীলন, হরিচাঁদ ঠাকুর এই কঠিন বস্তুবাদী দর্শনের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন মানুষের জীবনে। গড়ে তুলেছেন এক প্রানবন্ত সমাজ যার জায়মান যাপনে লৌকিক শিক্ষা আজও মানুষকে প্রেরণা দেয়।