মুনি-ঋষিদের কালে বিবাহ বিষয়টি আমরা গল্পে পড়েছি। খ্রিস্টপূর্ব ২৩৫০ শকাব্দে মেসোপটেমিয়াতে প্রথম ‘বিবাহ’-এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সময় থেকেই বিবাহ হচ্ছে আত্মার বন্ধনকে দৃঢ় করে একজন পুরুষ ও মহিলার মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তির আত্মপ্রকাশ। রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার বিয়ের কথা আমরা সকলেই জানি। সেই সময় বিজ্ঞান ও চিকিৎসা এবং সর্বোপরি মানুষের বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণার বিকাশ সেইভাবে হয়নি। ফলে বিবাহ পরবর্তী পর্যায়ে আগামী প্রজন্মের রোগ-ব্যাধি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ সেইভাবে ছিল না। এমন কি স্বামী-স্ত্রী-র সম্পর্ক স্থাপনের আগে নিজেদের শারীরিক ব্যাধি নিয়েও কোনওরূপ চর্চা হত না। তবে কি সেকালে কোনও রোগ-ব্যাধি ছিল না?
আলোচ্য নিবন্ধে মারণরোগ থ্যালাসেমিয়ার সঙ্গে বিবাহের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছি। থ্যালেসেমিয়া রোগটি হল জনঘঠিত এবং বংশগত মারণরোগ। এই মারণরোগে আক্রান্ত শিশুদের আয়ুষ্কাল সাধারণত ৫, ১০, ১৫ বছর। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানো কোনও শিশুর জন্য প্রথমত তাঁর বাবা-মা-র অজ্ঞানতাকেই দায়ী করতে হয়। বাবা-মা-র সচেতনতার অভাবেই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম হয়। থ্যালাসেমিয়া রোধের জন্য দরকার জন্মের এক বছর পর থেকে বিবাহের আগে পর্যন্ত যে কোনও সময়ে প্রত্যেকের একবার থ্যালাসেমিয়া বাহক রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। এই রক্ত পরীক্ষার নাম এইচ.বি ইলেকট্রোফোরেসিস।
পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে জিন-এর কথা বলা হয়েছে। অতীতেও জিনের সমস্যা ছিল, এখনও রয়েছে। থ্যালাসেমিয়া একটি জিন গঠিত রোগ, সেটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। জিন হচ্ছে ডিএনএ-র অংশ যা একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে সূচিত করে। জিনটি অ্যালিল নামক বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে এবং পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত দুটি অ্যালিলের সংমিশ্রণ একটি জিনোটাইপকে উপস্থাপন করে। জিনোটাইপের পার্থক্যগুলো পৃথক পৃথক ব্যক্তির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পর্যবেক্ষনযোগ্য পার্থক্যগুলোর সাথে সামঞ্জস্য। থ্যালাসেমিয়া একটি অটোসোমাল রিসিসিভ পদ্ধতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়, তবে উত্তরাধিকারটি বেশ জটিল হতে পারে, কারণ একাধিক জিন হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। অতীতেও এই মারণ রোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘অমল ও দইওয়ালা’তে আমরা অমলের অসুস্থতার কথা পড়েছি। অমলও উত্তরাধিকার সূত্রে হয়ত সেই রোগ পেয়েছিল!
এইচ.বি ইলেকট্রোফোরেসিস রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে যদি দেখা যায় আপনার সন্তান বা প্রিয়জন এই উপসর্গের বাহক, তাহলে অবশ্যই দেখে নিতে হবে যার সঙ্গে আপনার সন্তান বা প্রিয়জনের বিবাহ হবে সে যেন বাহক না হয়। পাত্রপাত্রী উভয়েই যদি RH Negative হয় তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের কোন বিপদের আশঙ্কা নেই। কিন্তু এর ব্যতিক্রম যদি হয় অর্থাৎ যদি পাত্র RH Positive এবং পাত্রী RH Negative বা তার উল্টো হয়, তবে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা না হলেও দ্বিতীয় সন্তানের সময় মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে, এমন কী সন্তানের মৃত্যুও হতে পারে। ধরা যাক, দু’জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে এবং পাত্রী সন্তানসম্ভবা। এক্ষেত্রে গর্ভস্থ সন্তান থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা, কিংবা এই মারণরোগ নিয়ে পৃথিবীতে সে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে কিনা তা জানতে তিনটি উপায় রয়েছে।
সেকালে পাত্র-পাত্রীর বিবাহের আগে রক্তপরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার কোনও প্রচলন ছিল না। এখনও যে এই ধরণের ঘটনা ঘটে থাকে তা নয়। কিন্তু আধুনিক মনস্ক মানুষের কাছে বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতির নিরীখে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এই চেতনার উন্মেষ হচ্ছে। সেই কারণেই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর শরীরে রক্তের গ্রু’প RH factor দেখে নেওয়া আবশ্যিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ‘যদিতং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম’ এই মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে মনের মিলন হোক ক্ষতি নেই কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে সুস্থ মানুষের বাসযোগ্য স্থান করে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই থ্যালাসেমিয়া বাহক রক্ত পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া উচিত। আপনি আপনার শরীরের অভ্যন্তরে মারণ বীজ বহন করছেন কি না। যদিও থ্যালাসেমিয়া বাহক কোন রোগ নয়। কিন্তু আরেকজন বাহকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়া, নৈব নৈব চ।