| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি… : প্রসেনজিৎ দাস

Reporter
প্রসেনজিৎ দাস / ৪৬৮ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

আজ থেকে বছর উনিশ আগের কথা। সদ্য দ্বাদশ শ্রেণী উত্তীর্ণ হয়ে বেতাই ড. বি. আর আম্বেদকর কলেজের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলাম অনেকটা চ্যালেঞ্জ করেই। দ্বাদশ শ্রেণীর পর বাবা বলেছিলেন, — ”তোমাকে আর কলেজে ভর্তি হতে হবে না। ভর্তি হবার টাকা আমার কাছে নেই।” জলভরা চোখে সেদিন বাবার চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম ”আমি ভর্তি হবই। তোমাকে টাকা দিতে হবে না। আমিই টাকা ম্যানেজ করে নেব।” জোর দিয়ে বলার একটা কারণ অবশ্য ছিল। উচ্চমাধ্যমিক দেবার আগে থেকেই রীতিমতো দু-বার করে টিউশন পড়াই। সেই ভরসায় বাবার চোখে চোখ রেখে জবাব দিয়েছিলাম। শেষে বাবা হেরে গিয়েছিলেন আমার কাছে। ভর্তির একত্রিশশো পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত।

নবম শ্রেণী থেকে আমি অঙ্কে রীতিমতো সন্তোষজনক মার্কস্ তুলতে লাগলাম। তার আগ পর্যন্ত অঙ্ক সম্পর্কে আমার যে কী ভীতি ছিল তা বলে বোঝানোর নেই। মনে পড়ে ক্লাস সিক্সে ২১ পাওয়ার কথা, আর ক্লাস সেভেনে ২৭ পাওয়ার কথা। অঙ্ক মানে আমার কাছে ছিল এক বিভীষিকা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পের সুকুমারের কথা আমাদের মনে পড়ে। অঙ্কের মাস্টারমশাই তাদের কাছে ছিলেন বিভীষিকা স্বরূপ। তাঁর প্রকাণ্ড হাতের প্রকাণ্ড চড় খেয়েও ছাত্রছাত্রীরা কাঁদতে সাহস পেত না। কাঁদলে তিনি বলতেন, — “পুরুষ মানুষ হয়ে অঙ্ক পারিস না, তার উপর কাঁদতে লজ্জা করে না। এক্ষুণি পা ধরে স্কুলের পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দেবো।” আমাদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। একে অঙ্ক পারি না; তার উপর চোখ রাঙানি, তর্জন-গর্জন। আমাদের মাস্টারমশাই আবার বলতেন প্লেটোর একটা কথা — “অঙ্ক হইল আত্মার ঔষধ, অঙ্ক না শিখিলে দর্শন বোঝা যায় না।”

মাঝে মাঝে, কী যে বিড়বিড় করে বলতেন সকলে বুঝত না। বুঝেছিস বললেই মার খাওয়ার ভয়ে আমরা তৎক্ষণাৎ ইতিবাচক মাথা নাড়তাম। এভাবেই না বোঝার বোঝা ঘাড়ে নিয়েই পিঠ কুঁজো করে বাড়ি ফিরতে হত। বিশেষত অ্যারেথমেটিক। আর জিওমেট্রির কথা উঠলেই তো আমি সেখানে নেই। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। অ্যালজেব্রা মোটামুটি বুঝতাম। কিন্তু ওই সন্তোষজনক। মনে পড়ে তখন ক্লাস সিক্স। প্রাইভেট টিউশনে গেছি। সরল অঙ্ক না প্র্যাকটিস করে যাওয়ায় ওখানে করতে পারিনি। সেদিন তো স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলই উপরন্তু কান ধরে উঠবোস, কাচা কঞ্চির বাড়ি, কটু বাক্যটাও হজম করতে হল নির্দ্বিধায়। বদমাশ নিয়ম তখনও রপ্ত করতে পারিনি। যাই হোক রপ্ত করতে বেশিদিন লাগেনি। এভাবেই একদিন দেখতে দেখতে ক্লাস এইট। একলাফে অঙ্কে অভাবনীয় পোগ্রেস। একলাফে সাতাশ থেকে ঊনষাট। এই সময় বাবা বাহবা দিয়েছিলেন, — ” হবে তোর, আরেকটু ধরে ধরে প্র্যাকটিস কর।” ক্লাস নাইনেও অঙ্কে ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। শেষে মাধ্যমিকে এসে ৮০ তে ঠেকেছিল। কিন্তু এখানে এসেও একটা আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল আমার। ত্রিকোণমিতি আর সমানুপাতের অঙ্কগুলি, যেগুলো আমার অত্যন্ত প্রিয় ছিল, সেই দুটি অঙ্কই আমি ভুল করে এসেছিলাম। না হলে ৮০-র কোঠাটা হয়তো ৯০-এ গিয়ে ঠেকত। এই আক্ষেপটা আমার এখনও আছে। হয়তো যতদিন আছি ততদিনই থাকবে। অনেকে প্রশ্ন তুলবেন কলেজ জীবনের স্মৃতিকথা লিখতে বসে হঠাৎ অঙ্ক নিয়ে পড়লাম কেন? হ্যাঁ, এবার বলব সেই ইতিহাস। তাই একটু ভনিতা করলাম আর কি। নবম শ্রেণীর পর থেকেই অঙ্কের প্রতি অদ্ভুত এক ভালোবাসা জন্মাল আমার। দশমে উঠে সেই ভালোবাসা আরো অনেকটা বেড়ে গেল। সঙ্গে ভৌতবিজ্ঞান আর জীবন বিজ্ঞানের প্রতিও অদ্ভুত একটা টান অনুভব করতাম। মাধ্যমিকে ঘন্টার পর ঘন্টা অঙ্ক, ভৌতবিজ্ঞান আর জীবনবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়ে আর্টস টিচারের কাছে পড়া মুখস্থ না হওয়ায় বকা খেয়েছি। টেস্টের পর টেস্ট পেপার সলভ করতে গিয়ে বাড়িতে বাবার তিরস্কারও হজম করতে হয়েছে। না পড়ে খালি অঙ্ক করা। আমরা কিছু বুঝি না তাই না! যাইহোক বেগম রোকেয়ার লুকিয়ে বাংলা, ইংরেজি শেখার মত লুকিয়ে-চুরিয়ে আমার অঙ্ক কষা। তাই এর প্রতি ভালোবাসার টানটা অটুট ছিল। মাধ্যমিক পাশ করার পর বাবাকে সাইন্স নিয়ে পড়ার কথা জানালাম। বন্ধুরা অনেকে সাইন্স নিয়ে ভর্তি হচ্ছে ভালো স্কুলে। আমিও হব।

বাবার সটান জবাব, —” সাইন্স নিয়ে পড়তে অনেক খরচ।” প্রথমেই বাবা মুড়ো মেরে দিলেন। দমে গেলাম। যদিও তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটি পড়া ছিল। সদ্য পড়েছি সেই পঙ্‌ক্তিগুলো —

“আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ

র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,

আঠারো বছর বয়সেই অহরহ

বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।

আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়

পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,

এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-

আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।”

তবুও সেদিন বাবার মুখে মুখ রেখে কথা বলার সাহস হয়নি সেই বছর আঠারোর যুবকটির। তাই সদ্য ‘কর্ণকুন্তি সংবাদ’ পড়ে আসা ছেলেটা নিজেকে পরাজিত নায়ক কর্ণ ভেবে ‘আমি রব নিস্ফলের হতাশার দলে’ উচ্চারণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পেল না। মনের অদম্য ইচ্ছেগুলো জলাঞ্জলি দিয়েই বেতাই উচ্চ বিদ্যালয়েই আর্টস নিয়েই ভর্তি হতে হল। অঙ্কের স্বাদ ইকোনোমিক্স অনেকটা মেটাল, যাকে বলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। উচ্চ মাধ্যমিকে আমার প্রিয় বিষয় ছিল ইকোনোমিক্স আর সংস্কৃত। দুটোতেই ভালো নম্বর উঠেছিল। বাংলা বিষয়টা বরাবরই আমার ভালো লাগত না। তাই মনের কোণে একটা সুপ্ত ইচ্ছে বাসা বেঁধেছিল সংস্কৃত নিয়েই অনার্স করব। কিন্তু সে গুড়ে বালি। বেতাই কলেজে তখনও সংস্কৃত বিষয়টা আসেনি। তার উপর বাবার নিদান — কলেজে ভর্তি হতে হবে না। সব মিলিয়ে অন্য কলেজে গিয়ে সংস্কৃত নিয়ে পড়ার সুপ্ত বাসনাকে বলি দিতে হয়েছিল। চোখের কোণে জল নিয়েই এই বছর আঠারোর সেই যুবক বাবাকে চ্যালেঞ্জ করেই বাংলায় অনার্স নিয়েই শেষমেশ বেতাই কলেজে ভর্তি হয়। যে বিষয় তার অপছন্দ, শেষ পর্যন্ত সেই বিষয় নিয়েই অনার্স! বড়দের মুখে বলতে শুনতাম বাংলা নিয়ে পড়ে কোনো কেরিয়ার নেই। পবিত্র সরকারও নাকি বলেছেন এর থেকে তেলেভাজার দোকান দেওয়া ভালো। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বিষয়টার প্রতি ভালোবাসা জন্মাল কয়েকজন ভালো অধ্যাপক আর গেস্ট লেকচারারদের সাহচর্যে। মনে পড়ে বাংলা অনার্সের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসের কথা। অমলবাবুর বাংলার ক্লাস। সম্ভবত তাঁর বাড়ি নদিয়ার শান্তিপুর। ‘স’ এর টান দেখলেই সেটা টের পাওয়া যেত। তবে তিনি শুদ্ধ বাংলা বলতেন সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্লাসে ঢুকেই উনি আমাদের দুটো বানান লিখতে দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্লাসভর্তি ছেলে-মেয়ের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন বানান দুটি লিখতে পেরেছিল। শব্দদুটি হল — ‘ন্যূনতম’ ও ‘ভর্ৎসনা’। ন্যূনতম এই জ্ঞানটুকুও না থাকার জন্য তাঁর কাছে সেদিন আমাদের ভর্ৎসিত হতে হয়েছিল। মনে পড়ছে আসাদ বাবুর ভাষাতত্ত্বের ক্লাস। অপূর্ব শ্রুতিমধুর উচ্চারণ ভঙ্গিমা আমি আজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের মধ্যে পাইনি। মনে পড়ছে মলয়বাবুর সাহিত্যের ইতিহাসের পাঠ সরস ভঙ্গিমায় উপস্থাপন। তবে সব থেকে ভাবায় অধ্যাপক দেবেন বাবুর বৈষ্ণব পদাবলীর ক্লাস।

আহা! ”ভাবিলাম হায় আর কি কোথায়, ফিরে পার সে জীবন।” হেসে হেসে টোল খাওয়া গালে চন্ডীদাসের পূর্বরাগের পদ কিম্বা গোবিন্দদাসের অভিসারের পদের পাঠদানের সেসব সুখস্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতা উলটে তিন তিনটে বছর যে কীভাবে কেটে গেল তা আমরা বুঝতেও পারলাম না। সেই দিনগুলি ছিল কত না মধুর। কত নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয়, ছেলে বেলার পুরোনো দুজন বন্ধুকে অনার্সে পড়তে এসে পুনরাবিষ্কার, মন খারাপ, বিষণ্ণতা, কখনো একাকিত্ব, কলেজের বারান্দার দাঁড়িয়ে স্কুল জীবনের সুখস্বপ্নকে ঘেঁটে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে তফাত গোনা — এসব হঠাৎ যেন শেষ হয়ে গেল। এরকম কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে কলেজের সঙ্গে — তা এই ক্ষুদ্র পরিসরে বলা সম্ভব নয়। রঞ্জনদার কাছ থেকে লেখার আহ্বান পেয়ে মনে নতুন করে অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসল পুনরায়। মনে পড়ে গেল ফার্স্ট ইয়ারে কলেজের পত্রিকা ‘উত্তরণ’-এ প্রথম কবিতা বেরোনোর কথা। আর এখন আমি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। আমার লেখাও এতে স্থান পাবে শুনে কাগজ কলম নিয়ে বসে গেলাম লিখতে। মহাকবি হবার স্বপ্ন নিয়ে আমরা লিখতে আসিনি অথবা ‘সাহিত্যের ইন্দ্র-চন্দ্র-মিত্র-বরুণ’রা যদি এ লেখা দেখে নাক সিটকোয় তাতেও আমাদের কিছু এসে যায় না। ঘরোয়া কিছু মানুষজনের কাছে কিছু ঘরোয়া গল্প বলব, এতে লজ্জার কি আছে?

যে বাংলাকে আমার পছন্দ হত না, সেই বাংলাই কিনা শেষে আমার উপর ভর করল। দ্বাদশ শ্রেণীতে রবীন্দ্রনাথের ‘লোকহিত’, কিম্বা অক্ষয়কুমার দত্তের ‘পল্লী গ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা বর্ণন’ কিম্বা জীবনানন্দের ‘১৯৪৬-৪৭’ পড়লে যার অলসতা আসত সেই তাকেই কিনা পড়তে হবে আস্ত উপন্যাস! ‘গোরা’, ‘লালসালু’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো বড়ো বড়ো বই। কিন্তু বইগুলি পড়তে পড়তে অদ্ভুত একটা ভালোবাসা জন্মেছিল বিষয়টার প্রতি। মনে হল বাংলা সাহিত্যকে জানতে হলে এঁদের পড়তে হবে। তাছাড়া সাহিত্যের ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, ছন্দ, অলংকারের মায়ায় বাংলার প্রতি একটা ভালোলাগা তৈরি হল। ভাষাতত্ত্বের বিশ্লেষণধর্মী অংশগুলো আমাকে বেশি টানত। ব্যাকরণের প্রতি আশ্চর্যজনক ঝোঁকটার জন্ম বোধ হয় এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। বেশি বই কেনার সামর্থ্য আমার ছিল না। প্রথম বর্ষে শুধুমাত্র অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ আর

মিহির চৌধুরী কামিল্যার ছন্দ ও অলংকার এই দুটি বই মিলিয়ে মোট তিনটি বই কিনেছিলাম। ভূদেব চৌধুরীর নাম শুনিনি তখনও। সুকুমার সেনের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের নাম শুনেছিলাম, কিন্তু কেনার সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি। কলেজ গ্রন্থাগার থেকে দুটি করে বই পেতাম, তাকেই গোগ্রাসে গিলে যথসময় ফেরত দিতে হত। বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন দেবেন বাবু। তাঁর অধীনে একটি বই এর আলমারি ছিল। মাঝে মাঝে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হত। নেড়ে চেড়ে দেখার সুযোগও হত। একদিন তিনি আমাদের কয়েকজনকে পড়তে দিয়েছিলেন বিশ্বভারতীকৃত রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’। তাঁর কড়া হুকুম পড়েই ফেরত দেবে। থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার কিছুদিন আগের ঘটনা। হঠাৎ তিনি আমাদের ডেকে বললেন তোমাদের বইগুলো কিন্তু এখনো ফেরত দিলে না। আমরা বললাম স্যার, আপানিই তো বলেছিলেন বই চুরি করা ভালো। আমরা তো অন্য কিছু চুরি করিনি। এই বইটা না নিলে হয় না স্যার? দেবেনবাবুর টোল খাওয়া গালের সেই অমলিন হাসিটা আজও মনে পড়ে। সত্যিই সেদিন জমা দিইনি বইটা। এখনো ‘সঞ্চয়িতা’টা আমার বই এর আলমারির তাকে শোভা পায়। যখনই মনখারাপ, বিষণ্নতা, একাকিত্ব বোধ করি এই সঞ্চয়িতাটাই আমার নিভৃত মনের গোপন স্বপনচারিণী, রূপকথার রাঙা রাজকন্যা। মনে পড়ে যায় কলেজ জীবনের কত না রঙিন ছবি।

দ্বাদশ শ্রেণী থেকেই যার কবিতা লেখার সূত্রপাত বাংলা অনার্স পড়তে এসে সে কবিতা লিখবে না তাও কি হয়? ক্লাসে বসেই চলত কবিতা লেখালিখি। ছেলে-মেয়ে এক সাথেই ক্লাস। তাই কখনো কখনো মনে ভিড় করে আসত রূপকথার রাঙা রাজকন্যার কথা, বাংলা নিয়ে পড়বে অথচ প্রেমে পড়বে না তাও কি হয়? তরুণ কবি প্রথম প্রেমে পড়ল, তবে কলেজের ছাত্রীর নয়, জীবনানন্দের বিপ্রলম্ভের নায়িকা বনলতা সেনের মতো অনেকদিনের চেনা এক নারীর, যার অমোঘ আকর্ষণে যুবকটি বারবার ছুটে ছুটে গেছে পৃথিবীর পথে। কিন্তু বাতায়নবর্তিনী অভিমানী প্রিয়াকে সে কোনোদিন নিজের করে পায়নি। এই আক্ষেপও ঝরে পড়ে তার পরবর্তীকালের নানা লেখায়। ভালোবাসার নারীকে আপন করে পাবার লোভে দুর্গম — পিচ্ছিল কাঁটা বিছানো পথে অনন্ত এক অভিসার। তাই দেবেনবাবুর অভিসারের সংজ্ঞা — ‘যা ভি সারয়তে কান্তং’ কিম্বা পূর্বরাগের সংজ্ঞা — ‘রতির্যা সঙ্গমাৎপুর্বং দর্শন শ্রবণাদিজা’ উচ্চারণ শুনলেই মুখ চেপে হাসি, Love at first sight বা ‘তারে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি। গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি’ — এসব সরস কথাবার্তায় ভালোলাগা বা প্রেমটা আরো গাঢ় হয়ে উঠত সন্দেহ নেই। ‘রাধার কী হৈল অন্তরে ব্যথা’ — পদটি পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাধা চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া, টোল খাওয়া কোনো সরস অষ্টাদশীর অন্তরের গহীনে পৌঁছে তার ব্যথা অনুভব করার ছেলেখেলামি শুরু হয়ে যেত। তারপর কত রমা, মৌসুমি, মঞ্জুশ্রী, সন্ধ্যা সবিতার অস্তরাগে বিলীন হয়ে গেল স্মৃতির পাতায় দাগ কেটে, তা হয়তো ইতিহাস মনে রাখবে না।

এরকম কত স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। পড়ন্ত দুপুরে ছায়ার আলপনা মাখা বারান্দা, রক্তিম সূর্যের অস্তরাগ চোখে মুখে মেখে নিয়ে কোনো এক স্বপনচারিনীর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া, বন্ধুর হাতে হাত দিয়ে আদিগন্ত আনির্দিষ্ট গন্তব্যে হেঁটে যাওয়া, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের পিছনের মাঠে বসে বাদামভাজা কিম্বা কুল, পেয়ারা খাওয়ার মজাটা এখনো মনে ভিড় করে আসে। মনে পড়ে এ.বি.জি-র (অনাথ বন্ধু ঘোষ) ফোকলা মুখে অবাধ্য ইতিহাসের পাঠদান কিম্বা এ.হোসেন (আওলাদ হোসেন) স্যারের ইতিহাসের পাঠদানের পাশাপাশি নিজের বই বিক্রির খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত।

যাইহোক বছর ষোলো আগে কলেজ ছেড়েছি। কিন্তু এই কলেজ আমাদের পিছু ছাড়েনি। আমাদের ভালোলাগা, মন্দলাগাকে যেন আপন করে নিতে চেয়েছে সে। অমোঘ আকর্ষণে তাই বারবার ছুটে গেছি। এই কিছু দিন আগে একটি বিশেষ কাজে কলেজের গ্রন্থাগারে ঢুকেই পূর্বের সেই স্মৃতি ফিরে এসেছিল মনে। গ্রন্থাগারে থরে থরে সাজানো বই দেখে হঠাৎ মনে হল ষোলো বছর আগে যে গ্রন্থাগার ছিল কৃশকায়, তার কলেবর এখন অনেকটাই বেড়েছে। ভারি আনন্দ হচ্ছিল দেখে। সেদিন বাংলা বিষয়ের উপর খুব বেশি বই কিনতে পারিনি। আর আজ কলেজ গ্রন্থাগারের বাংলা ডিপার্টমেন্টের অনেক বইই আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। যাক আর কথা বাড়াব না। মনের মনিকোঠায় অনেক স্মৃতিই ভিড় করে আসছে। পুরোনো দিনের সেসব কথার পুনরাবৃত্তি করতে পেরে ভালো লাগছে। এসব ভালোলাগা-মন্দলাগার গালগল্প যদি শুনতে ভালো লাগে শুনো, না হলে এড়িয়ে যেও। তাতে আমি বিন্দুমাত্র দুঃখ পাব না। তবে আজকের দিনে কলেজ জীবনের স্মৃতিকথা লিখতে বসে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে —

“দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না,

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।”

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev