সে এক সময় ছিল। একদিকে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা লোকাচার, দেশাচার, ধর্মান্ধতা, অপরদিকে ধর্মের প্রকৃত নির্যাস অনুসন্ধানে নিমগ্ন কয়েকজন। এমন একজন আমাদের রাজা রামমোহন। সতীদাহ এক বিষম সামাজিক অনাচার শুধু নয়, সদ্য বিধবাকে নিঃসহায় করার এক কপট উপায়ও বটে। এসব কপটতার বিরুদ্ধে লড়াই এ প্রায় একা তিনি। দেশে সতীপ্রথা নিষিদ্ধ হল বটে, হাতে রইল লন্ডনের প্রিভি কাউনসিল, খোদ রাজার দরবার। চল সেখানে। রাজা নিশ্চয়ই প্রজার ধর্মে, প্রজার আচার বিচারে হস্তক্ষেপ করবেন না! তাই সতী দাহ বে-আইনী হলেও (১৮২৯), রাজার কাছে দরবার করতে সনাতনপন্থীরা ছুটলেন লন্ডনে। দুটি জাহাজ সাক্ষী রইল সেই ঘটনার। চলুন দেখি কি হল সেখানে…..
দুটি জাহাজ — আলেকজান্ডার ও আলবিয়ান। সে কালের কলকাতায় সতীদাহকে কেন্দ্র করে নাম জড়ালো এই দুটি জাহাজের। লর্ড বেন্টিঙ্ক ইতিমধ্যেই সতী প্রথা নিষিদ্ধ (১৮২৯) করেছেন। হতাশ ধর্মরক্ষকরা হাল ছাড়তে চাইলেন না।শেষ চেষ্টা হিসেবে সিদ্ধান্ত হল ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলের কাছে দরবার করা। কে যাবে তাঁদের হয়ে দরবার করতে! হিন্দুরা কেউ যেতে পারবেন না। সমুদ্রপার হলে তো জাতের দফারফা! এগিয়ে এলেন একজন ইংরেজ — কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের নামকরা এটর্নী ফ্রান্সিস বেথি। মাত্র ৫০ হাজার টাকা পেলেই তিনি রাজী এই দৌত্যকর্মে। পরম পুণ্যের সতীপ্রথা বজায় রাখতে শেষে একজন ইংরেজ! ধর্মসভার লোকেরা তাতেই রাজী। কালাপানি পার হতে হলনা, ধর্ম রক্ষা হল। ১৮৩০ এর জুলাই মাসে বেথি ‘আলেকজান্ডার’ চেপে রওনা হলেন। অন্যদিকে সতীবিরোধী দলের হয়ে ‘আলবিয়ান’ নামক জাহাজে রওনা দিলেন রামমোহন রায়। অবশ্য দিল্লির সম্রাটের হয়ে দরবার করাও তাঁর আরেকটি কাজ ছিল।
কিন্তু বিপত্তি পিছু ছাড়লনা ধর্মরক্ষকদের। কিছুদিন পর খবর এল আলেকজান্ডার এর খোল ফুটো হয়ে জল ঢুকতে শুরু করায় জাহাজ মাঝপথেই তীরে ভিড়তে বাধ্য হয়েছে। বেথি সাহেব কোনমতে প্রাণ নিয়ে কলকাতায় ফিরে এলেন। সংবাদ কৌমুদী পত্রিকা লিখল ‘সতীপ্রথা পুনঃস্থাপনের জন্য যে আবেদন ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল, তা আমাদের দেশের নারীজাতির সুকৃতি ও পুণ্যের ফলে আবার ফিরে এসেছে। যে জাহাজ এটি নিয়ে যাচ্ছিল, পথে তা প্রায় ডুবতে বসেছিল’। ইন্ডিয়া গেজেটে একজন মন্তব্য করলেন ‘এরকম একটা আবেদন বহন করার জন্যই জাহাজটির ভাগ্যে এই দুর্ঘটনা!’। বেথি বললেন যে এরকম ক্ষেত্রে প্রাণহানি হয়, কিন্তু তা হয়নি। ধর্মসভার মুখপত্র সমাচার চন্দ্রিকা লিখল ‘বিলম্বের জন্য আমাদের উৎসাহ বর্ধিত হয়েছে, এবং এই দুর্ঘটনার জন্য প্রকারান্তরে আমরা কৃতজ্ঞ’।
রামমোহনের ‘আলবিয়ান’ জাহাজ পূর্বনির্দিষ্ট দিনেই (১৯ নভেম্বর, ১৮৩০) ছাড়ল। সনাতনী ধর্মরক্ষকরা ছাড়বেন কেন! তাঁরা ভবিষ্যৎবাণী করলেন ইংল্যান্ডে পৌঁছনোর আগেই রামমোহন কোন দুর্ঘটনায় পড়বেন, ঈশ্বরের অভিশাপে যাত্রা শেষ হবার আগেই তাঁর মৃত্যু হবে, নতুবা ইংল্যান্ড থেকে মাথা নীচু করে তাঁকে ফিরতে হবে। কোনকিছুই ঘটল না। নির্বিঘ্নে রামমোহন ইংল্যান্ড পৌঁছলেন। বেথি সাহেবও গেলেন। তিনি কলকাতায় চিঠি লিখলেন — সব ঠিক আছে, সতীপ্রথা রদ হবেনা। কিছুদিন সনাতনীরা লাফালাফি করলেন।
এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। প্রিভি কাউন্সিল সতীদাহের মত অমানবিক প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্তে একমত হলে (১৮৩০) আর কিছুই করার থাকল না। আলেকজান্ডার ও আলবিয়ন নামক জাহাজ দুটি সাক্ষী রইল উনিশ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের।