ত্রিবেণী। অঞ্চলটির চারদিকে একটা পুরানো দিনের গন্ধ আপনার মনের মধ্যে ঢুকে যায় এই অঞ্চলে প্রবেশ করা মাত্র। নব্বইয়ের দশকে স্টেশনে নেমে এদিকে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল রিক্সা। চওড়া রাস্তা ছেড়ে রিক্সা যেই একটা সরু রাস্তা ধরে নেবে, অমনি আপনার মন সেই পুরোনো যুগের রূপ, রস, গন্ধ সব পেতে শুরু করবে। এখন অনেক পাল্টে গেলেও, রিক্সার জায়গায় টোটো, অটো এলেও সেই সরু রাস্তা, রাস্তার দুপাশে বহুকালের পুরোনো বাড়ি, বড় বড় গাছ, একদিকে গঙ্গা, আর গঙ্গার ধারে ধারে অসংখ্য মন্দির দেউল এখনও অপেক্ষায় থাকে মানুষের জন্য। যে মানুষ পুরোনোর গন্ধ পেতে চান অনায়াসে এখানকার গন্ধ সেই মানুষকে টাইম ট্রাভেল করিয়ে আনতে সক্ষম।
ছোট ছোট মাটির ঘর। খড়ের চাল। দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘর। অভাবের সংসার। এতটাই অভাব তখনকার দিনে ছিল, যে বাড়িতে উনুন ধরানোর জন্য যেটুকু জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে, সেটুকু জ্বালানিও অনেকের থাকত না। ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলে উঠোনে নিজের মনে খেলা করছে। মা ভগবতীদেবী উনুন ধরাতে গিয়ে দেখলেন জ্বালানি নেই। বাড়িতে ওই ছোট ছেলে ছাড়া আর কেউ তখন নেই। অগত্যা মা তাকেই পাঠালেন পঞ্চানন ঠাকুরের টোলে একটু আগুন আনার জন্য। পঞ্চানন ঠাকুর ওই বাচ্চা ছেলেটির পড়শি। দুই পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক বর্তমান।
ছোট ছেলেটি মাতৃআদেশে আগুন আনতে গেল ঠাকুরের কাছে। পঞ্চানন ঠাকুর উনুন থেকে লোহার হাতা করে গনগনে কাঠকয়লা তুলে এনে জিজ্ঞেস করলেন, “এই নে আগুন, কিন্তু নিবি কিসে?” তাই তো। ছেলে মাতৃআদেশ পালন করতে আগুন নিতে এসেছে বটে কিন্তু তার মা তো আগুন আনার জন্য কোনো পাত্র দেন নি। অভাবের সংসারে মায়ের এরকম ভুল হতেই পারে। কিন্তু ছোট ছেলেটি এটুকু জানত যে, এই আগুন না নিয়ে গেলে উনুন ধরবে না। তাই উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাল শিশুটি। এদিক ওদিক চেয়ে সে দেখলে পাশেই রয়েছে মুড়ি ভাজার জন্য বালি স্তুপীকৃত করে রাখা। সে ওই বালি এক খাবলা মুঠোর মধ্যে তুলে নিয়ে ঠাকুরকে বললে, “দাও, এই হাতেই দাও।”
পঞ্চানন ঠাকুরও সেই আগুন শিশুর হাতে দিলেন। হয়ত তিনি খানিক অন্যমনস্ক ছিলেন অথবা শিশুর উপস্থিত বুদ্ধি দেখে অবাক হয়েছিলেন। শিশু হাতে জ্বলন্ত কাঠ কয়লা এনে মাকে দিতেই মা আর্তনাদ করে উঠলেন। চেঁচিয়ে বললেন, “এ তুই কি করেছিস? ফেল আগুন। ফেলে দে শিগ্গির!” এই বলে মা শিশুকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। শিশু তখন অবাক হয়ে বলে চলেছে, “তুমি কাঁদছ কেন! এই দেখো, আমার হাত পোড়েনি।” কি অসামান্য শক্তির আধার এই শিশু মা ভগবতীদেবী তখনও বোঝেন নি।
১৩ই সেপ্টেম্বর ১৬৯৪ হুগলির ত্রিবেণীতে জন্ম হল এই অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন শিশুর যিনি পরবর্তী কালে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন নামে খ্যাত হয়েছিলেন। পিতা রুদ্রদেব তর্কবাগীশ। এই বংশের আদি পুরুষ এসেছিলেন যশোর থেকে। আদিপুরুষ দীননাথ ঠাকুর স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন হুগলির ত্রিবেণীতে। অলৌকিক শিশুর জন্মও কিছুটা অলৌকিক বটে। রুদ্রদেব তর্কবাগীশের বয়স যখন ছেষট্টি বছর তখন জগন্নাথের জন্ম হল। পিতার কাছে জগন্নাথের শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু।
অলৌকিক বালকের নানা প্রতিভা প্রথম থেকে বোঝা গেলেও বালকের কপালে মাতৃস্নেহ বেশিদিন সহ্য হয় নি। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। পিতা রুদ্রদেব অতটুকু বালককে নিয়ে পড়লেন আতান্তরে। রুদ্রদেবের বড়দাদা ছিলেন বাঁশবেড়িয়ার বিখ্যাত ভবদেব ন্যায়ালঙ্কার। মাতৃহারা জগন্নাথের স্থান হল বাঁশবেড়িয়ার জ্যেষ্ঠতাতর বাড়িতে। জ্যেঠার কাছেই জগন্নাথের ব্যাকরণ ও স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ, মুখে মুখেই ব্যাকরণের সূত্রগুলি শিখে ফেলেছিলেন সেই অল্প বয়সে।
বারো বছরে স্মৃতিশাস্ত্র ও ব্যাকরণ পাঠ সমাপ্ত করে ফিরে এলেন ত্রিবেণীতে। ঐ বয়সের মধ্যেই তিনি স্মৃতিশাস্ত্রের অনেক জটিল বিষয়ের মীমাংসা করেছিলেন। এবার রঘুনাথ বাচস্পতির কাছে ন্যায়শাস্ত্র বা আইনের পাঠ নিতে শুরু করেন। চোদ্দ বছর বয়সে জগন্নাথের বিবাহ হল পাশের মেড়েগ্রামের এক ব্রাহ্মণ পন্ডিতের কন্যার সঙ্গে। মাত্র ষোল বছর বয়সে নবদ্বীপের ন্যায়শাস্ত্রের বিখ্যাত টীকাকার জগদীশ তর্কালংকারের পৌত্র পন্ডিত রামাবল্লভ বিদ্যাবাগীশকে তর্কে পরাজিত করেন। সেযুগে নবদ্বীপ ছিল সংস্কৃত শাস্ত্র চর্চার পীঠস্থান। কিন্তু জগন্নাথ নবদ্বীপের খ্যাতি ম্লান করে দিলেন। তখন থেকেই তাঁর নাম ও খ্যাতি প্রবাদের আকারে ছড়িয়ে পড়ল। ষোল বছরে তিনি পিতার টোল বা চতুষ্পাঠীতে শিক্ষকতা শুরু করলেন।
জগন্নাথের যখন চব্বিশ বছর বয়স তখন তিনি পিতৃহারা হলেন। পিতা রুদ্রদেবের বয়স তখন নব্বই। বিষয় সম্পত্তি যেটুকু ছিল সব বিক্রয় করে পিতৃশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করলেন। আর্থিক অনটনের জন্য পিতার টোলটি বেশিদিন চালাতে পারলেন না। তখন একটি মাত্র হরীতকী সম্বল করে আবার নিজের একটি টোল খুললেন। পিতা রুদ্রদেবের আদেশ ছিল যত অনটনই আসুক না কেন, শাস্ত্রচর্চা থেকে বিরত হওয়া যাবে না। জগন্নাথ চিরকাল পিতৃআজ্ঞা পালন করে গেছেন।

নিজের নতুন টোল খোলার পরে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তর্কপঞ্চানন উপাধিতে সম্মানিত হন। তাঁর জীবদ্দশাতেই টোলটি মহাবিদ্যালয়ের রূপ নেয়। জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের নাম তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন টোল ও চতুষ্পাঠির পন্ডিতরা তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন। বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলারও নজরে পড়েন তিনি। শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব তর্কপঞ্চাননের ত্রিবেণীর মাটির বাড়িকে পাকা কোঠাবাড়ি বানিয়ে দিলেন। যদিও এতে জগন্নাথের তীব্র আপত্তি ছিল। নবকৃষ্ণ দেব ছাড়াও বর্ধমানের রাজা মহারাজ তিলকচাঁদ মহাতাব, কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, মহারাজা নন্দকুমার তাঁকে নিষ্কর সম্পত্তি দান করেন।
কিন্তু এত সবের পরেও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সঙ্গে জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের বিরোধ বাঁধে সমাজচ্যুত এক গরীব ব্রাহ্মণকে নিয়ে। জগন্নাথ সেই অসহায় ব্রাহ্মণকে শাস্ত্রসম্মতভাবে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে সমাজে তুলেছিলেন। এটা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মেনে নিতে পারেন নি। ওই গরীব ব্রাহ্মণের উপর কোনো কারণে রাজার রাগ ছিল। আর রাজা তর্কপঞ্চাননকে বহু নিষ্কর সম্পত্তি দান করেছিলেন, তাই তিনি ভাবতে পারেন নি যে জগন্নাথ রাজার বিরুদ্ধে গিয়ে এক গরীব ব্রাহ্মণের পক্ষ নেবেন।
ইংরেজরা ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভ করলে দেশীয় বিচার পদ্ধতি ও আইন প্রণয়নের জন্য জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, হার্ডিঞ্জ, জন শোর এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্সের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা ছিল। এমনকি রবার্ট ক্লাইভ তাঁর কাছে সংস্কৃত শিখেছিলেন। এছাড়াও সদর দেওয়ানি আদালতের প্রধান বিচারপতি হ্যারিংটন ছিলেন জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ। তাই এদেশে যখন প্রথম সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হল, ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রধান পন্ডিতের পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। তিনি সেই পদ গ্রহণে অস্বীকৃত হলে তাঁর পৌত্র ঘনশ্যাম সেই পদে আসীন হন।
তবে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন আইন আদালতের সুবিধার্থে কতকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘অষ্টাদশ বিবাদের বিচার’। তাঁর জীবনের বিশেষ কীর্তি ন্যায় বিষয়ক গ্রন্থ ‘বিবাদ ভঙ্গার্ণব’ সংকলন। তৎকালীন হিন্দু দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থা এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই হত। নব্যন্যায়ের উপর নানা রচনা ছিল তাঁর।
জগন্নাথের পান্ডিত্যের কথা নবাব সিরাজদৌল্লাও জানতে পেরেছিলেন। নবাব তাঁকে একটি হীরের আংটি দিয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। তর্কপঞ্চাননের জীবনীকার রজনীকান্ত গুপ্তর লেখা থেকে জানা যায় যে নবাব তর্কপঞ্চাননকে একটি শিলমোহর দান করেন। তাতে লেখা ছিল — ‘সুধীবর কবি বিপেন্দ্র, শ্রীযুক্ত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন ভট্টাচার্য’। জগন্নাথ এই শিলমোহরটি ব্যবহার করতেন।
রাজা রামমোহন রায় তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন ‘জগন্নাথ ছিলেন তাঁর কালের সর্ববাদিসম্মত সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য স্রষ্টা এবং তাঁর বিধান ও তাঁর অধিকার প্রায় রঘুনন্দনের বিধানের সমতুল্য।’
কে কেমন ললাটলিপি নিয়ে এই পৃথিবীতে আসেন সেটা কেউ বলতে পারে না। যে শিশু পাঁচ বছর বয়সে হাতে আগুন এনে মাতৃআজ্ঞা পালন করেছিলেন, যাঁর বাড়িতে উনুন জ্বালানোর আগুন পর্যন্ত ছিল না, সেই ব্যক্তির বাড়িতে পরবর্তী কালে প্রতিদিন একসাথে তিনশো লোকের পাত পড়েছে। দীর্ঘজীবী এই মানুষটি একসাথে পাঁচ পুরুষকে দেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অত্যন্ত সংযমী, নিয়মনিষ্ঠ জীবন যাপন করতেন। প্রতিদিন তিন চার মাইল হাঁটতেন, এছাড়া জপতপ যোগচর্চা তো ছিলই।
১৮০৭ সালের দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন তিনি আর ঘরে ফেরেন নি। অন্তর্জলি যাত্রা করেন। ন’দিন গঙ্গাবাস করার পর তাঁর দেহান্ত হয়। এই সময়েও তাঁর শিষ্যবর্গ তাঁর কাছে এসে জটিল সমস্যার সমাধান নিয়ে গেছেন। ১৯শে অক্টোবর এই মহান মানুষটি অনন্তের পথে যাত্রা করেন ১১৩ বছর বয়সে।
খুব সুন্দর লেখা। এত কাহিনী জানাই ছিল না। খুব ভালো লাগলো।
ভালো লাগলো। এমন আলোকিত মানুষের কথা আরো সামনে আসুক।