১০. প্রোফেসর না হয়েও প্রোফেসর : প্রিয়নাথ বসু
প্রিয়নাথ বসু প্রোফেসর ছিলেন না। তাঁর লেখাপড়া বেশিদূর এগোয় নি। তবু লোকে তাঁকে প্রোফেসর বলত। তিনি নিজেও তাঁর যে স্মৃতিকথা লিখেছেন তার নাম ‘প্রোফেসর বোসের অদ্ভুত ভ্রমণ বৃত্তান্ত’। প্রোফেসর না হয়েই কিভাবে তিনি প্রোফেসর হলেন?
বড়লাট লর্ড ডাফরিনের ভবনে সার্কাসের খেলা দেখাচ্ছিল প্রিয়নাথ বসুর দল। লর্ড ডাফরিন জানতে চাইলেন দলের পাণ্ডা কে “ইংরিজিতে তিনি বললেন, ‘Who is that professor’? দলের কর্মীরা প্রিয়নাথের নাম করল। সেই থেকে প্রিয়নাথ হয়ে গেলেন প্রোফেসর।
প্রিয়নাথ বসু (১৮৬৫-১৯২০)। উত্তর ২৪ পরগণার ছোট জাগুলিয়ার মানুষ। বাবা বিখ্যাত মানুষ। মনমোহন বসু। কবি এবং নাট্যকার। প্রিয়নাথ তাঁরই ছেলে। কিন্তু লেখাপড়ায় মন নেই ছেলের। বাবা ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আর্ট কলেজে। কিন্তু দেখলেন শিল্পচর্চাতেও মন নেই ছেলের। তিনি মেতে আছেন শরীরচর্চায়। ব্যায়াম শিখতে চান, শিখতে চান কুস্তি। সিমলার গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়ের আখড়ায় ভিড়ে গেলেন। শিখছেন কুস্তি, জিমনাস্টিক, ঘোড়সওয়ারি, ট্রাপিজের খেলা। এইসব নিয়ে বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য। তাই গৃহত্যাগ।
নজর আছে সার্কাসের দিকে। কলকাতায় তখন বাইরের যে দল খেলা দেখাত, তার নাম ‘উইলসন্স গ্রেট ওয়ার্ল্ড সার্কাস’। রামকৃষ্ণদেবও সে সার্কাস দেখতে উৎসুক। সেই সার্কাস দেখে নবগোপাল মিত্র (১৮৪০-১৮৯৪) সার্কাসের দল তৈরি করতে উদ্যোগী হলেন। তাঁকে লোকে বলত ‘ন্যাশনাল নবগোপাল’। তাঁর সার্কাসের নামও হল ‘ন্যাশনাল সার্কাস’। সেটাই বাঙালির প্রথম সার্কাস। ১৮৭২ সালে তার জন্ম। নবগোপাল মিত্রের কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের বাড়িতে বসত সার্কাসের আসর। জিমনাস্টিক ছিল তার একমাত্র বিষয়। একটা টাট্টু ঘোড়া ছাড়া অন্য কোন জন্তু ছিল না সে সার্কাসে।
প্রিয়নাথ ঠিক করলেন তিনিও সার্কাসের দল খুলবেন। বাবা তাঁকে ত্যজ্য করেছেন। পয়সাকড়ি নেই। তবু জেদ আছে। ১৮৮৭ সাল। ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে’র পত্তন করলেন প্রিয়নাথ। প্রথমে কলকাতার বড় লোকেদের বাড়ি খেলা দেখাতে লাগলেন। তারপর ছুটতে লাগলেন বাংলার নানা জেলায়। টুকটাক যা আয় হল, তার বেশির ভাগ লাগালেন সার্কাসের জিনিসপত্র কিনতে। এভাবে তাঁবু হল, ডায়নামো হল, প্রশিক্ষক এলেন, এলেন হিসেব রক্ষক, এক মহারাজা খুশি হয়ে উপহার দিলেন একজোড়া বাঘ—যাদের নাম রাখা হল লক্ষ্মী-নারায়ণ। প্রিয়নাথের সার্কাসে এলেন বাদলচাঁদ। সেকালের নামকরা কুস্তিগির। বাঘের সঙ্গে কুস্তি লড়তেন তিনি। শুধু পুরুষ নয়, প্রিয়নাথ সার্কাসে নিয়ে এলেন নারীকে। এলেন সুশীলাসুন্দরী। এলেন তাঁর সহোদরা কুমুদিনী। খালিহাতে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখালেন, শূন্যে খেলেন ডিগবাজি। হাতির পিঠে বসে বাঘের খেলা দেখালেন আর এক নারী। নাম যাঁর মৃন্ময়ী। তাক লাগিয়ে দিলেন ভবেন্দ্রমোহন সাহা (১৮৯০-১৯২২)। মাটিতে শুয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর বুকের উপর পাতা হল তক্তা। তার উপর দিয়ে হেঁটে গেল দশাসই হাতি। এলেন মন্মথনাথ দে। চোখ বেঁধে তিনি ছুটন্ত ঘোড়ার উপর উঠতেন। আর এলেন গণপতি চক্রবর্তী (১৮৫৮-১৯৩৯)। দেখাতে লাগলেন আশ্চর্য সব জাদু।
শেষ এখানেই নয়। সার্কাসের খেলার শেষে ভাষণ দিতেন প্রিয়নাথ। কি নিয়ে ভাষণ ? ইংরেজের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভাষণ, বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে জাগরণের ভাষণ। তখন ধ্বনি উঠত ‘বন্দেমাতরম’। এ ধ্বনি তখনকার কালের রণধ্বনি। টনক নড়ত শাসকের। আমন্ত্রণ আসতে লাগল ধীরে ধীরে। গোয়ালিয়র রাজবাড়ি, রংপুরের রাজবাড়িতে বসল প্রিয়নাথের সার্কাসের আসর। বাংলার বাইরে পাড়ি দিলেন তাঁরা। পুনে, সুরাট, কচ্ছ, শ্রীলঙ্কা, করাচি, পেশোয়ার, বরোদা, জুনাগড়, ঝাঁসি, ইন্দোর, বোম্বাই, জাভা, মালয়, ইন্দোনেশিয়ায় খেলা দেখাল গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস।
সেসব জায়গার মজার মজার কথা জানা যাবে প্রিয়নাথ বোসের ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়লে, ১৯০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল যে বই।
এই সিরিজের লেখাগুলি বেশ আকর্ষণীয়। অনেক মানুষের নাম শোনা,জানা থাকলেও সেই মানুষ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা নেই, এই রকম অনেক মানুষের কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে। আগে লিখেছিলাম আর একটু বিশদে হলে ভাল হত। তাতে আবার অনেকে পড়তে অনাগ্রহী হতে পারেন। যাইহোক এইসব লেখা একত্রিত করে পুস্তক প্রকাশিত হলে ভাল হবে।