১১. হারানো সম্মান ফিরে পেলেন চন্দ্রমুখী বসু
শতাধিক বছর পরে হারানো সম্মান ফিরে পেলেন চন্দ্রমুখী বসু। এদেশের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট তিনি। তার স্বীকৃতি তখন তাঁকে দেওয়া হয় নি। বেথুন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা সুনন্দা ঘোষ বেথুন কলেজের পুরানো নথিপত্র ঘেঁটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার থেকে সিণ্ডিকেট মিটিংএর নথিপত্র ঘেঁটে আসল সত্য বের করেন। দেরাদুনে যান তিনি, আলোচনা করেন চন্দ্রমুখীর বংশধরদের সঙ্গে। তাঁর আন্দোলনের ফলে ২০১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মরণোত্তর প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েটের স্বীকৃতি দেয় চন্দ্রমুখী বসুকে। ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস ঘোযণা করেন :
‘Although Chandramukhi Basu had cleared her Entrance Examination in 1876, the University had refused to register her as a successful candidate because of gender discrimination… we now intend to posthumously confer on her the pass certificate of the said Entrance Examination .’
চন্দ্রমুখী বসু (১৮৬০-১৯৪৪) ভুবনমোহন বসুর মেয়ে। তাঁর জন্ম হুগলির মহানাদে। হিন্দুধর্মের গোঁড়ামিতে বিরক্ত হয়ে ভুবনমোহন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। সম্ভবত সেই ধর্মের প্রচারের জন্য তিনি সপরিবারে চলে যান দেরাদুনে। ভর্তি হন মিশনরি স্কুলে। কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সেখানে ভর্তি হতে পারেন নি। ফরাসি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁকে দেরাদুনের ফ্রি নর্মাল স্কুলেই পড়তে হয়।
১৮৭৬ সালের শেষ দিকে ‘দেহরা বোর্ডিং স্কুল ফর নেটিভ ক্রিশ্চান গার্লস ‘এর সুপারিন্টেণ্ডেন্ট রেভারেণ্ড ডেভিড হেরন চন্দ্রমুখী বসুকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিণ্ডিকেট মিটিংএ চন্দ্রমুখীর আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত মেনে চন্দ্রমুখী পরীক্ষায় বসেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারে উঠল না তাঁর নাম :
‘The officiating register reported that Chandramukhi Basu, a pupil of Native Christan Girls School at Dehra had been declared by the junior board of examiners in Arts to have attend the Entrance Standard …it appears therefour to the syndicate that the time has now come to make definite provision for admission of female candidates in future.’ ( Calcutta University minutes of the Syndicate Resolution, 27 January, 1877)
কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় গ্র্যাজুয়েট হন ১৮৮৩ সালে। তাঁকে আমরা এ দেশের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েটের সম্মান দিই। কিন্তু তার চার বছর আগে ১৮৭৯ সালে গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন চন্দ্রমুখী। অথচ পাশের তালিকায় নাম ছিল না তাঁর। লেখা ছিল ‘অল পার্সন পাসড’। তারপরে চন্দ্রমুখী ব্রিটিশ ভারতে প্রথম নারী হিসেবে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
পরবর্তীকালে চন্দ্রমুখী বেথুন কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তিনিই প্রথম নারী যিনি এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। কলেজে নানা সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন তিনি। এর জন্য রক্ষণশীল সমাজ তাঁকে আক্রমণ করেছে বারবার। কিন্তু তাঁকে বোঝার, ঠিকঠাক মূল্যায়ন করার পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের হাতে নেই। আত্মপ্রচারবিমুখ এই নারী নিজের কোন স্মৃতিকথা লেখেন নি, রেখে যান নি কাজের কোন দলিল।
ইতিহাস গবেষক লক্ষ্মী ইয়াঝিনী শিক্ষাক্ষেত্রে চন্দ্রমুখী বসুর অবদানের মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে :
‘চন্দ্রমুখী বসুর শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য, ভারতীয় নারীদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা ছিল, যারা কেবল সাক্ষরতার জন্য নয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব এবং মর্যাদার জন্যও আকাঙ্খা পোষণ করতেন। আজ আমরা যে সব প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক বলে মনে করি — যেমন মহিলা কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং মহিলার দায়িত্বে থাকা স্কুল বোর্ড, সেগুলি তাঁর মতো মহিলাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি পেশাদার শিক্ষামূলক কাজে নিযুক্ত মহিলাদের আদর্শ তৈরিতে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
‘আমরা যখন সমসাময়িক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে ভ্রমণ করি যেখানে মহিলারা উপাচার্য, অধ্যাপক এবং পণ্ডিত, তখন মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে এই দরজাগুলি আমাদের জন্য স্বাভাবিকভাবে খোলা ছিল না। এগুলি চন্দ্রমুখী বসুর মতো মহিলারা খুলেছিলেন, যাঁরা প্রথমে এগুলি অতিক্রম করেছিলেন প্রায়শই একা এবং লৌহ-ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে।’