১২. সুকুমার সেন : ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার
সুকুমার সেন? এক বাক্যে চিনি এই নাম। বিস্মৃত তো নন। ইনি বাংলা সাহিত্যের দিকপাল, ঐতিহাসিক, ভাষাতাত্ত্বিক। না, আমি সেই সুকুমার সেনের কথা বলছি না। আমি বলছি আই.সি.এস সুকুমার সেনের (১৮৯৮-১৯৬৩) কথা। যিনি ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। বিখ্যাত আইনজীবী, ভারত সরকারের আইন মন্ত্রী অশোককুমার সেন ও চিকিৎসক অমিয়কুমার সেনের ভাই সুকুমার সেনের কথাই বলছি।
এই সুকুমার সেনের কথা নতুন করে আলোচনা করলেন ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ। ব্যাঙ্গালোরের এক বইএর দোকানে তিনি এক পুরানো পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে পেলেন সুকুমার সেনের কথা। সে পত্রিকার নাম ‘শংকর’স উইকলি’। ১৯৫৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ‘দ্য ম্যান অব দ্য উইক’-এ তাঁরা সুকুমার সেনের কথা বলেছেন : —
‘Sukumar Sen’s Chief Secretaryship for three years, on the other hand, seemed to prepare him for the most unconventional job that ever came to an I.C.S man. He was chosen to play obstretrician and to deliver Indian democracy’s first crop of nearly three thousand elected representatives . Realising with surprising un-I.C.S humility that democracy likes its mechanics to be as self-efficacing as possible, the Chief Election Commissioner became unseen. Undogmatic influence patiently judicial in his attitude to parties but insistent in regard to the machine he wielded.’
সুকুমার সেন ঢাকার সোনারংএ এক বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা অক্ষয়কুমার সেনও আই.সি.এস ছিলেন। তাঁর পরিবার ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে চলে আসে। সুকুমার সেন বর্ধমানের মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পড়াশোনা করেন। তারপর তিনি পড়েন প্রেসিডেন্সি কলেজ ও লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি গণিতে লাভ করেন স্বর্ণপদক। তারপরে আই.সি.এস হন। তখন তাঁর বয়েস মাত্র ২২ বৎসর।
দেশের নানা প্রশাসনিক পদে কাজ করেছেন সুকুমার সেন। ১৯২২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যসচিব হন। ১৯৫০ সালের ২১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সুকুমার সেনকে প্রথম নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেন। গুরু দায়িত্ব সন্দেহ নেই। ভারতের মতো বিরাট দেশে নির্বাচন পরিচালনার কাঠামো তখন ছিল না। ২১ বছর বা তার বেশি বয়সের ভোটার সংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ৬০ লক্ষ। আবার এই ভোটারদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর।
ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন : —
‘সবার আগে নির্বাচকমণ্ডলীর বিশাল আকারের কথা ভাবুন…। প্রত্যেক ভোটারকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে, নাম লিখে নথিভুক্ত করতে হবে। নথিভুক্ত করাটা কেবল প্রথম ধাপ মাত্র। কেন না প্রধানত নিরক্ষর এক নির্বাচকমণ্ডলীর জন্য কিভাবে পার্টি প্রতীক, ভোটপত্র আর ব্যালট বাক্স তৈরি করতে হবে, সে এক বিরাট প্রশ্ন। তারপর এলাকার ভূগোল, পরিবহনের ব্যবস্থা সব দিক মাথায় রেখে ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করা, সৎ পরিশ্রমী ও দক্ষ অফিসার নিয়োগ ইত্যাদি বিপুল কাজ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে।’
মাত্র ৬ মাসের সময় সীমার মধ্যে সুকুমার সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর শুরু হল ভোট গ্রহণ। শেষ হল ১৯৫২ সালের ২৭ মার্চ। ২২৪০০টি ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল, ২০ লক্ষ ইস্পাত ব্যলট বাক্স তৈরি করা হয়েছিল যা তৈরিতে খরচ হয় ৮২০০ টন ইস্পাত। নির্বাচনী এলাকা অনুসারে ভোটার তালিকা টাইপ ও সংগ্রহ করার জন্য ৬ মাসের চুক্তিতে ১৬৫০০ জন কেরানি নিয়োগ করা হয়। ভোটার তালিকা মুদ্রণের জন্য প্রায় ৩,৮০,০০০ রিম কাগজ ব্যবহার করা হয়। ভোটদান তদারকি করার জন্য ৫৬,০০০ প্রিজাইডিং অফিসার নির্বাচিত করা হয় এবং তাঁদের সাহায্যকারী ছিলেন ২,৮০,০০০ জন। সহিংসতা ও ভয় দেখানোর বিরুদ্ধে পাহারা দেওয়ার জন্য ২,২৪,০০০ পুলিশ নিয়োগ করা হয়। শুধু প্রথম সাধারণ নির্বাচন নয়, সুকুমার সেন ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনও পরিচালনা করেন সুষ্ঠুভাবে।
শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ইলেকশন কমিশনের সভাপতিরূপে তিনি সুদানের সাধারণ নির্বাচনও পরিচালনা করেন। সেজন্য তিনি সুদানে ৯ মাস অতিবাহিত করেন, পরিকাঠামো গড়ে তোলেন, বিভিন্ন দলের প্রতীক ও রঙ ঠিক করে দেন। সুদানের নির্বাচনে সুকুমার সেনের ভূমিকার প্রশংসা করে ইজিপ্টের সংবাদপত্র ‘আল মিশরি’। ১৯৫৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংখ্যায় লেখা হয়, সুকুমার সেন – ‘one of those men who were born to lead the pitched battles of Democracy’ . যাই বলুন ব্রিটিশ অফিসাররা, সুদানের নির্বাচন হয়েছিল আক্ষরিক অর্থে নিরপেক্ষ এবং ‘the age in which the politicians of the British Empire used to think that they are issuing orders, is finished .’
সুকুমার সেন বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রের বীজ ভারতীয় সভ্যতার মধ্যেই আছে। অতীতে ভারতের নানা স্থানে প্রজাতন্ত্র বিদ্যমান ছিল, কোথাও কোথাও প্রাপ্ত বয়স্করা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন। দুঃখের কথা, এই রকম একজন কর্মোদ্যোগী মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কথা খুব বেশি জানা যায় না। আত্মপ্রচারবিমুখ এই মানুষটি কোন গবেষণাপত্র বা স্মৃতিকথা লিখে রেখে যান নি।