১৩. নবদ্বীপ হালদার : অতীতের এক কৌতুকাভিনেতা
১৯৩০ সাল। চলচ্চিত্র পরিচালক দেবকী বসু (১৮৯৮-১৯৭১) ‘পঞ্চশর’ ছবির কাজে ব্যস্ত। নিজের কাহিনি, চিত্রনাট্য, পরিচালনাও তাঁর। ঠিক সেই সময়ে এক ভদ্রলোক এসে হাজির হলেন তাঁর কাছে। বললেন, ‘নমস্কার দেবকীবাবু।’
দেবকী বসু প্রতি নমস্কার করে আগন্তুকের পরিচয় জানতে চাইলেন।
আগন্তুক বললেন, ‘আমার নাম নবদ্বীপ হালদার। আমি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনে চাকরি করি।’
— ‘বেশ তো। বলুন কি দরকারে এসেছেন। ’
— ‘মশাই, আপনার মতো আমিও বর্ধমানের লোক। আমার বাড়ি সেনপলাশিতে। আপনার পৈত্রিক বাড়ি তো কৈগ্রামে; তবে কিনা আপনি মামার বাড়ি অকালপৌষে জন্মেছেন।’
দেবকী বসু একটু হাসলেন। দেখলেন নবদ্বীপ তাঁর ঠিকুজি-কোষ্ঠী জেনেই এসেছেন। বললেন, ‘এবার দরকারটা বলুন।’
— ‘আপনি বর্ধমানের লোক হয়ে সিনেমা করতে পারলে আমি পারব না কেন?’
অকপটে, সাবলীলভাবে বলে গেলেন নবদ্বীপ হালদার (১৯১১-১৯৬২)। নবদ্বীপের কথা বলার ভঙ্গি দেখে, তাঁর কথা শুনে দেবকী বসু কৌতুক অনুভব করলেন। মনে মনে ভাবলেন এই লোকটি কৌতুক অভিনয় ভালোই পারবেন। ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মসের ‘পঞ্চশর’ ছবিতে কাজ পেলেন নবদ্বীপ। এক হোটেলওয়ালার চরিত্রে। তারপর তিনি দেবকী বসুর অন্যান্য ছবিতেও কাজ করেছিলেন। পরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পরিচালক প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছবিতেও ছিলেন তিনি। তবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আর এক কৌতুকাভিনেতা। যাঁর নাম শ্যাম লাহা। পরবর্তী কালের ভানু-জহর জুটির মতো নবদ্বীপ-শ্যাম জুটি।
শতাধিক ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। যেমন : পঞ্চশর (১৯৩০), গ্রহের ফের (১৯৩৭), সোনার সংসার (১৯৩৬), সর্বজনীন বিবাহ উৎসব (১৯৩৮), শহর থেকে দূরে (১৯৪৩), দুঃখে যাদের জীবন গড়া (১৯৪৬), কালো ছায়া (১৯৫৮), সাধারণ মেয়ে (১৯৪৮), কুয়াশা (১৯৪৯), সন্ধ্যাবেলার রূপকথা (১৯৫০), কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে (১৯৫০), বৈকুণ্ঠের উইল (১৯৫০), মর্যাদা (১৯৫০), হানাবাড়ি (১৯৫২), মানিকজোড় (১৯৫২), সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), লাখ টাকা (১৯৫৩), ময়লা কাগজ (১৯৫৪), ছেলে কার (১৯৫৪), নিষিদ্ধ ফল (১৯৫৫), সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), দুই বেচারা (১৯৬৯), কঠিন মায়া (১৯৬১), মরুতৃষা (১৯৬৪) –ইত্যাদি।
সিনেমার পাশাপাশি পেশাদারি মঞ্চ, বেতার, যাত্রাতেও নবদ্বীপ হালদার অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর যেসব কৌতুক নকশা জনপ্রিয় হয়েছিল সেগুলি হল : —
যুদ্ধ বিভ্রাট, রসগোল্লায় ইঁদুর, ইনজেকশন বিভ্রাট, হুলো বেড়াল, আদালতে গড়াগড়ি, যাত্রা বিভ্রাট, লুচি বিভ্রাট, মামা ভাগনে, পণ্ডিত মশাই …।
কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি বদলে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল নবদ্বীপ হালদারের। যখন তিনি বিচিত্র কণ্ঠে বলতেন ‘বাবু আমি চাকর মনিষ্যি’ কিংবা ‘হাঁড়ি খুলে দেখি বাবা নাই’ — তখন হাসির হুল্লোড়ে ভেসে যেত দশর্করা। সেই নবদ্বীপ হালদারের জন্মশতবর্ষের আয়োজন করেছিলেন তাঁর গ্রামের মানুষেরা। সে অনুষ্ঠানে শহুরে জৌলুস ছিল না। তবে আন্তরিকতা ছিল। নবদ্বীপের মেয়ে লক্ষ্মী হালদারের যোগ দেওয়ার কথা ছিল। অসুস্থতার জন্য তিনি আসতে পারেন নি। সে গ্রামের মানুষ ৭৪ বছরের বৃদ্ধ শক্তিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমার বয়েস তখন মাত্র আট। গ্রামে যাত্রা হত। কলকাতার বিভিন্ন দল আসত। তিনি (নবদ্বীপ) তখন গ্রামে এসেছেন। তাঁকে জোর করে মঞ্চে তোলা হল। নবা বামুন মঞ্চে উঠে নিজের সংলাপ ভুলে গিয়েছিলেন। সংলাপটা ছিল ‘হাঁড়ি খুলে দেখি মাংস নেই’। কিন্তু তিনি বললেন, ‘হাঁড়ি খুলে দেখি বাবা নেই’। সেটা শোনা মাত্র হাসতে লাগল সকলে। আসলে তাঁর এই ভুল সকলকে হাসানোর জন্য ছিল।”
এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এক কৌতুক অভিনেতা। তিনি বললেন, ‘সারা জীবন সকলকে শুধু হাসিয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনে দুঃখের সীমা ছিল না। সচ্ছলতার মুখ দেখেন নি কোনদিন।
হারিয়ে গেছেন নবদ্বীপ হালদার। হারিয়ে গেছে তাঁর লং প্লেয়িং রেকর্ডগুলি। গবেষক সুজয় বিশ্বাস বহু অনুসন্ধান করেও সেসবের সন্ধান পান নি। না, তবে সব কিছুই হারিয়ে যায় নি। আছে মাঝেরপাড়ার একটা মিষ্টির দোকান। তাঁর নামে নামাঙ্কিত। দোকানের মূল মালিক অভয় মোদক আজ আর নেই। তবে আছেন তাঁর নাতি দীনবন্ধু মোদক। তিনি বলেন, — ‘একটা হাস্যকৌতুকে আমাদের দোকানের একটি দৃশ্য ব্যবহার করেছিলেন নবা দাদু। তাই তাঁর নামে দোকানের নাম।’
যাঁরা একসময় এতো কাছের মানুষ ছিলেন, যাঁদের অসামান্য শিল্পশৈলী আমাদের এত প্রিয় ছিল, তাঁরা আড়ালে চলে গেলে তাঁদের আমরা একবার স্মরণ করি না।
নবদ্বীপ হালদারের মতো কৌতুক শিল্পী বাংলায় ক’জন জন্মেছেন? আপনি তাঁর কথা তুলে ধরে অকৃতজ্ঞ বাঙালির ঋণ শোধ করলেন।
আপনাকে ধন্যবাদ ও নমস্কার।
স্বপন মুখোপাধ্যায়।