১৪. প্রসূতিবিশারদ কেদারনাথ দাস
চলুন, পিছিয়ে যাই অনেকটা। চলে যাই ১৯১৮ সালে। কলকাতার ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলের এক বিদায়-সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে। কিন্তু ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল? সেটা আবার কোথায়? তা জানতে হলে আরও পিছিয়ে যেতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে ১৮৬৪ সাল নাগাদ ব্রিটিশ সরকার কলকাতায় একটা হাসপাতাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ১৮৭৩ সালের ১ ডিসেম্বর তৈরি হয় শিয়ালদহ মিউনিসিপ্যাল হসপিটাল। ১৮৮৪ সালে এই হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল ল এখন এই হাসপাতালের নাম নীলরতন মেডিক্যাল কলেজ। এই নাম রাখা হয় ১৯৪৮ সালে।
১৯১৮ সাল। ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল থেকে বিদায় নিচ্ছেন একজন ডাক্তারবাবু। দীর্ঘদেহী, কড়াধাতের এই ডাক্তারবাবুকে বড্ড ভয় করে ছাত্র-ছাত্রীরা। তাঁর বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ডাক্তারবাবু তাঁর ভাষণে বললেন, ‘আমি এতদিন ভেবেছিলাম যে আমি যখন এখান থেকে বিদায় নেব, তখন ছাত্র-ছাত্রী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। কেননা আমি কড়াধাতের মানুষ, কোন বিশৃঙ্খলা, আলস্য বরদাস্ত করতাম না। কিন্তু আজ আমার ছাত্র-ছাত্রীর বক্তৃতা শুনে ভুল ভেঙেছে আমার। বুঝতে পেরেছি,. তারা আমাকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। তারা বুঝতে পেরেছে যে আমার রুক্ষ ও কর্কশ ব্যবহারের মূলে ছিল তাদের আরও ভালো ডাক্তার হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা।’
কে এই ডাক্তার?
ইনি হলেন ডাক্তার কেদারনাথ দাস (১৮৬৭-১৯৩৬)। জন্ম কলকাতায়। বাবা যাদবচন্দ্র ছিলেন হিন্দু স্কুলের শিক্ষক। এই হিন্দু কলেজ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কেদারনাথ ভর্তি হলেন স্কটিশচার্চ কলেজে। সেখান থেকে এফ.এ পাশ করে চলে আসেন মেডিক্যাল কলেজে। তুখোড় ছিলেন পড়াশোনায়। ১৮৯২ সালে পাশ করলেন ব্যাচেলার অব মেডিসিন। ধাত্রীবিদ্যায় তাঁর স্থান প্রথম। অধ্যাপক কর্নেল সি.এইচ.জুইবারের স্নেহের পাত্র কেদারনাথ। মাদ্রাজ থেকে এম.ডি হয়ে ফিরলেন তিনি। ১৮৯৯ সালে প্রসূতিতন্ত্রের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলেন ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে।
এখানে থাকতে থাকতে তিনি তৈরি করলেন এক বিশেষ ধরনের ফরসেপ। যেটা তাঁর বিরাট অবদান। কিন্তু তার আগের গল্পটা শুনুন কৃষ্ণকলি হাজরার মুখে : —
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটির অবস্থা দেখে ডাক্তার অবাক হয়ে তাকালেন। এক সপ্তাহ আগে সে একটি সন্তান প্রসব করেছিল এবং প্রস্রাব বা মলত্যাগ করতে না পারায় তাকে আনা হয়েছিল হাসপাতালে। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করলেন। দেখলেন মুত্রাশয়ের দেওয়ালে একটি বড় গর্ত, ছিঁড়ে যাওয়া মলদ্বার, ভাঙা পেলভিক জয়েন্ট এবং পৃথক পেলভিক হাড়।
মেয়েটির প্রসব বেদনা শুরু হলে এবং শিশুটির বাহু ঝুলে থাকা অবস্থায় তাকে উল্টো অবস্থায় পাওয়া গেলে পরীক্ষা শুরু হয়। ধাত্রী মেয়েটিকে দুটি টুলের উপর বসিয়ে নীচে লাল গরম কয়লা দিয়ে জায়গাটি নরম করে দেন। তারপর তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রসারিত বাহু টেনে প্রসবের চেষ্টা করেন। অবশেষে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় প্রসব করা হয়। শিশুর মা ভয়াবহভাবে আহত হন।
তখন এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটত।
কেদারনাথ দাস এর প্রতিকার করতে চাইলেন। তিনি বুঝলেন প্রসব করানোর সময়ে যে ফরসেপ ব্যবহার করা হয় সেগুলি বিদেশ থেকে আনানো। এই ফরসেপ আমাদের দেশের মেয়েদের পক্ষে উপযোগী নয় কিছুতেই। আমাদের দেশের মেয়েদের দেহের আকার ইউরোপীয় মেয়েদের চেয়ে তুলনায় ছোট। “এখানকার মেয়েদের উরুর মাপ ইউরোপের মেয়েদের উরুর মাপের আট ভাগের সাত ভাগ, আর সদ্যোজাত শিশুর ওজন ওসব দেশের শিশুদের ওজনের সাতভাগের ছয়ভাগ। ডাক্তারবাবু দেখলেন বিলেতে মেয়েদের প্রসবের জন্য ব্যবহরত হয় যে ফরসেপ, যেটাকে বলে সিম্পসন ফরসেপস, সেটা নিয়ে ভারতীয় মেয়েদের অপারেশন করতে গেলে মূল সঙ্কট আসে যোনিপথে। তুলনায় আকারে বড় এই ফরসেপ ঢোকানোর ফলে যোনিদ্বারে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা অনেক সময়ে মায়ের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দেয়।
“কেদারনাথ দাস নামে ওই ডাক্তারবাবু, যিনি কর্মক্ষেত্রে কে ডি দাস নামে পরিচিত, এই ব্যবস্থাটাকেই পাল্টে দিতে চাইলেন। তিনি বিস্তর খেটেখুটে এক বিশেষ ধরনের ফরসেপ তৈরি করলেন, যা আমাদের দেশের মেয়েদের পেলভিক কার্ভ আর শিশুদের মাথার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ফরসেপের নাম দেওয়া হয় ‘বেঙ্গল ফরসেপ’ যা যোনিপথে ঢুকিয়ে শিশুর মাথাকে ঘুরিয়ে এমন অবস্থায় আনা হয়, যাতে প্রসব করাতে কম অসুবিধা হয়। এছাড়া তিনি ডাক্তারদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেন ‘অ্যাক্সিস ট্র্যাকশন’ নামে এক ধরনের চিমটে আর ডাইলেটর। এটা পরে ‘কে ডি ডাইলেটর’ নামে পরিচিতি লাভ করে।” (অর্পণ পালের লেখা থেকে)
১৯২৮ সালে ছাত্র ও ইন্টার্নদের জন্য লেখেন একটি বই। নাম ‘প্রসূতি ফরসেপস : ইটস হিস্ট্রি অ্যাণ্ড ইভোলিউশন’। এই বই নেহাৎই একটা পাঠ্যবই নয়। লেখক মনে রেখেছিলেন ভারতীয় প্রেক্ষাপট। বইটি লেখার জন্য দীর্ঘ ১২ বৎসর তিনি গবেষণা করেন। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদান তিনি মাথায় রেখেছিলেন। তিনি বলেছেন : —
‘যে কেউ যুক্তসঙ্গতভাবে লক্ষ্য করতে পারে যে ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত কৃতিত্বের এক বিশাল ভাণ্ডার ছিল। …. শল্য চিকিৎসা ব্যবস্থার অর্জনের শীর্ষে ছিল এবং হিন্দু চিকিৎসকেরা সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে কঠিন অস্ত্রোপচার করতে অভ্যস্ত ছিলেন।’
অপূর্ব