১৫. রাধাবিনোদ পাল : জাপান যাঁকে মাথায় করে রেখেছে
১৯৫২ সালের ৬ আগস্ট।
জাপানের হিরোশিমার শান্তি উদ্যানে সমবেত হয়েছেন মানুষজন। কয়েক বছর আগে এখানে যে পারমাণবিক বোমা, যার নাম ‘লিটল বয়’, ফেলা হয়েছিল, সেই মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণ করতে এসেছেন তাঁরা। তাঁদের মনে পড়ছে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের কথা। সকাল ৮টা বেজে ১৫ মিনিট। হঠাৎ এক চোখ ধাঁধানো আলোয় ঝলসে গেল চারদিক। কেউ কিছু বোঝার আগেই এনোলা-গো থেকে টুপ করে নেমে এসেছে লিটল বয়। একটা পারমাণবিক বোমা। আকাশ জুড়ে দেখা দিয়েছে বিশাল এক ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘ। তারপর ধ্বংসলীলা। সেদিন লিটল বয়ের বিকট শব্দ আর গামা রশ্মি, সেই সঙ্গে হাজার ডিগ্রি তাপে চোখের নিমিষে ভবলীলা সাঙ্গে হয়েছিল ৭০ হাজার মানুষের। ধুলোতে মিশে গিয়েছিল ৬৯ শতাংশ ঘরবাড়ি। পারমাণবিক বিকিরণে সেখানে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লক্ষে।
শান্তি উদ্যানের সভায় সেদিন ছিলেন এক বাঙালি আইনজীবী। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত্য নেই জাপানিদের। সেই বাঙালি তাঁর ভাষণে বললেন, —
‘যদি আবার জাপানিরা যুদ্ধে জড়ায়, তবে হিরোশিমার নৃশংসতায় নিহত নিরীহ মানুষদের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা করা হবে।’
বাঙালি আইনজীবী কেন বলেছিলেন এ কথা, কেন জাপানিরা তাঁকে আজও মাথায় করে রেখেছে, সে কথা জানার আগে তাঁর জীবনকথা একটু জেনে নেওয়া যাক।
সেই আইনজীবীর নাম রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭)।
অবিভক্ত নদিয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার দৌলতপুরের মথুরাপুর ইউনিয়নের সালিমপুর মৌজার অন্তর্গত তারাগুনিয়া গ্রামে রাধাবিনোদের জন্ম। সেটা অবশ্য তাঁদের পৈত্রিক নিবাস নয়। মামার বাড়ি।
বিপিনবিহারী পালের ছেলে তিনি। তারাগুনিয়া এল পি স্কুল ও কুষ্টিয়া হাইস্কুলে পড়ার পরে তিনি চলে আসেন রাজশাহী কলেজে। আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার পরে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথমে কিছুদিন অধ্যাপনা করলেও পরে তিনি আইনি পেশায় নিযুক্ত হন কলকাতা হাইকোর্টে। ১৯৪১ সালে তিনি ভারতের আইন উপদেষ্টা হন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধান বিচারপতির আসন লাভ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে হয়। যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে হয় জাপানকে। অপরাধ অবশ্যই ছিল। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করে।এতে ২৪০৩ জন সেনা ও বাসিন্দা মারা যায়, আহত হয় ১৪২৭ জন। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটেরও দায় ছিল। প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ ও যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে তারা। চরম নির্যাতন করে যুদ্ধবন্দিদের। জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার আর এক অপরাধ; এতে পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ নিহত হয়।
ডগলাস ম্যাকআর্থার জাপানের অপরাধ বিচারের ব্যবস্থা করেন। গঠিত হয় ‘টোকিয়ো ট্রাইবুনাল’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’। ১৯৪৬ সালের ২৯ এপ্রিল। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিন, ফ্রান্স, ভারত, নেদারল্যাণ্ডস, নিউজিল্যাণ্ড, ফিলিপাইন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র –এই ১১টি দেশ থেকে বিচারক, প্রসিকিউটার ও কর্মীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যাণ্ডের প্রধান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম ওয়েব। ২৮ জন জাপানি রাজনীতিবিদ, সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।
এই ট্রাইবুনালে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল।
বিচারের রায় ছিল মোট ১ হাজার ২৩৫পৃষ্ঠার। রায়ের শেষের দুটি ক্ষেত্রে আপত্তি তোলেন রাধাবিনোদ। তাঁর যুক্তি :
ক] যুদ্ধের সময়ে এইসব অপরাধের কোন আইন ছিল না। পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছে আইন। আগের অপরাধ পরের আইন দিয়ে কি বিচার করা যায়?
খ] জাপানের উপর পারমাণবিক হামলা না হলেও জাপান আত্মসমর্পণ করত।
গ] জাপান যদি অপরাধী হয়, তাহলে মিত্র শক্তিও অপরাধী পারমাণবিক বোমা ফেলার জন্য।
[ ‘In his dissent, Pal advanced a historical perspective that integrated Japanese actions in Asia and the Pacific within the broader story of British, French, and Dutch colonialism. Japanese policy could not be separated, he contended, from the story of oppression, exploitation and humiliation of Asia-Pacific peoples . Indian troops had been called on to fight for Britain continents away from their homes. Pal certainly spoke for many when he addressed Imperial Japan’s move as response to Western dominance. He completely rejected the prosecution’s fundamental claim of a conspiracy within the Japanese ruling class to wage war dating back to 1928.’]
রাধাবিনোদ পালের যুক্তিকে পুরোপুরি খণ্ডন করতে পারেন নি অন্য বিচারকেরা। শেষ পর্যন্ত বিচারে ৭ জন শীর্যস্থানীয় জাপানির মৃত্যুদণ্ড হয়, ১৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তবে রাধাবিনোদের চেষ্টার ফলে জাপান বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ থেকে রেহাই পায়।