১৭. রসগোল্লার কলাম্বাস বাগবাজারের নবীন দাশ
রসগোল্লা। বাঙালির প্রিয় মিষ্টি। যে মিষ্টির নাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। বাঙালির এই প্রিয় মিষ্টির আবিষ্কার কি আমাদের এই বাংলায়? বাংলায় হলে কলকাতায়, না কি অন্য কোন অঞ্চলে? নাম কি আবিষ্কারকের?
বিতর্ক আছে তা নিয়ে।
প্রথমে আসা যাক ওড়িশার কথায়। এই রাজ্যের দাবি, রসগোল্লা প্রথমে তৈরি হয় ওড়িশায়।ওড়িয়াদের হাত ধরেই যে বাংলায় রসগোল্লে গেছে, সে কথা বলেছিলেন অসিত মোহান্তি। তিনি ওড়িশার বিখ্যাত সাময়িকী ‘পৌরুষে’র সম্পাদক। বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, ‘উনিশ শতকের মাঝামাঝি বহু বাঙালি পরিবারে ওড়িয়ারা পাচকের কাজ করতেন। এঁরাই রসগোল্লার রেসিপি ওড়িশা থেকে বাংলায় নিয়ে গেছেন। বহু গবেষণাতে তার সমর্থন মিলেছে। বলা যেতে পারে, রসগোল্লার উৎপত্তি ওড়িশাতেই, তবে তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাংলায়। দুধ কেটে যে ছানা তৈরি হয়, তা অন্য হিন্দু মন্দিরে ব্রাত্য হলেও ছানার তৈরি রসগোল্লার ভোগ জগন্নাথদেবের মন্দিরের বহুকালের পরম্পরা, আর সেটাই ওড়িশার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি। রথযাত্রার শেষে নীলাদ্রিবিজয়ে জগন্নাথ ও লক্ষ্মীদেবীকে রসগোল্লা নিবেদনের রীতি বহু বহু কালের। একটি মহাপাত্র পরিবার এই নিবেদনের দায়িত্বে আছে বহুকাল ধরে –সেটা একশো, দুশো এমন কি তিশো বছরেরও প্রথা হতে পারে।’
২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রসগোল্লার জিআই ট্যাগ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মকর্তারা বলেছেন যে তাঁরা শুধু ‘ভৌগোলিক সূচক’ বা ‘ভৌগোলিক ইঙ্গিত’ (জিআই) ট্যাগের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যা স্থানীয় রসগোল্লা ‘বাংলার রসগোল্লা’ বা ‘বেঙ্গল রসগোল্লা’ নামে পরিচিত করে। তাঁদের আরও বক্তব্য, ‘ওড়িশার সঙ্গে আমাদের কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমাদের রসগোল্লা পরিচয় রক্ষা করার জন্য আমরা যা চাই তা হল আমাদের স্বাদ ও রসের সামগ্রী উৎপাদন পদ্ধতির দিক থেকে ভিন্ন।’
বাংলাদেশেরও দাবি আছে রসগোল্লাকে নিয়ে।
এই দাবির সমর্থকদের মতে বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চল রসগোল্লার আদি উৎপত্তিস্থল। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় পর্তুগিজদের সময় সেখানকার ময়রারা ছানা, চিনি, দুধ, সুজি দিয়ে গোলাকার একধরনের মিষ্টি তৈরি করত, যা ক্ষীরমোহন বা রসগোল্লা নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে বরিশালের হিন্দু ময়রারা পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা কিংবা ওড়িশায় ছড়িয়ে পড়ে।
আবার নদিয়াবাসীরা মনে করেন ফুলিয়ার হারাধন ময়রা রসগোল্লার আদি স্রষ্টা।
দাবি যাই হোক, এ কথা আজ প্রতিষ্ঠিত যে রসগোল্লার কলাম্বাস বা জনক হলেন নবীনচন্দ্র দাশ (১৮৪৫-১৯২৫)। কলকাতার বাগবাজারে তাঁর জন্ম।
১৮৬৮ সাল। নবীনচন্দ্র বাগবাজারে খুললেন এক মিষ্টির দোকান। তাঁর ইচ্ছা তিনি গতানুগতিক পথে চলবেন না। তিনি এমন এক মিষ্টি বানাবেন, যা হবে অভিনব। ছানা দিয়ে মিষ্টি তৈরি করা যায়? চেষ্টা করলেন তিনি। ব্যর্থ হলেন। জলে ফুটতে ছানা ভেঙে গেল। গোলাকার, নরম মিষ্টি তৈরি করা গেল না। জেদি নবীনচন্দ্র হাল ছাড়লেন না। ফুটন্ত রসে গলে যাবে না, শক্ত হবে না, এমন মিষ্টি তাঁকে তৈরি করতেই হবে।
কথায় বলে যে খায় চিনি তাকে জোগান চিন্তামণি।
একদিন সফল হলেন তিনি। ছানার গোল বলগুলো অল্প আঁচে ধীরে ধীরে ফুটন্ত চিনির রসে সেদ্ধ করলেন; ছানার বলগুলো ফুলে উঠল, কিন্তু নষ্ট হল না তাদের গড়ন।
তৈরি হয়ে গেল বাঙালির বিখ্যাত সেই রসগোল্লা। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দেশময়। নবীনচন্দ্রের ছেলে কে.সি.দাশ বা কৃষ্ণচন্দ্র দাশ রসগোল্লার জনপ্রিয়তাকে নানাভাবে বাড়িয়ে তুললেন।
নবীনচন্দ্রের চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরী ধীরেন্দ্রনাথ দাশ বিবিসির শুভজ্যোতি ঘোষকে বলেছিলেন, “রসগোল্লা হল বাংলার সৃষ্টি, বাংলার কৃষ্টি। জন্ম ইস্তক শুনে আসছি ‘বাগবাজারের নবীন দাশ / রসগোল্লার কলাম্বাস’। তা হলেই বুঝুন। আর এই যে স্পঞ্জের মতো রসগোল্লা, ভেতরে জালিকাটা—এ জিনিস আগে কোথায় হয়েছে? আগে যা হত তা তো শক্ত দানাদারের মতো।’