১৮. অভিরামের দ্বীপচালান মা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি
খুব পরিচিত এবং জনপ্রিয় গান। ‘হাসি হাসি পরব ফাঁসি / দেখবে ভারতবাসী’। এই গানের সুর দিয়েছিলেন অপরেশ লাহিড়ী। গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। চলচ্চিত্রে গানটি বসানো হয়েছিল শহিদ ক্ষুদিরামের মুখে। ফাঁসির মঞ্চের দিকে যেতে যেতে গানটি গাইছিলেন ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন বয়েসের ক্ষুদিরাম বসু।
এতদিন আমরা জানতাম এই গানের রচয়িতা বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস। গবেষক ড. স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল প্রমাণ করেছেন যে এই গানের লেখক বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো, যাঁর বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের রাধানগর গ্রামে। তিনিই অভিরাম। হেমচন্দ্রের স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেখা আছে ‘অভিরাম স্মৃতিস্তম্ভ’। একদিক থেকে হেমচন্দ্রই তরুণ ক্ষুদিরামের বুকে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিলেন।
মেদিনীপুর শহরের পথে একদিন হেমচন্দ্র কানুনগোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ক্ষুদিরামের। তিনি হেমচন্দ্রের কাছে একটা রিভলবার চেয়েছিলেন। তারপর গুপ্তসমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। সমিতির নির্দেশে তিনি আর প্রফুল্ল চাকি অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য গিয়েছিলেন বিহারের মজঃফরপুর। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল। কিংসফোর্ড আছেন ভেবে এক গাড়িতে বোমা ছুঁড়লেন। সে গাড়িতে ছিলেন মিসেস কেনেডি ও তাঁর মেয়ে। গুপ্ত সমিতির নেতারা বলে দিয়েছিলেন বোমা ছোঁড়ার পরে পকেটের রিভলবার ফেলে দিতে। ক্ষুদিরামের কাছে ছিল দুটো রিভলবার। তাঁর প্রিয় জিনিস। রিভলবার তিনি ফেলেন নি। ১৯০৮ সালের ২ মে রেল স্টেশনের কাছে ধরা পড়লেন রিভলবার সমেত।
১৯০৮ সালের ২১ মে থেকে শুরু হল বিচার। ক্ষুদিরামের ফাঁসি হল ১৯০৮ সালের ৮ আগস্ট। এর পরেই হেমচন্দ্র কানুনগো গ্রেপ্তার হলেন। তাঁকে বন্দি করে পাঠানো হল আন্দামানে।
হেমচন্দ্র কানুনগো (১৮৭১-১৯৫১)। ইতিহাসে তিনি উপেক্ষিত। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান আছে। স্বাধীন ভারতের যে জাতীয় পতাকা ১৭ বার বিবর্তিত হয়েছে, তিনি তার প্রথম রূপকার। জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে সেই পতাকা হাতে নিয়ে বক্তৃতা করেছিলেন মাদাম কামা। সেই সমাবেশে ছদ্মবেশে এসেছিলেন কমিউনিস্ট নেতা লেনিন। তাঁর সঙ্গে হেমচন্দ্রের সাক্ষাৎ হওয়া অসম্ভব নয়।
নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন নিজের কেরিয়ার তৈরির জন্য নয়, বোমা তৈরির কৌশল শেখার জন্য। দেশে ফিরে তৈরি করেছিলেন বোমা। শিখে এসেছিলেন বিপ্লব পরিচালনার কলা-কৌশল। কিন্তু তখনকার নেতারা হেমচন্দ্রকে গুরুত্ব দেন নি। প্রথম প্রথম স্বদেশি ডাকাতিতে অংশগ্রহণ করলেও অচিরে হেমচন্দ্র বুঝেছিলেন যে সন্ত্রাসবাদ শেষ পর্যন্ত সুফল প্রসব করবে না। দু-চারজন ইংরেজ হত্যা করলেই স্বাধীন হবে না দেশ।
আরও একটা ব্যতিক্রমী অবদান আছে হেমচন্দ্রের।
তিনি হিঁদুয়ানির আড়ম্বরের অসারতা বুঝেছিলেন। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা একহাতে গীতা ও অন্যহাতে বন্দুক নিয়ে দেশ স্বাধীন করার কাজে নেমেছিলেন। তাই মুসলমানরা এই আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হেমচন্দ্র তাঁর ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’ বইতে এই হিঁদুয়ানি ও ‘ভক্তিতত্ত্বকুজ্ঝটিকা’র তীব্র সমালোচনা করেছেন। বলেছেন অরবিন্দ ও বারীন ঘোষের কথা। আধ্যাত্মিক শক্তিলাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন অরবিন্দ। অলৌকিক গুরুর সন্ধানে তিনি তাঁর শিষ্যদের পাঠিয়েছিলেন নানা স্থানে। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মন্ত্র বলে সোনা ফলাইবার’ অবাস্তব কল্পনা।
বানান অপরিবর্তিত রেখে আমরা হেমচন্দ্রের ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি :
‘অসম্ভবকে কোন অলৌকিক উপায়ে যে না সম্ভব করতে পারে, তা’র দ্বারা যে ভারত উদ্ধার হতে পারে না, এ কথা মেনে নেওয়া আমাদের মতো সামান্য প্রাণীর নেহাৎ অন্যায় নাও হ’তে পারত। কিন্তু অরবিন্দবাবুর মত অত বড় অভিজ্ঞ নেতার পক্ষে এ কথা আদৌ বলা চলে না। কারণ, দেশের জনসাধারণ যে নিতান্ত অন্ধ-বিশ্বাসপরায়ণ এবং অজ্ঞ, তা তাঁরা বিলক্ষণ জানতেন। শুধু রাষ্ট্রনৈতিক অধীনতা কেন, আমাদের সকল দুর্ভাগ্যের বা অধীনতার একটী প্রধান কারণ যে অন্ধ-বিশ্বাসপরায়ণতা ও অজ্ঞতা, এঁরা তাও জানতেন। … এঁরা চেয়েছিলেন সহজে কাজ সারতে, দু’পাঁচ বছরে নিজ কর্মের সুফল ভোগ করতে, অবতারের পূজা পেতে, দেশের কোটিকণ্ঠে নিজ নামের জয়ধ্বনি শুনতে; আর চেয়েছিলেন এঁদের অঙ্গুলি নির্দেশে দেশের লক্ষ লক্ষ লোককে চোখ বুজে প্রাণ দেওয়াতে।’
হেমচন্দ্র ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক। বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের বিরোধ তিনি জানতেন। তিনি জানতেন দেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়ন যুক্তি ও বিজ্ঞানের হাত ধরেই হতে পারে। কোন আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারা কিছুতেই তা সম্ভব নয়। ‘সনাতন হিন্দুধর্মে’র ধুয়া তুলে মানুষকে বোকা বানাবার, মানুষের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রতিবাদ করেছেন। আন্দামান সেলুলার জেল থেকে নিজের মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে স্ত্রীকে তিনি চিঠিতে লিখেছেন যে পাত্র যদি খাঁটি মানুষ হয়, তাহলে তার জাত বিচারের দরকার নেই।
‘টাকা দিয়া কাহারও সহিত বিবাহ দিও না। কোন সদ্বংশজাত বিদ্বান, সুস্বাস্থ্যযুক্ত, উদারচেতা যুবকের সহিত বিবাহ দিবে। অর্থপীপাসু, কূপমণ্ডুক, কদাচারীর সহিত বিবাহ দিও না। পাত্র সম্বন্ধে জাতী বা সমাজের অপেক্ষা করিও না। যদ্যপী কোন ব্রাহ্ম, আর্য, মুসলমান বা খৃস্টান পাওয়া যায় সে আরও ভাল।’ (বানান অপরিবর্তিত)
পরবর্তী জীবনে কোন এক গাঢ় অভিমানবশত নিজেকে সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো। নিয়েছিলেন স্বেচ্ছা-নির্বাসন। মানবেন্দ্র রায়ের মতো কেউ কেউ তাঁর কাছে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁকে সক্রিয় করে তুলে পারেন নি।