১৯. চক্রবর্তী গণপতি জাদুতে হল মতি
মঞ্চে জ্বলছে উজ্জ্বল আলো। হঠাৎ নিভে গেল আলো। মঞ্চ অন্ধকার। আবছা আলো। মঞ্চে হাজির নরকঙ্কাল। তাদের হা হা হি হি হাসি। কাঁপন লাগে বুকে। জাদুকর এলেন মঞ্চে। সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে আছেন কঙ্কালগুলোর দিকে। তারপর একটা কঙ্কাল এগিয়ে এসে জাদুকরের মুখ থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে দিতে লাগল টান। দর্শকরা যেমন ভীত, তেমনি অবাক। জাদুকর একমুঠো ধুলো ছুঁড়ে দিলেন কঙ্কালগুলোর দিকে। ব্যস। কঙ্কাল হয়ে গেল সুন্দরী নারী।
পরের দৃশ্য। ইলিউশন বক্সের খেলা।
জাদুকরকে হাত-পা বেঁধে একটা বাক্সের মধ্যে ঢোকানো হল। বন্ধ করা হল তালা। দর্শকদের ডেকে পরীক্ষা করতে বলা হল। হ্যাঁ, সব ঠিক ঠাক। তারপর মঞ্চ একটু অন্ধকার হয়ে আলোকিত হতেই দেখা গেল জাদুকর একপাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন। তালাবন্ধ বাক্স থেকে বেরোলেন কি ভাবে?
একদিন জাদুকরের ঘরে এলেন এক অচেনা ভদ্রলোক। কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘যদি অভয় দেন তবে একটা নিবেদন করতে চাই।’
জাদুকর বললেন, ‘বলে ফেলুন।’
— ‘আপনি অদ্ভুত সব খেলা দেখান। অসম্ভবকে সম্ভব করেন। কিসের জোরে?’
জাদুকর চুপ করে থাকেন। ভদ্রলোক বলেন, ‘আমি জানি।’
— ‘জানেন? কি জানেন?’
— ‘মন্ত্রের জোরেই পারেন এসব করতে। আমাকে একটু শিখিয়ে দেন না সেই মন্ত্র।’
হো হো করে হেসে ওঠেন জাদুকর। তারপর কৌতুক করে বলেন, ‘যে মন্ত্রের জোরে আমি করে খাচ্ছি, সেই মন্ত্র জেনে নিয়ে তুমি আমার অন্ন মারতে চাও?’
জাদুকরের কথা শুনে লজ্জিত হয়ে ভদ্রলোক চুপ করে থাকেন। তখন জাদুকর বলেন, ‘শোনো ভাই, মন্ত্র-তন্ত্র সব বাজে কথা। কৌশলই আসল কথা। অনেক পরিশ্রম করে শিখতে হয়। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে পরিশ্রম করে তুমি এসব শিখতে পারবে না।’
জাদুকরের নাম গণপতি চক্রবর্তী (১৮৫৮-১৯৩৯)। পৃথিবী বিখ্যাত জাদুকর পি সি সরকারের (১৯১৩-১৯৭১) তিনি পরামর্শদাতা, পরামর্শদাতা জাদুকর দুলালচন্দ্র দত্ত, দেবকুমার ঘোষালেরও (১৯২৩-২০০৭)। হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের কাছে ছাতরা গ্রামে তাঁর জন্ম এক জমিদার পরিবারে। ছোটবেলায় লেখাপড়ায় উৎসাহ ছিল না। মেতে থাকতেন গান বাজনা নিয়ে। বছর সতেরো বয়স যখন, তখন চলে গেলেন বাড়ি ছেড়ে। কেন? কার কাছে শুনেছিলেন সাধু-সন্তরা গুপ্ত মন্ত্র জানেন, সেই মন্ত্রে অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়। তাক লাগিয়ে দেওয়া যায় মানুষকে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাল্যবন্ধু মণীন্দ্রনাথ লাহা। মণীন্দ্রের মোহভঙ্গ হয়েছিল,, তাই ফিরে এসেছিলেন আগেই। গণপতি ফিরলেন অনেক পরে। কি তিনি শিখে এসেছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় নি।
তখন তাঁর বয়েস তিরিশ ছাড়িয়েছে।
দেশে ফিরে যোগ দিলেন প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে। রঙ্গ-কৌতুক করতেন সেখানে। টুকটাক জাদু দেখাতেন। অনেকদিন ছিলেন গ্রেট বেঙ্গলে। তারপরে তৈরি করলেন নিজের দল। না, রঙ্গ-কৌতুক নয়, তিনি দেখাবেন জাদু।
সেই জাদু মানুষের মন জ্য় করেছিল।
তাসের খেলা, ইলিউশন বক্স, ইলিউশন ট্রি, ব্ল্যাক আর্ট, কংস কারাগার এমনি আরও কত কি। পরিমল গোস্বামী জানিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথও গণপতির জাদু দেখেছিলেন। মুগ্ধ হয়েছিলেন ইলিউশন বক্সের খেলা দেখে। গণপতিকে বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তালাবন্ধ করার পর সেই বাক্স পরীক্ষা করেছিলেন সন্তোষ মজুমদার আর রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘জাদুবিদ্যা’ নামে একটা বইও লিখেছিলেন তিনি। সঞ্জয় চ্যাটার্জীর জীবন বদলে দিয়েছিল সেই বই। প্রায় তিন দশক আগে সঞ্জয় সেই বই কিনেছিলেন সাড়ে চার টাকা দিয়ে। অপেশাদার জাদুকরদের জন্য সেই বই ছিল এক ধরনের ‘বাইবেল’। নবদ্বীপের পণ্ডিতরা গণপতি চক্রবর্তীকে ‘জাদুবিদ্যা বিশারদ’ উপাধি দিয়েছিলেন।