২. সেই বনলতা এই বনলতা
বনলতা সেন। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত সেই কবিতা। মুখে মুখে ফেরে বাঙালির। জীবনের সব লেনদেন যখন শেষ হয়ে যায়, তখন মুখোমুখি বসে থাকে নাটোরের বনলতা সেন। জীবনানন্দের কবিতায় অনেক নারীর নাম আছে। পদবীও আছে। বনলতা সেন এক রহস্যময়ী নারী। অনেকটা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার মতো।
ভিঞ্চির মোনালিসার বাস্তব অস্তিত্ব যেমন খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, তেমনি মোনালিসারও। কেউ বলেন বনলতা তারাপদ সুকুলের ম্যানেজার ভুবন সেনের বিধবা বোন। কেউ বা আবার মনে করেন বনলতা আসলে নাটোরের রাজবাড়ির রহস্যময়ী কোন সুন্দরী নারী। আকবর আলি খান আবার একধাপ এগিয়ে বলেছেন নাটোরের যৌনকর্মী বিনোদবালাই বনলতা সেন। তাঁর কথার প্রবল প্রতিবাদও হয়েছে।
এবার আসি ভূমেন্দ্র গুহের কথায়। তিনি জীবনানন্দ গবেষক। তাঁর মতে জীবনানন্দের লিটারারি নোটস বা দিনলিপিতে y নামে যে মেয়ের ইঙ্গিত আছে, সেই বনলতা সেন। y হলেন শোভনা। জীবনানন্দের কাকার মেয়ে। তা না হয় হল, কিন্তু শোভনা কি করে হলেন বনলতা সেন? তার উত্তর পাওয়া যাবে অশোক মিত্র মশায়ের ‘আপিলা চাপিলা’ বইতে। অশোকবাবু বলেছেন শোভনার সহপাঠী ছিলেন বনলতা। দুজনেই পড়তেন ডায়াসেশন কলেজে। ১৯৩২-৩৩ সালে স্বদেশি করার অপরাধে বন্দি ছিলেন বনলতা। আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর কথা পড়েছিলেন জীবনানন্দ। নামটি তাঁর মনে গেঁথে যায়।
বনলতা দাশগুপ্তের ডাকনাম নীনা। তাঁদের আদি নিবাস ঢাকার বিদগাঁও। স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বদেশি আন্দোলনে। বিলাতি বস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। সাহসী, ডাকাবুকো মেয়ে। সাইকেল চালাতে পারতেন, মোটর চালাতে পারতেন, অ্যারোপ্লেন চালানো শিখতে গিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে একটা পিস্তল রাখার অপরাধে তিন বছর ডেটিনিউরূপে হিজলি ও প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি ছিলেন। রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যান মেডিকেল কলেজে।
অশোক মিত্র বনলতা দাশগুপ্তের কথা বলেছেন, কিন্তু বনলতা সেন নামে ছিলেন আর একজন বিপ্লবী। বিয়ের পরে তিনি বনলতা চক্রবর্তী হন। যে সব বাঙালি নারী স্বাধীনতার লড়াইতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, বনলতা ছিলেন তাঁদেরই একজন। সুশীলা মিত্র, পারুল মুখার্জী, সরমা গুপ্তা, লাবণ্যপ্রভা দত্ত, কুন্দপ্রভা সেনগুপ্তা, সাবিত্রী দেবী, কল্পনা দত্ত, ইলা সেন, ইন্দুমতী গোয়েঙ্কা, বীণা দাস, মনোরমা বসু, শোভারাণী দত্ত, সরষূবালা সেনগুপ্তার মতো বনলতার আত্মত্যাগও অতুলনীয়। তাঁর কথাও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। জীবনানন্দ দাশ কি এই বনলতার দ্বারা প্রভাবিত হন নি?
ফরিদপুর জেলার কার্তিকপুরে বনলতা সেনের জন্ম। বাবা কালীপ্রসন্ন সেন স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই ঐতিহ্যে লালিত বনলতা। স্কুলে পড়ার সময়েই যোগ দিলেন স্বদেশি আন্দোলনে। সদস্য হলেন অনুশীলন সমিতির। ঘুরতে লাগলেন গ্রামে গ্রামে। গ্রামে গ্রন্থাগার গড়ে তুললেন। ক্লাবে ছোরা ও লাঠি খেলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। কংগ্রেস মহিলা সংঘ আর মহিলা আত্মরক্ষা সমিতেতে কাজ করতে লাগলেন। বন্দি মুক্তি আন্দোলনে ও ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিলেন। অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শোভাযাত্রার পুরোভাগে থেকে পুলিশের লাঠির আঘাতে জর্জরিত হলেন। জেলে বন্দি থাকার সময়ে এম.এ পরীক্ষ দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন। স্বাধীনতার পরে তিনি বামপন্থী মতাদর্শ গ্রহণ করলেন।
শোভনার বন্ধু বনলতা দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় ছিল জীবনানন্দের। কিন্তু বনলতা সেনের নাম কি তিনি শোনেন নি? বনলতা সেনের নামের প্রভাব কি পড়ে নি তাঁর মনে?
এটুকু লেখার পরে আমার মনে পড়ল ‘গুরুচণ্ডালী’ পত্রিকার একটি লেখার কথা। ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর সেই লেখায় বলা হয়েছে বনলতা সেন নারী নয়। অন্ধকার বিদিশার নিশার মতো চুল বা পাখির নীড়ের মতো চোখ তো পুরুষেরও হতে পারে। ‘গুরুচণ্ডালী’র বক্তব্য সমর্থন করেছেন ঐশি আলম পৃথ্বী ‘আমরাই বাংলাদেশ’ পত্রিকার এক প্রবন্ধে।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসাকেও নারী বলতে চান না কিছু কিছু গবেষক। তাঁদের মতে মোনালিসা আসলে লিওনার্দোর নিজেরই প্রতিকৃতি। শিল্পী Lillian Schwartz কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে মোনালিসার মুখে দাড়ি ও ভ্রূ লাগিয়ে মিল খেঁজে পেয়েছেন দ্য ভিঞ্চির।
বনলতা সেনের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা অসাধারণ। সেই স্কুল জীবন থেকেই কৌতূহল কে বনলতা সেন? দিলীপদার অন্বেষণ যুক্তিগ্রাহ্য পথে ইতিহাসের সরণি বেয়ে যথার্থ অনুসন্ধানীর মতো কয়েকজন বনলতা সেন খুঁজে বার করেছেন। হ্যা, এরা যেকেউ হতে পারে বনলতা সেন— যার জন্য নীরবে অপেক্ষা করা যায় অনন্তকাল।
দিলীপদা ইতিহাস সচেতন মানুষ বলেই এমন দূরদৃষ্টি নিয়ে বনলতা সেনের প্রায় নিকট সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছেন।
ধন্যবাদ দিলীপদা
স্বপন মুখোপাধ্যায়।
ধন্যবাদ স্বপনবাবু ।