২০. অঘোর-প্রকাশের অঘোরকামিনী
‘অঘোর-প্রকাশ’। একটি জীবনীগ্রন্থের নাম। ১৯০৭ সালে পারিবারিভাবে সে বইটি প্রকাশিত হয় (২১১নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, ব্রাহ্মমিশন প্রেসে শ্রীকার্তিকচন্দ্র দত্ত দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত; সন ১৩১৪ সাল)। ১৯২২ সালে সেটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। জীবনীগ্রন্থ, কিন্তু অভিনব। উদ্বোধন, সূচনা, বিকাশ ও পরিণতি — এই চারটি পর্ব, শেষ তিনটি অধ্যায়ের অনেকগুলি উপ-বিভাগ আছে। এক স্বামী লিখছেন তাঁর স্ত্রীর জীবনী, লিখছেন নিটোল প্রীতি ও শ্রদ্ধায় অভিভূত হয়ে। বাংলা সাহিত্যে এ রকম নজির কি আছে? ‘উদ্বোধনে ‘অংশে স্বামী লিখছেন :
‘তোমার দেহত্যাগের পর ত্রিশ দিনের দিন তোমার সঙ্গে কথোপকথন হয়, তাহাতে তুমি বলিয়াছিলে শুদ্ধাচার—শুদ্ধচিন্তা –শুদ্ধ ব্যবহার না হইলে তোমার সঙ্গে আর অধিক মিলন হইবার সম্ভাবনা নাই। আরও বলিয়াছিলে, তোমার মত না হইলে উন্নত মিলনের ভূমিতে উপনীত হইতে পারিব না।
‘সেই দিন হইতে তোমার মত হইবার জন্য আরও ব্যাকুল হইলাম। আবার সেই দিন হইতে, কি জানি কেন, তোমার গুণ বর্ণনা করিতে লাগিলাম। তাহাতেই এই জীবনীর সূত্রপাত। কত সময়ে তোমার গুণ বর্ণনা করিতে গিয়া আমি তন্ময় হইয়া গিয়াছি।’
স্বামীর নাম প্রকাশচন্দ্র রায়, স্ত্রীর নাম অঘোরকামিনী।
অঘোরকামিনী (১৮৫৬-১৮৯৬) চব্বিশ পরগণার মাইহাটির শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র দশ বৎসর বয়েসে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় উনিশ বছরের যুবক প্রকাশচন্দ্রের সঙ্গে। অন্য ধাতুর মানুষ প্রকাশচন্দ্র। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ব্যতিক্রম। নিরক্ষর স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখাতে চান তিনি। স্বামীর ভূমিকার সঙ্গে শিক্ষকের ভূমিকায় হলেন অবর্তীর্ণ। নিজেই লিখছেন :
‘সকলে শয়ন করিলে যখন তুমি শয়ন করিতে আসিতে তখন তোমার বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ হইত। আমি গুরু হইয়া স্বতন্ত্র বসিতাম, তুমি ছাত্রী হইয়া ভয়ে ভয়ে দূরে বসিতে। অনুরাগের সহিত আপনার পাঠ শিখিতে। এই রূপে তোমার ক,খ আরম্ভ হইল; ক্রমে প্রথম ভাগ দ্বিতীয় শেষ হইয়া গেল।’
দাতা ও গ্রহীতার চমৎকার রসায়ন। আগ্রহ দুজনেরই। একাকী গায়কের নহে তো গান/মিলিতে হবে দুইজনে। লেখাপড়া শুধু নয়। মিশতে হবে সমাজে। নারী বলে পর্দানসীন হয়ে থাকলে চলবে না। প্রকাশচন্দ্র নাস্তিক ছিলেন। পরে ব্রাহ্ম হলেন। মন দিলেন সমাজসেবামূলক কাজে। তিনি লিখছেন :
‘বুঝিলাম বাহিরের জনসমাজের সেবা না করিলে ঘরের ধর্ম ঠিক থাকে না; আর বাহিরের জগৎ দেখিয়া মনটা বড় না হইলে ভাল লোকের সঙ্গে মিশিয়া আত্মা উন্নত না হইলে ব্রাহ্মধর্ম সাধন করা যায় না। … তুমিও ইহা বুঝিলে, তাই এ সময় হইতে আমাদের চেষ্টা হইল যে কিসে আমাদের জীবন বিশেষত তোমার জীবন সংসারের সীমা ছাড়াইয়া বাইরে গিয়া ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে।’
আসলে ঘর ও বাহিরকে মিলিয়ে নেবার চেষ্টা। একাধিক সন্তান হয়েছে। সংসারের খরচ বেড়েছে। স্বামীর আয়ই তেমন পর্যাপ্ত নয়। সেসব সামলাতে হত অঘোরকামিনীকে। সামলাতেন। ক্ষোভ ছিল না। বিরক্তি ছিল না। অনেক সময়ে ছি ছি করেছে রক্ষণশীল সমাজের জ্যাঠামশাইরা। উপেক্ষা করেছেন সে সব সমালোচনা।
বাঁকিপুর সংসার সামলে মেয়েদের জন্য বোডিং হাউজ তৈরি করেছেন। অন্যকে শেখাতে হলে নিজেকেও শিখতে হবে। তাই লখনউতে মিস থবার্নের উইমেন্স কলেজে চললেন অঘোরকামিনী। ১৮৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। স্ত্রী চলে যাচ্ছেন দূরে, স্বামী লিখছেন :
‘আমার জন্য তোমাকে আবদ্ধ রাখিতে চাহিলাম না; উড়াইয়া দিয়া, উড়িতে দিয়া আক্ষেপ করিলাম না, উড়িতে গিয়া তুমিও আক্ষেপ করিলে না।’
স্ত্রী উড়ছেন, স্বামী তাঁকে উড়তে সাহায্য করছেন — এসব কথা শুনে সনাতনী সমাজের মাতব্বররা কানে আঙুল দেবেন নিশ্চয়ই। আসলে সেকালের নারীবাদী প্রকাশচন্দ্র অঘোরকামিনীকে কূপমণ্ডুকতার দুর্গে বন্দি করে রাখতে চান নি। তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন :
‘বাহিরে আসিয়া তোমার মনের স্বাধীনভাব বাড়িতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে নারীজাতির অধিকার বিষয়ে, নারী জীবনের আদর্শ বিষয়ঢ চিন্তার স্রোত খুলিয়া যাইতে লাগিল। যতই তুমি বাহিরের জগৎ দেখিতে লাগিলে, ততই বুঝিতে পারিলে এদেশে নারীর অবস্থা কত হীন, এবং তাঁহাদের উন্নতির পথে কত বাধা, ততই তোমার মনে ক্লেশও হইতে লাগিল।’
লেখাপড়া শিখে, সমাজের সঙ্গে মিশে সকলেই যুক্তিবাদী হয় না; বিসর্জন দিতে পারে না কুসংস্কার। অঘোরকামিনী পেরেছিলেন। শুধু স্বামীর সহায়তা নয়, তাঁর নিজের ইচ্ছাশক্তি না থাকলে তা সম্ভব হত না। শাঁখা-সিঁদুর না পরলে স্বামীর অকল্যাণ হবে, এ সংস্কার আ্জও বহাল তবিয়তে আছে। অথচ আজ থেকে দেড়শ বছর আগে অঘোরকামিনী স্বামীর বর্তমানেই শাঁখা-সিঁদুর পরিত্যাগ করেছিলেন। আর যাঁর অকল্যাণ হবে, সেই স্বামী স্ত্রীর কাজকে সমর্থন করে লিখছেন :
‘প্রথম প্রথম শাঁখা পরিধান করিতে, শেষে চুড়ি পরিতে. কিন্তু জীবনের শেষ কয় বৎসর শূন্য হস্তেই থাকিতে। হাতে নোয়া না থাকিলে স্বামীর অকল্যাণ হয়, এ কুসংস্কার তোমার ছিল না।’
প্রকাশচন্দ্র রায় ও অঘোরকামিনী বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী, প্রবাদপ্রতিম ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের বাবা ও মা। রাজনীতিক হিসেবে বিধানচন্দ্রের বিরুদ্ধে সব সমালোচনাকে উপেক্ষা করতে পারি এই রকম মা-বাবার জন্য।
অসাধারণ!
অসাধারণ ব্যক্তিত্ব!
পড়তে খুব ভাল লাগছিল। শ্রদ্ধেয় ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের বাবা-মার নাম জানতাম, তাঁদের এই কাহিনী পড়ে খুব ভাল লাগল।
আপনি অনেক মানুষের অজানা কাহিনী লিখেছেন এই পেজফোর পত্রিকাতে। অনেক অজানা কাহিনী জানা হচ্ছে।
খুব ভাল উদ্যোগ।
শ্রদ্ধা জানাই।