২১. ভবেন্দ্রমোহন : রসরাজ অমৃতলালের ‘ভীম ভবানী’
কলকাতার স্বদেশিমেলায় এসেছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, রসরাজ অমৃতলাল বসু। সে মেলায় দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করছেন এক যুবক। দর্শকরা মুগ্ধ। স্বদেশি সে যুগে দৈহিক শক্তির বড় কদর। রসরাজ অমৃতলাল বলে বসলেন, ‘এ যে দেখি কলিকালের ভীম।’ যুবকের ডাকনাম ছিল ভবানী। তার সঙ্গে জুড়ে গেল রসরাজের ‘ভীম’। সেই থেকে সেই যুবক ‘ভীম ভবানী’ নামে পরিচিত হলেন।
ভীম ভবানীর আসল নাম ভবেন্দ্রমোহন সাহা (১৮৯০-১৯২২)।
কলকাতার বিডন স্ট্রিটে তাঁর জন্ম। উপেন্দ্রমোহন তাঁর বাবা। উপেন্দ্রমোহনের নয়টি সন্তানের মধ্যে ভবানী পঞ্চম। লেখাপড়ায় মন ছিল না। বাবা শরীরচর্চা করতেন। ভবানীর মন ছিল শরীরচর্চায়। সেই ইচ্ছাটা বেড়ে গেল আর একটা কারণে। ছেলেবেলা থেকে ভুগতেন ম্যালেরিয়ায়। শীর্ণ দুর্বল শরীর। এই রকম সময়ে পাড়ার এক বন্ধুর সঙ্গে বচসা। সেই বন্ধু রোগা ভবানীকে পিটিয়ে দিল আচ্ছা করে। ঠেকাতে পারলেন না ভবানী।
তখনই সংকল্প নিলেন শরীরটাকে তাগড়াই করে গড়ে তুলতে হবে। অতীন্দ্রনাথ বসুর ব্যায়ামের আখড়া ছিল সিমলায়। ছুটলেন সেখানে। কুস্তি শিখলেন কিছুদিন। সেখান থেকে গেলেন অম্বিকাচরণ গুহের (১৮৪৩-১৯০০) আখড়ায়। এখানে নরেন্দ্রনাথও আসতেন কুস্তি শিখতে। নরেন্দ্রনাথ হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। সেখান থেকে গেলেন দর্জিপাড়ায়। ক্ষেতুবাবুর আখড়ায়। চার বছর। মাত্র চার বছরে ভবানী রপ্ত করে নিলেন কুস্তির কলা-কৌশল।
এই সময়ে কলকাতায় খেলা দেখাতে এসেছিলেন শ্রীকাকুলামের তেলুগু সন্তান কোডি রামমূর্তি নাইডু (১৮৮৩-১৯৪২)। তাঁকে সবাই ‘কলিযুগের ভীম’ বলতেন। তাঁবুর বাইরে ঘুরছেন ভবানী। হঠাৎ নজরে পড়ল রামমূর্তির। ছেলেটির বলিষ্ঠ শরীর দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। তিনি ভবানীকে ডেকে বললেন, ‘খেলা দেখতে এসেছ? ভেতরে এসো। তোমাকে বসিয়ে দেবো।’
ভবানী মুগ্ধ। রামমূর্তি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘কত বয়েস তোমার?’
— ‘উনিশ।’
— ‘এই বয়েসেই এমন শরীর তোমার!’
— ‘আমি কুস্তি শিখেছি।’
— ‘বাঃ। তুমি চলে এসো আমার দলে।’
বাড়িতে না জানিয়ে ভবানী চলে গেলেন রামমূর্তির সঙ্গে। ঘুরতে লাগলেন দেশ-বিদেশ। রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, জাভা…। জাভায় তো এক কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়লেন। এক ওলন্দাজ কুস্তিগির রামমূর্তির সঙ্গে লড়তে চাইছিলেন। ভবানী তাঁকে বললেন, ‘আগে আমার সঙ্গে তো লড়ুন, তারপরে আমার গুরুর সঙ্গে লড়বেন।’ তিন মিনিটেই ওলন্দাজ বীর-পুঙ্গব পপাতধরণিতলে। রামমূর্তির কাছে তিনি শিখেছিলেন সার্কাসের পোষা হাতিকে বুকে তোলার কৌশল।
এরপর তিনি প্রিয়নাথ বোসের দলে ঢুকলেন। সেখান থেকে হিপড্রোম সার্কাসে। সেখান থেকে আবার কে বসাকের সার্কাসে। কি সব লোমহর্ষক খেলা! বুকের উপর ৪০ মণ পাথর চাপিয়ে রাখা, চলন্ত মোটরগাড়িকে পেছন থেকে টেনে ধরে তাকে চলতে না দেওয়া, বুনো হাতিকে অনায়াসে নিজের বুকের উপর দিয়ে চালাতে দিয়ে শেষে অক্ষতভাবে উঠে আসা। তাঁর খেলার বিবরণ পাওয়া যাবে শচীন্দ্র মজুমদারের ‘বলীদের গল্প’ বইতে।
এসব করতে গিয়ে বিপদে যে পড়েন নি, তা নয়। সাংহাইএর ঘটনা। সেখানে এক আমেরিকান ভবানীকে কুস্তিতে আহ্বান করেন। শেষে সেই আমেরিকান হেরে যান কুস্তিতে। হেরে যাওয়ার অপমান ভুলতে পারেন নি তিনি। ভবানীকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। স্থানীয় কনসালের চেষ্টায় তাঁর প্রাণরক্ষা হয়। কনসাল বলেন, ‘তোমার শক্তির পরীক্ষা করতে চাই।’ পরীক্ষাটা হল : তিনি মোটরগাড়ি চালাবেন, ভবানীকে সে গাড়ি আটকে দিতে হবে। তা যদি তিনি পারেন, তাহলে কনসাল তাঁর নতুন মিনার্ভা গাড়িটা তাঁকে দিয়ে দেবেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন ভবানী। একবার বুনো হাতি বুকের উপর ওঠাতে ভবানীর পেট ফেটে যায়। বহু কষ্টে সে যাত্রা বেঁচে ফেরেন।
দেহের শক্তিতে তিনি যেমন ভীম ছিলেন, তেমনি খেতেনও ভীমের মতো। অনিলচন্দ্র ঘোষ তার কৌতুককর বর্ণনা দিয়েছেন :
‘প্রাতে ২০০শত বাদামের শরবৎ ও এক ছটাক গাওয়া ঘি, মধ্যাহ্নে সাধারণ ডাল-ভাত, অপরাহ্নে ২০০ টাকার ফল ও ৫০টি বাদামের শরবৎ ও ১ সের মাংস, রাত্রে আটার রুটি ও তিন পোয়া মাংস।’