২৩. অনন্তহরির হল ফাঁসি, দেখল ভারতবাসী
নবদ্বীপ ঘাট থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ি ছুটে আসছে। যাবে কৃষ্ণনগর পোস্ট অফিসে। কি আছে গাড়িতে? আছে টাকা। শিমুলতলার কাছাকাছি আসতে গাছের আড়াল থেকে কে যেন ডাকল গাড়োয়ানকে। কে রে বাবা? একটু ভয় হল গাড়োয়ানের। জায়গাটা বেশ নির্জন। এখানে কে ডাকে তাকে? কেন ডাকে? কুমতলব নয় তো !
হঠাৎ গাড়োয়ানের একটা কথা মাথায় এলো। সে শুনেছে স্বদেশি ডাকাতদের কথা। তারা লুঠ করে ইংরেজের টাকা। সে কি তবে স্বদেশি ডাকাতের পাল্লায় পড়ল? তারা যদি টাকা লুট করে তবে সে কি কৈফিয়ৎ দেবে ইংরেজের কাছে?
গাড়োয়ান যেন ডাকটা শুনতে পায় নি। এমনি ভাব দেখিয়ে সে এগিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটা মানুষ। তার মুখ ঢাকা। হাতে পিস্তল। তার পেছন পেছন এলো আরও কয়েকটা মানুষ। তাদেরও মুখ ঢাকা। প্রথম যে দেখা দিয়েছিল সে গাড়োয়ানের পা লক্ষ্য করে গুলি চালালো। পড়ে গেল গাড়োয়ান।
তারা গাড়ির টাকা লুট করে চম্পট দিল।
গাড়োয়ানের পায়ে যিনি গুলি করেছিলেন, সেই যুবকের নাম অনন্তহরি মিত্র (১৯০৬-১৯২৬)। রামলাল মিত্রের ছেলে অনন্তহরি জন্মগ্রহণ করেন চুয়াডাঙা জেলার বেগমপুরে। মামার বাড়িতে। প্রথমে তিনি গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে জড়িয়ে পড়েন অসহযোগ আন্দোলনে।
কিন্তু অহিংস অসহযোগ তাঁকে খুব বেশি আকৃষ্ট করতে পারল না। বিপ্লবস্পন্দিত বুক তাঁর। তাই যোগ দিলেন সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে। কৃষ্ণনগরের বিপ্লবী সংগঠনে ঢুকে পড়লেন। পুলিশের নজর পড়ল। তাই গা ঢাকা দিতে হবে। তিনি চলে এলেন কলকাতার শোভাবাজারে।
তখন গুপ্ত সংগঠনের কর্মীরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন একটা আস্তানা, যেখানে পুলিশ আর গোয়েন্দার নজর এড়িয়ে তাঁরা বোমা তৈরি করতে পারবেন।
পাওয়া গেল এই রকম ঠেক।
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের কাছে আড়িয়াদহের বাচস্পতিপাড়ায়। নিরিবিলি জায়গা। এটাই হবে বোমা বানানোর আখড়া।
১৯২৫ সালের ১০ নভেম্বর।
শোভাবাজার আর আড়িয়াদহের বিপ্লবীদের আখড়ার সন্ধান পেল পুলিশ। শুরু হল তল্লাশি। পেয়ে গেল তারা বেশ কিছু রিভলভার, বোমা আর বোমা তৈরির মাল-মশলা। অনন্তহরিসহ মোট ১১ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। এঁরা হলেন : হরিনারায়ণ চন্দ্র, বীরেন ব্যানার্জী, নিখিলবন্ধু ব্যানার্জী, রাজেন লাহিড়ী, ধ্রুবেশ চ্যাটার্জী, রাখালচন্দ্র দে, অনন্তহরি মিত্র, দেবীপ্রসাদ চ্যাটার্জী, শিবরাম চ্যাটার্জী, প্রমোদরঞ্জন চৌধুরী, অনন্ত চৌধুরী। শুরু হল রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। একেই বলে দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলা। এই মামলায় বিপ্লবীদের পক্ষে লড়েছিলেন এ,সি, মুখার্জী, হর্যনাথ ব্যানার্জী, সি.পি.বিশ্বাস, এ.কে. মুখার্জী, হেমন্তকুমার রায়চৌধুরী; এঁদের বিপক্ষে অর্থাৎ শাসকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট জেনারেল বি.এল.মিত্র, পাবলিক প্রসিকিউটার এন.এন, ব্যানার্জী এবং গুণেন সেন।
অনন্তহরিকে নিয়ে আসা হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।
সেখানেও ভয়ে ভীত হয়ে নিশ্চুপ ছিলেন না অনন্তহরি। ভূপেন চট্টোপাধ্যয়ের খবর শুনলেন। কে এই ভূপেন চট্টোপাধ্যায়?
ইনি ছিলেন এক অত্যাচারী দারোগা। ইংরেজের পা-চাটা মানুষ। এঁর কাজ ছিল আলিপুর জেলের রাজবন্দিদের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসার অভিনয় করে তাঁদের সঙ্গে মিশে যাওয়া। তারপর কথার ছলে বিপ্লবীদের হাঁড়ির খবর জেনে নেওয়া। অনেক রাজবন্দি তাঁর মতলব বুঝতে পারতেন না। মনে হত তিনি বুঝি রাজবন্দিদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
ভূপেনের খবর গেল বিপ্লবী আন্দোলনের নেতাদের কাছে। তাঁরা বুঝলেন এই ছদ্মবেশী শয়তানকে ধরাধাম থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
ভার দেওয়া হল অনন্তহরি ও প্রমোদরঞ্জনকে।
১৯২৬ সালের ২৮ মে।
জেলে সকালবেলা খাবারের পর্ব মিটেছে। দারোগা ভূপেন হাসি হাসি মুখ করে ঢুলেন অনন্তহরিদের লকআপে। বিপ্লবীরা আগে থেকেই একটা লোহার ডাণ্ডা জোগাড় করে রেখেছিলেন। ভূপেনের মাথায় পড়ল সেই ডাণ্ডা। চিৎকার। পাহারাদাররা ছুটে এলো। তার আগেই কাজ শেষ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছেন দারোগা ভূপেন চট্টোপাধ্যায়।
লক আপেই দারোগা হত্যা? নিদারুণ অপরাধ। বিচারক ফাঁসির হুকুম দিলেন অনন্তহরি মিত্র ও প্রমোদরঞ্জন চৌধুরীকে। হত্যায় সহযোগিতা করার জন্য যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হল ধ্রুবেশ চট্টোপাধ্যায়, অনন্ত চক্রবর্তীর।
১৯২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর।
ভোরবেলা ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিলেন কুড়ি বছরের তরতাজা তরুণ বিপ্লবী অনন্তহরি মিত্র।
অজানা ইতিহাস জানতে পেরে সমৃদ্ধ হলাম।