২৪. ইতিহাসের পাতায় দাগ কাটল মধুসূদনের হাতের ছুরি
জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন। বেথুন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি লিখছেন :
‘মেডিকেল কলেজের সব ফটকগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, পাছে এই বিধর্মী কাজ বন্ধ করার জন্য প্রাচীনপন্থীরা কলেজে আক্রমণ চালায়। মেডিকেল কলেজের মর্গে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। সেখানে উপস্থিত মেডিকেল কলেজের সব অধ্যাপক, ছাত্ররা ভিড় করে দাঁড়িয়েছে ঘরের বাইরের দরজায়, জানালার ফাঁকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছে অনেকে। সারা ক্যাম্পাস ফাঁকা।
‘নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার গুভিডের সঙ্গে ঘরে ঢুলেন একদা সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্র পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত। বর্তমানে যিনি একই সঙ্গে মেডিকেল কলেজের ছাত্র ও অধ্যাপক। ডাক্তারি শাস্ত্রের অবিচ্চেদ্য অংশ সার্জারি, যা ভারতে এখনও করানো সম্ভব হয় নি শব-ব্যবচ্ছেদ নিয়ে বর্ণ হিন্দুদের গোঁড়া কুসংস্কারের জন্য। সেই কাজটি আজ করতে এসেছেন পণ্ডিত মধুসূদন, হাতে তাঁর শব-ব্যবচ্ছেদ করার তীক্ষ্ণ ছুরি। তাঁর সঙ্গে যোগ দেবার জন্য দলে নাম ছিল উমাচরণ শেঠ, রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকানাথ গুপ্ত, ও নবীনচন্দ্র মিত্রের। কিন্তু তাঁরা দরজার বাইরেই ভিড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
‘ঘরে ঢুকে মধুসূদন বিনা দ্বিধায় এগিয়ে গেলেন শবের দিকে। শবদেহের নির্ভুল জায়গায় ছুরিটি প্রবেশ করালেন তিনি। মুখে কোনও আড়ষ্টতা বা অস্থিরতার চিহ্ন নেই। খুব নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করলেন ব্যবচ্ছেদের কাজ। ভারতবর্ষের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞানী শুশ্রুতের পর এই প্রথম হল শবব্যবচ্ছেদ। দীর্ঘকালের কুসংস্কারের আর গোঁড়া পণ্ডিতদের বাধানিষেধের বেড়া ভেঙে দিলেন তিনি এই একটি কাজের মাধ্যমে। নিষেধের জগদ্দল ভার সরিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভারতবর্ষ এক নতুন যুগে প্রবেশ করল।’ (উদ্ধৃতিটি অতনু চক্রবর্তীর লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে)
বেথুন সাহেব যে ঘটনাটির কথা বললেন, সেটি ঘটেছিল ১৮৩৬ সালের ১০ জানুয়ারি। তার আগের বছরে মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। ডাঃ শঙ্করকুমার নাথের বক্তব্য অনুযায়ী (তাঁর লেখা বই ‘কলকাতা মেডিকেল কলেজের গোড়ার কথা ও পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত’) শব ব্যবচ্ছেদের দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ১৯৩৬ সালের ২৮ অক্টোবর। সেদিন শব ব্যবচ্ছেদ করেন চার জন ছাত্র —রাজকৃষ্ণ দে, উমাচরণ শেঠ, দ্বারকানাথ গুপ্ত, নবীনচন্দ্র মিত্র।
কিন্তু কে এই মধুসূদন গুপ্ত (১৮০০-১৮৫৬)?
তিনি হুগলি জেলার বৈদ্যবাটির এক আয়ুর্বেদিক বৈদ্য পরিবারের সন্তান। তাঁর ঠাকুর্দা ছিলেন নবাব পরিবারের চিকিৎসক। আয়ুর্বেদ ভারতের এক প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে এই চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভব। দুটি সংস্কৃত শব্দের সংমিশ্রণে ‘আয়ুর্বেদ’ এর উৎপত্তি — ‘আয়ুষ’ (অর্থাৎ জীবন) এবং ‘বেদ’ (অর্থাৎ বিজ্ঞান)। প্রাথমিক শিক্ষার পরে তিনি তিনি ভর্তি হন সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগে। অবশ্য তার আগে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কেবলরাম কবিরাজের। সেই কেবলরামের কাছে তিনি শিখেছিলেন রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, ওষুধ দেওয়ার রীতি। বিভিন্ন গ্রামে রোগীও দেখতেন তিনি। ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
আয়ুর্বেদে অসাধারণ দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মধুসূদন সংস্কৃত ন্যায়শাস্ত্র, অলংকার, এবং ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। সংস্কৃত কলেজে আয়ুর্বেদ পড়ার সময়ে প্রাণীর শারীরতত্ত্ব সম্বন্ধে সৃষ্টি হয় তাঁর আগ্রহ। কাঠ বা মোম দিয়ে অস্থি তৈরি করে তিনি খুঁটিয়ে দেখতেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন জীবজন্তুর দেহ ব্যবচ্ছেদ করতেন।
১৮৩২ সাল।
স্থানীয় মানুষদের চিকিৎসাদানের জন্য সংস্কৃত কলেজের পাশে একটি একতলা বাড়িতে তৈরি হয় হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসা বিষয়ে বক্তৃতা হত। মধুসূদন গুপ্ত সেইসব বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শুধু তাই নয়। এই সময়ে তাঁর হাতে আসে হুপারের ‘Anatomist’s Vade Mecum’ বইটি। রবার্ট হুপারের (১৭৭৩-১৮৩৫) এই বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৮০৯ সালে। মধুসূদন সংস্কৃত ভাষায় এই বই অনুবাদ করে ১ হাজার টাকা পুরস্কার লাভ করেন। মধুসূদন ‘লণ্ডন ফার্মাকোপিয়া’ বইটিও ‘ঔষধ কল্পাবলী’ নামে অনুবাদ করেন। ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘অ্যানাটমি’।
১৮৩৫ সালে চালু হল মেডিকেল কলেজ। ফলে বন্ধ হয়ে গেল সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগ। ১৮৩৫ সালের ১৭ মার্চ মধুসূদন মেডিকেল কলেজের ডেমোনেস্ট্রেটারের কাজে নিযুক্ত হলেন, সেই সঙ্গে সহকারী অধ্যাপকের কাজও করতে থাকেন। কিন্তু গোল বাধল। আপত্তি করলেন ছাত্ররা। একজন সহপাঠীর কাছে পড়বেন তাঁরা? এ কেমন কথা? ডাক্তারের সমতুল্য হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিতে হল। সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন তিনি।
ভারতে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী যে মধুসূদন গুপ্ত নন, এমন একটা বক্তব্য রেখেছিলেন ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার, তাঁর ‘দ্য ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন’ পত্রিকায়, ১৮৭৩ সালে। সেই সূত্র ধরে কেউ কেউ, যেমন জয়ন্ত ভট্টাচার্য, বলতে চান যে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী মধুসূদন গুপ্ত নন, প্রথম চার ছাত্রের একজন। কিন্তু ডাঃ শঙ্করকুমার নাথ প্রত্যক্ষদর্শী বেথুন সাহেবের বক্তব্য তুলে ধরে জানিয়েছেন যে মধুসূদনই প্রথম শব ব্যচ্ছেদকারী। বেথুন সাহেবের বক্তব্য নথিভুক্ত আছে ১৮৫১ সালের ‘জেনারেল রিপোর্ট অন পাবলিক ইনস্ট্রাকশনে’র ১২২-১২৬ পাতায়।