৩১. যজ্ঞাগুণ্ডা হলেন চারণকবি মুকুন্দ দাস
পরিচিত ছিলেন যজ্ঞাগুণ্ডা নামে। তাঁর আসল নাম যজ্ঞেশ্বর দে। ঢাকাজেলার বিক্রমপুরের গুরুদয়াল দে আর শ্যামাসুন্দরীর সন্তান। জন্ম বিক্রমপুরে হলেও যজ্ঞেশ্বরের শৈশব অতিবাহিত হয় বরিশালে। মধ্যবিত্ত পরিবার। গুরুদয়াল ডেপুটির আর্দালির চাকরি করেন। আঠাশ বছরে শ্যামাসুন্দরীর প্রথম সন্তান যজ্ঞেশ্বরের জন্ম। শ্যামাসুন্দরী মনে করতেন এই সন্তান মহাদেবের দান। তাই তাঁর নাম দিলেন যজ্ঞেশ্বর।
পাঠশালায় পড়া শেষ করে যজ্ঞেশ্বর এলেন ব্রজমোহন স্কুলে। অশ্বিনীকুমার দত্তের স্কুল। সে স্কুল ছিল সত্য প্রেম ও পবিত্রতার পরীক্ষাগার। স্কুলের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বরিশালে। এই স্কুলে ভর্তি হলেন বটে যজ্ঞেশ্বর, কিন্তু পড়াশুনোয় বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। টেনেটুনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছে পড়াশুনোর ইতি। বন্ধু-বান্ধব জুটেছিল অনেক। তাদের দৌরাত্ম্যে মানুষ অস্থির। লোকে বলতে যজ্ঞাগুণ্ডার দল। এদের পথে আনার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিটসানবেল যজ্ঞাগুণ্ডার দলে মিশে গেলেন। চাকরি-বাকরির লোভ দেখাতে লাগলেন। সেই লোভে মজল অনেকে। দল গেল ভেঙে। তখন যজ্ঞেশ্বর পারিবারিক মুদির দোকানে যোগ দিলেন।
মুদির দোকান চালাতে গিয়ে আলাপ হল বীরেশ্বর গুপ্তের সঙ্গে। বৈষ্ণব গায়ক বীরেশ্বর। যজ্ঞেশ্বর ভিড়ে গেলেন বীরেশ্বরের কীর্তনের দলে। গানের গলা ছিল যজ্ঞেশ্বরের। আর ছিল সাংগঠনিক প্রতিভা। তাই কিছুদিন পরে নিজেই খুলে বসলেন কীর্তনের দল। আস্তে আস্তে নাম হল দলের। কিন্তু ভালো কীর্তনীয়া হতে গেলে বৈষ্ণব পদ আর পদকর্তাদের কথা জানতে হবে, পড়তে হবে পদাবলি, পড়তে হবে চৈতন্যজীবনচরিত, দীক্ষা নিতে হবে ভালো কোন গুরুর কাছে।
যজ্ঞেশ্বর অবধূত রামানন্দ হরিবোলানন্দের কাছে গেলেন। দীক্ষার পর তাঁর নতুন নাম হল — মুকুন্দদাস। বদলে গেল বেশভূষা। অন্তর্হিত হল ঔদ্ধত্য। পরিধানে শুভ্র শ্বেতবস্ত্র, বক্ষে শ্বেত উত্তরীয়, কুঞ্চিত কেশদাম, গলায় তুলসির মালা, মুখে রাধা-কৃষ্ণের নাম।
কীর্তনীয়া যোগেশ পালের বৈঠকখানায় যেতেন যজ্ঞেশ্বর। সেখানে আসত নানা পত্র-পত্রিকা। আলোচনা হত দেশ-বিদেশের রাজনীতি নিয়ে। সেসব শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে মুকুন্দদাসের মনে লাগল দেশপ্রেমের দোলা। তারপর এল বঙ্গভঙ্গের ঢেউ। ভাসিয়ে নিয়ে গেল মুকুন্দকে। স্বদেশি গানের দিকে ঝুঁকে পড়লেন তিনি।
ছোটলাট হয়ে এসেছেন ব্যামফিল্ড ফুলার। লাট হিসেবে ছোট হলেও নির্যাতনে ছিলেন বিশাল। ফুলার আদেশ দিলেন ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি দেওয়া চলবে না। তাঁর নির্দেশে পুলিশ পণ্ড করে দিল বরিশালের প্রাদেশিক সম্মেলন। কিন্তু বরিশালে ফুলার যেমন আছেন, তেমনি আছেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। তাঁর নির্দেশে আন্দোলন চলতে লাগল। তিনি ডেকে পাঠালেন মুকুন্দকে। বললেন, ‘যজ্ঞা, তুই গান গেয়ে জাগিয়ে তোল দেশের মানুষকে। চারণের কাজ করবি তুই। তুই হবি চারণ কবি।’
সেই আদেশ শিরোধার্য করে বেরিয়ে পড়লেন মুকুন্দদাস। তৈরি করলেন যাত্রাপালা। প্রথম স্বদেশি যাত্রা ‘মাতৃপূজা’। মুকুন্দের উদাত্তকণ্ঠের জাগরণের গান মাতিয়ে দিল মানুষকে :
অগ্নিময়ী মায়ের ছেলে আগুন নিয়েই খেলবে তারা,
মরেনি বীর সেনাদল, আবার আগুন জ্বালবে তারা।
অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা তাদের, জ্বলবে নারে হোমানল,
তাদের ত্যাগ বৈরাগ্যের পূর্ণাহূতি বজ্রানলের কালানল।
নজর পড়ল ইংরেজ পুলিশের। দেশের মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে তাতাচ্ছে মুকুন্দদাস। সে তাহলে রাজদ্রোহী। ধরতে হবে তাকে। মুকুন্দ কিন্তু পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে লাগলেন। কোন জায়গায় যাত্রাপালের উপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে ক্ষিপ্রগতিতে তিনি চলে যান অন্য গ্রামে। লাল হয়ে ওঠে ফুলারের চোখ। দমননীতি আরও কঠোর হয়। গ্রেপ্তার করা হয় অশ্বিনীকুমারের মতো নেতাদের। মুকুন্দকে ধরার জাল পাতেন ফুলার।
খুলনার বাগেরহাট থেকে দল নিয়ে ফিরছিলেন মুকুন্দ। যাবেন সাহাবাজপুর। রাতের অন্ধকার নেমেছে তখন। ঘাপটি মেরে মেঘনার বুকে লুকিয়েছিল পুলিশের লঞ্চ। অতর্কিতে তারা ঘিরে ধরল মুকুন্দদের নৌকা। ১০৮ ধারায় গ্রেপ্তার করা হল মুকুন্দদাসকে। শাস্তি হল ৩০০টাকা জরিমানাসহ তিন বছরের কারাদণ্ড।
বন্দি হলেন বটে চারণকবি, কিন্তু তাঁর গান ঘুরতে লাগল মানুষের মুখে মুখে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে :
ফুলার, আর কি দেখাও ভয়?
দেহ তোমার অধীন বটে,
মন তো তোমার নয়।
হাত বাঁধিবে পা বাঁধিবে
ধরে না হয় জেলেই দিবে-
মন কি ফেরাতে পারবে,
সে তো পূর্ণ স্বাধীন রয়।
বন্দে মাতরম মন্ত্র কানে,
বর্ম এঁটে দেহে মনে,
রোধিতে কি পারবে রণে
তুমি কত শক্তিময়।
জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের বেহাল সংসারের হাল ধরেছিলেন মুকুন্দদাস। খুলেছিলেন মুদির দোকান। কিন্তু দেশপ্রেমের ব্রত ত্যাগ করেন নি। একের পর এক যাত্রাপালা রচনা করে যেতে লাগলেন…. ‘সমাজ’, ‘আদর্শ’, ‘পল্লীসেবা’, ‘কর্মক্ষেত্র’, ‘পথ’…। ভাগ্যবিধাতার কাছে মুকুন্দদাসের প্রার্থনা :
ভারতের ভগ্ন প্রাণগুলি লগ্ন করে দে মা,
মগ্ন হউক তব চিন্ময়ী ধ্যানে।
গণ্ডি ভেঙে ফেলে মুক্ত গগনতলে,
দাঁড়াক মিলনপ্রার্থী চূর্ণ করি অভিমানে।
দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য, তার জন্য জীবন উৎসর্গ করার আহ্বান জানালেন তিনি :
সাজ রে সন্তান হিন্দু মুসলমান,
থাকে থাকিবে প্রাণ না হয় যাইবে প্রাণ।
লইয়ে কৃপাণ হও আগুয়ান.
নিতে হয় মুকুন্দেরে নিও রে সঙ্গে।
অসাধারণ….
পড়লাম। বেশ সুন্দর। একটু আধটু জানা ছিল। অনেক নতুন কথা জানা হল। ভাল লেখা।