৩২. বেলানগরের বেলা মিত্র
হাওড়া বিভাগের হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের একটি রেল স্টেশনের নাম বেলানগর। হাওড়া থেকে তার দূরত্ব বারো কিলোমিটার। কিন্তু কর্ড লাইন দিয়ে যেতে গিয়ে আমরা বেলানগর নামকরণের রহস্য সম্বন্ধে কৌতূহল বোধ করি না। আমাদের মনে ঝলসে ওঠে না এক দেশপ্রেমিক বীরাঙ্গনার ছবি। আবার সে নারীর সঙ্গে রক্তের সম্বন্ধ আছে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের। রক্তের সম্বন্ধ আছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের। তিনি সুভাষচন্দ্রের ভাইঝি আর অমিত মিত্রের মা। তিনি বিপ্লবী হরিদাস মিত্রের স্ত্রী। তিনি বেলা বসু বা বেলা মিত্র (১৯২০-১৯৫২)।
সুভাষচন্দ্রের সেজদার নাম সুরেশচন্দ্র বসু। বেলা বসু তাঁর ছোট মেয়ে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানী এবং পশ্চিমবঙ্গের ডেপুটি স্পিকার হরিদাস মিত্রের সঙ্গে বিয়ের পর পরিবর্তন হয় তাঁর পদবীর। বেলা বসু হয়ে যান বেলা মিত্র। পারিবারিক সূত্রে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
রামগড়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশন পরিত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র ডাক দেন আপোষহীন সংগ্রামের। বেলা সেই ডাকে সাড়া দেন। নারী বাহিনী গঠনের কাজে লেগে যান তিনি। তারপর সুভাষচন্দ্র গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। বেলা বসু সেই ফৌজের সিক্রেট সার্ভিসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কলকাতা থেকে তিনি গোপনে রেডিয়ো ট্রান্সমিটার মারফৎ সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে পাঠাতেন খবরাখবর। এই সূত্রেই হরিদাস মিত্রের সঙ্গে তাঁর আলাপ। হরিদাস মিত্র আজাদ হিন্দ বাহিনীর সিক্রেট সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। আলাপ পরিণত হল প্রণয়ে। হরিদাস মিত্রের সঙ্গে বিয়ে হল বেলা বসুর।
ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে হরিদাস মিত্রকে। বেলা মিত্র হরিদাসের অভাব পূর্ণ করার কাজে এগিয়ে আসেন। আজাদ হিন্দের কর্মীদের নিরাপদে আনা ও থাকার জন্য নিজের অলংকার বিক্রি করে দেন তিনি। ওড়িশার উপকূলে লোক পাঠিয়ে কর্মীদের অবতরণের ব্যবস্থা করেন বেলা মিত্র।
১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। হরিদাস মিত্র-সহ আজাদ হিন্দের কয়েকজনের ফাঁসির হুকুম হল। স্বামী হরিদাস মিত্র ও অন্যান্যদের মৃত্যুদণ্ড রদের জন্য বেলা মিত্র ছুটে গেলেন পুনে। গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করার জন্য। ‘নেচার কিওর ক্লিনিক’ থেকে গান্ধিজি চিঠি লিখলেন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলকে :
‘আমি আসামির কাকা এবং আইনজীবী কার্ডেন নোয়াডের পেশ করা আবেদন খতিয়ে দেখেছি। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে এ ক্ষেত্রে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন মঞ্জুর করার যথেষ্ট কারণ আছে বলে আমি মনে করি। যদি এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তবে তা হবে বড় মাপের রাজনৈতিক ভুল।’
বেলা মিত্র প্রসঙ্গে গান্ধিজি লিখেছেন :
‘এই মামলার প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন হরিদাস মিত্রের স্ত্রী। শরৎচন্দ্র বসুর বাড়িতে যে সব প্রার্থনাসভায় আমার অতিথি হিসেবে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, সেখানে উনি অনেকবার সংগীত পরিবেশন করেছেন।’
গান্ধিজির আবেদনকে মান্যতা দিয়ে ব্রিটিশ সরকার হরিদাস মিত্র, ডা: পবিত্রমোহন রায়, সর্দার মহিন্দর সিং এবং অমৃক সিং গিলকে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি দেন, পরিবর্তে তাঁদের হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
১৯৪৭ সাল। ভারত স্বাধীন হল।
হরিদাস মিত্র কংগ্রেসের টিকিটে জিতে বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হলেন। আর বেলা মিত্র? না, তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন নি। আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘ঝাঁসীর রাণী বাহিনী’র কথা মনে রেখে তিনি গঠন করলেন ‘ঝাঁসীর রাণী সেবাদল’। এই সেবাদলের মূল কাজ ছিল পূর্ববঙ্গ থেকে আগত অগণিত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সাহায্য করা। বালি ও ডানকুনির মাঝে রাজচন্দ্রপুরের কাছে অভয়নগরে তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য তৈরি করেন শিবির। সেই শিবিরে তিনি নিজেও থাকতেন।
কঠিন পরিশ্রমে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। ১৯৫২ সালে মৃত্যু হয় তাঁর।
উদ্বাস্তু কলোনির নিকটবর্তী স্থানে বেলা মিত্রের নামে রেলস্টেশন স্থাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন সেখানকার রামকৃষ্ণ মঠের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী সম্বুদ্ধানন্দ মহারাজ। হরিদাস ও বেলা মিত্র ছিলেন সেই মহারাজের শিষ্য।
১৯৫৮ সালের ২৩ নভেম্বর বেলানগর রেল স্টেশনের উদ্বোধন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজের যোদ্ধা ও ভারতীয় রেল দপ্তরের উপমন্ত্রী শাহনওয়াজ খান।
সুন্দর। এসব কথা জানা ছিল না। জেনে ভাল লাগছে।
আপনার এই সিরিজের বিভিন্ন লেখা থেকে অনেক অজানা তথ্য জানা হচ্ছে।
সুন্দর প্রচেষ্টা।
আনেক না জানা কথা জানতে পারছি আপনার লেখায়। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।