পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ার ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ (১৯৪৭-২০১৮) ছিলেন বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষ। একবার তিনি মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে নিয়ে গেছেন পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে। মুখ্যমন্ত্রীর সামনেই আঁজলা ভরে জল তুলে নিয়ে তিনি মুখে দিতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন জ্যোতি বসু।
— করেন কি? করেন কি? এসব নোংরা জল…
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধ্রুবজ্যোতি বলেন, নোংরা ছিল, এখন আর নেই।
— তার মানে? অবাক জ্যোতি বসুর প্রশ্ন।
হাসেন ধ্রুবজ্যোতি, এখানে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে এক জীবকণা। তার নাম এলগি। বর্জ্য রাসায়নিককে গ্রাস করে নেয় এলগি। কেবল তরল বর্জ্য নিষ্কাশন ও তার শুদ্ধিকরণ নয়, শহর কলকাতার দূষিত বাতাস থেকে প্রায় ৬০% কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয় এই জলাভূমি। এই জলাভূমি কলকাতার কিডনি।
পূর্ব কলকাতার জলাভূমির ধর্মযোদ্ধা এই ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের জন্ম কলকাতায়। পড়াশোনা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনিই প্রথম পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শুরু করেন কর্মজীবন। তিনিই প্রথম পূর্ব কলকাতার জলাভূমি গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সামান্য উঁচু কলকাতা কেন ভারতের অন্যান্য শহরের মতো বর্ষায় জলমগ্ন হয় না, সে চিন্তা ধ্রুবজ্যোতিকে আচ্ছন্ন করেছিল। তার কারণ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ভাগীরথীর উৎস সন্ধানের মতো সে আবিষ্কার। খাল-নালা ধরে এগোতে এগোতে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন পূর্ব কলকাতার ১২,৫০০ হেক্টর বিস্তৃত জলাভূমিতে। বুঝেছিলেন এই জলাভূমির আশ্চর্য মাহাত্ম্য। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে এবং সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে জল আপনা আপনি পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। এখানে স্বয়ং প্রকৃতি যেন পরিত্রাতার ভূমিকায় বিরাজ করেন। অন্যান্য শহরের মতো কোটি কোটি টাকা খরচ করে জলকে পরিশুদ্ধ করতে হয় না। এই অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য এই জলাভূমি বিশ্বের ১৬৯ বিলিয়ন হেক্টর জুড়ে ১৮২৮টি জলাভূমির (বা, রামসার সাইট ) মধ্যে একমেবাদ্বিতীয়ম।
ধ্রুবজ্যোতি এবার জলাভূমিটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। এতে আছে — ক] ৫৮৫২ হেক্টর জলাজমি ও ভেড়ি, খ] ৬০২ হেক্টর সবজি ও চাষের জমি, ১৩২৬ হেক্টর বসত জমি। এখানকার ভেড়ি থেকে ১১,০০০ টনেরও বেশি মিষ্টি জলের মাছ (যেমন, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, মৃগেল, চারাপোনা) উৎপন্ন হয়। তাই তো কলকাতায় এখনও এত সস্তায় ‘মাছভাত’ পাওয়া যায়। মাছের সঙ্গে পাওয়া যায় টাটকা সবজি। হিসেব বলে এই জলাভূমি ১৩০০ কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি করে। রাজবংশি, বাগদি, নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ এই জলাভূমি থেকেই নির্বাহ করে তাদের জীবিকা।
কিন্তু রাজনীতির প্রভুদের কাছে তথাকথিত ‘উন্নয়নে’র মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হাতে আসছে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভলাপমেন্ট ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকা। সেই টাকায় এইরকম ফাঁকা জায়গায় হতে পারে নিত্য-নতুন প্রকল্প। ১৯৯২ সাল। সরকার সিদ্ধান্ত করলেন এখানে গড়ে তুলবেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। ভাগ্যিস ছিলেন বনানী কক্কর। তাঁর পি আই এলের ফলে হাইকোর্ট রায় দিলেন : ভরাট করা চলবে না জলাভূমি। ধর্মযোদ্ধার চেষ্টায় পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ২০০২ সালে ‘রামসার’ স্বীকৃতি লাভ করল। রাজনীতির প্রভুরা থমকে গেলেন। বিচারপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক রায়ে (‘দ্য ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যাণ্ড — কনজারভেশন অ্যাণ্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬) এই জলাভূমিতে জমি কেনা ও বেচা নিষিদ্ধ হল, এর বাস্তুতন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেওয়া হল সরকারকে।
২০১১ সালে সরকারের রঙ বদল হল, কিন্তু জলাভূমিকে দরদ দিয়ে রক্ষার চেষ্টা দেখা গেল না। এরই মধ্যে, ২০০৬-২০১৬ পর্যন্ত এই জলাভূমির ক্ষতি হয়ে গেছে ৭০%। একধাপ এগিয়ে গেলেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি তো ধাপার কাছে সোলার প্রজেক্ট, ৬.৫ কিমি ফ্লাই ওভার, ইকো পার্ক, এসব স্বপ্নে বিভোর। রামসার কনভেনশনে পূর্ব কলকাতার জলাভূমির অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেন তিনি।
২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল আদেশ দিলেন একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করার। এই টাস্ক ফোর্স খতিয়ে দেখবে বেআইনি প্লাস্টিক প্রসেসিং ও রিসাইকেলিং ইউনিটগুলির আগ্রাসনের অভিযোগ; বিধাননগরের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন যাতে আবর্জনা জমা না করতে পারে তার জন্য মোল্লার ভেড়ির চারধারে কাঁটা তারের বেড়া তৈরির নির্দেশ দেন ট্রাইবুনাল। পরিবেশবিদরা বলেছেন আইনকে তো্য়াক্কা না করে এখানে বেআইনি নির্মাণ চলছে, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, শ্রী শ্রী রবিশংকরের বৈদিক ধর্মসংস্থানের সৌধ তৈরি হচ্ছে, মুনশির ভেড়ির চারধারে নবদিগন্ত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অথরিটি রাস্তা তৈরি করছে।
কিন্তু এই সমস্ত আইন-কানুন ছিন্নমস্তা রাজনৈতিক মাতব্বরদের দমাতে পারবে না। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে তাঁরা নির্বিচারে পাহাড় কেটে, খাল-বিল বুজিয়ে, মাটি ও নদীকে বিষিয়ে বনকে উজাড় করে দিতে থাকবেন। জলাভূমির ধর্মযোদ্ধা ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ উপলব্ধি করেছিলেন সেই সত্য। হতাশ ও বিষণ্ণ হয়েছিলেন। নিজেকে ‘ব্যর্থ প্রকৃতিবিদ’ বলেছিলেন।