৩৪. ঘুড়ির সঙ্গে ক্রিকেটকে মেলালেন কার্তিক বোস
কলকাতার ১০০ নম্বর, গড়পারের রায় পরিবারের সঙ্গে ৫২, আমর্হাস্ট স্ট্রিটের বোস পরিবারের যোগাযোগ ছিল। সম্পর্কও একটা ছিল। গড়পারের রায় পরিবার বিখ্যাত ছিল শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য। আর আমর্হাস্ট স্ট্রিটের বোস পরিবারে ছিল ঘুড়ি আর ক্রিকেট খেলা।
রায় পরিবারের কীর্তিমান ছেলে সত্যজিৎ দক্ষ ছিলেন চিত্রকলা, সংগীত আর চলচ্চিত্র নির্মাণে। ‘পথের পাঁচালী’ করে তাঁর নাম-যশ হয়েছে। মুনশি প্রেমচাঁদের গল্প অবলম্বনে তিনি একটা চলচ্চিত্র করতে চান। ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’। সেখানে ঘুড়ি ওড়ানোর একটা দৃশ্য আছে। তার জন্যই সত্যজিৎ এসেছেন কার্তিক বোসের (১৯০৬-১৯৮৪) কাছে। ঘুড়ি সম্পর্কে জানার জন্য।
ঘুড়ির কথা উঠলে কার্তিকের উৎসাহের অন্ত্য থাকে না। গড় গড় করে তিনি বলে যান, বাঙালিকে ঘুড়ি চিনিয়েছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। লখনউ-এর রাজত্ব খুইয়ে বাংলায় চলে এলেন নবাব। কলকাতার মেটিয়াবুরুজে তৈরি করলেন এক টুকরো লখনউ। কলকাতার আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর চল হয়েছিল সেই নবাবের হাত ধরে। সে সময় কানকাওয়া, চংগ, তুলকল, গুডডি ঘুড়ির চল ছিল। নবাব আলিকে দেখে কলকাতার বাবুরা ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করেন। মুরগির লড়াই-এর মতো ঘুড়ির লড়াইও শুরু হয়ে যায়। ঘুড়ির নানা নামকরণও করেন তাঁরা। যেমন : পেটকাটি, চাঁদিয়াল, শতরঞ্জি, মুখপোড়া, লাটুয়াল, ময়ূরপঙ্খী, বামুনটেক্কা, চৌরঙ্গী, জিবিয়াল, চাপরাজ, কানকাটা …
বোসবাড়ির ছেলেরা — কার্তিক, গণেশ, বাপিও পড়েছিলেন ঘুড়ির প্রেম। সেই প্রেমের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল ক্রিকেট প্রেম। শুধু বিশ্বকর্মা পুজো নয়, বোসবাড়িতে সারা বছর চলত ঘুড়ির উৎসব। তিনকড়ি আর সোহন সিংরা বানাতেন ঘুড়ি। ঘুড়ির দোকান ছিল তাঁদের। নাম : বোস কাইট হাউস।
ঘুড়ির মতো কার্তিক ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট প্রেমী। কার্তিকের জন্মের আগে থেকেই এদেশে চালু হয়েছে ক্রিকেট খেলা। বাংলায় ক্রিকেটের জনক হলেন সারদারঞ্জন রায়। তিনি ১৮৭০ সালে ঢাকা কলেজ ক্রিকেট ক্লাব ও ১৮৮৪ সালে কলকাতায় টাউন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রিকেট খেলার নিয়মকানুন নিয়ে তিনি বই লিখেছিলেন বাংলায়, ক্রিকেটের সরঞ্জামের দোকানও খুলেছিলেন।
কার্তিক, গণেশ ও বাপি স্পোর্টিং ইউনিয়নের হয়ে ক্রিকেট খেলতেন। তিনজনেই বাংলা দলে জায়গা পেয়েছিলেন। কার্তিকের প্রিয় ক্রিকেটার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান। তাঁকেই কার্তিক অনুকরণ করতেন। ব্র্যাডম্যানের মতো তিনি কাট, হুক ও পুল শটে পারদর্শী ছিলেন। তাই তাঁকে ভারতের ব্র্যাডম্যান বলা হত। ১৯৩০ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তিনি বাংলার হয়ে ৪৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন, ১৬৫৯ রান করেছিলেন।
তবে খেলোয়াড় হিসেবে কার্তিকের যত নাম, তার চেয়ে বেশি নাম প্রশিক্ষক হিসেবে। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে তিনি নেট, ব্যাট, গ্লাভস, প্যাড কিনে ছোটদের প্রশিক্ষণ দিতেন। স্পোর্টিং ইউনিয়ন, অ্যালবার্ট, মোহনবাগান, টাউন ক্লাব-সহ বিভিন্ন ক্লাবে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সম্বরণ ব্যানার্জী, দলজিৎ সিং, উদয়ভানু ব্যানার্জী, শ্যামসুন্দর মিত্র, নিমাই ঘোষ, মন্টু ব্যানার্জি, কল্যাণ মিত্র, কল্যাণ বিশ্বাস, স্বপন সেন প্রভৃতি ক্রিকেটারকে তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর কাছে অনুশীলন করেছেন পলি উমরিগড়, দীপক সোধন, বিজয় মঞ্জরেকর, সেলিম দুরানিরাও। বিজয় মার্চেন্ট কার্তিক বোসকে ক্রিকেট ক্লাব অব ইণ্ডিয়ার কোচ ও সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত করেন।
বনেদি জমিদার বংশের সন্তান ছিলেন। ক্রিকেটের জন্য অকাতরে ব্যয় করেছেন অর্থ। তখন বসন্তের কোকিলরা ঘিরে থাকত তাঁকে। অর্থ যখন নিঃশেষিত হল, তখন তিনি নিঃসঙ্গ হলেন। না, কেউ ছিল না তাঁর পাশে। তখন যে বর্ষা। বসন্তের কোকিল থাকবে কেন? বিয়ে থা করেন নি। স্ত্রী ও সন্তানের সান্নিধ্য পেলেন না।
যে ৫২, আমর্হাস্ট স্ট্রিট গমগম করত এক সময়ে, যাকে বলা হত বাংলার ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র, সেখানে গড়ে উঠল গাড়ির গ্যারাজ। হারিয়ে গেলেন কার্তিক বোস। তাঁর একটা মূর্তিও স্থাপিত হল না।
পুরোনো ইতিহাস কে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত করার জন্য লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ।