৩৫. মিলিটারি ট্রাক পিষে দিল জ্যোতির্ময়ীকে
১৯৪৫ সালের ২১ নভেম্বর।
আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিদের মুক্তির দাবিতে ছাত্রদের শোভাযাত্রা। সে শোভাযাত্রার আয়োজক বঙ্গীয় ছাত্র ফেডারেশন ও বঙ্গীয় ছাত্র কংগ্রেস। যাবার সময় হয়েছে বুঝেও শেষ আঘাত করতে ছাড়ল না ইংরেজ শাসক। তাদের পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ল ছাত্রদের শোভাযাত্রার উপর।
সেই গুলিতে নিহত হলেন এক ছাত্র। নাম তাঁর রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আহত হলেন অনেক। তবু ভয় পান নি ছাত্ররা। আহতদের চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি করছেন। আর এক ছাত্রী বসে আছেন রামেশ্বরের মৃতদেহ আগলে। শূন্য দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন। মনে মনে ভাবছিলেন, আজ বাদে কাল বিদেশি শাসকরা চলে যাবে। কিন্তু রামেশ্বর জানতে পারবে না যে তার দেশ স্বাধীন হয়েছে।
সারা রাত সেই ছাত্রী রামেশ্বরের মৃতদেহ আগলে বসে ছিলেন নিথর হয়ে।
পরের দিন রামেশ্বরের মৃতদেহ নিয়ে শোভাযাত্রা বেরোল। শববাহী গাড়িতে রামেশ্বরের মৃতদেহ। তার সামনে বসে সেই ছাত্রী। তেমনি ভাবলেশহীন মুখ।
হঠাৎ — হঠাৎ একটা মিলিটারি ট্রাক পেছন থেকে এসে ধাক্কা দিল শববাহী গাড়িতে। ছিটকে পড়ল রামেশ্বরের মৃতদেহ। ছিটকে পড়লেন সেই ছাত্রী। গুরুতর চোট লাগল মাথায়। শুরু হল রক্তক্ষরণ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু তিনি বাঁচলেন না।
কে এই ছাত্রী? নাম তাঁর জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী (১৮৮৯-১৯৪৫)। তাঁর নামটা একালের মানুষদের খুব চেনা না হলেও তাঁর মা-বাবার নামটা সকলের চেনা। হ্যাঁ, জ্যোতির্ময়ী দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনীর সন্তান।
ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী (১৮৪৪-১৮৯৮) যোগ দিয়েছিলেন সমাজসংস্কারমূলক আন্দোলনে। নারী স্বাধীনতার প্রবক্তা ছিলেন তিনি। মেডিক্যাল কলেজে নারীর প্রবেশাধিকার এবং কংগ্রেসে নারীদের প্রতিনিধিত্বের দাবি করেন তিনি। শ্রমিক আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের দুরবস্থা। তাঁর স্ত্রী কাদম্বিনী দেশের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ছাত্রী। একজন নারী চিকিৎসকের প্রতি রক্ষণশীল সমাজের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বর্ষিত হতে লাগল। গ্রাহ্য করেন নি কাদম্বিনী। এই দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনীর সন্তান হলেন সাংবাদিক প্রভাতচন্দ্র এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী জ্যোতির্ময়ী।
কলকাতার ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে জ্যোতির্ময়ীর জন্ম। ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। ১৯০৫ সালে পাশ করলেন এন্ট্রান্স। তারপরে এলেন বেথুন কলেজে। এই বেথুন কলেজকে নারী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র করে তুলেছিলেন মা কাদম্বিনী। পড়াশুনো করছেন কিন্ত তার সঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের ঢেউ দোলা দিচ্ছে তাঁর হৃদয়কে। ১৯০৬ সাল। বেথুন কলেজে নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন। সভাপতি দাদাভাই নওরোজি। সে সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবক জ্যোতির্ময়ী। ১৯০৬ সালে পাশ করলেন এফ এ। পেলেন স্কলারশিপ। ১৯০৯ সালে এই বেথুন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করলেন বি এ। কৃতিত্ব তো বটেই। কারণ সেবার বেথুন থেকে তিনিই একমাত্র মহিলা যিনি বি এ পাশ করেন।
শুরু করলেন শিক্ষকতা। বেথুন স্কুল, কটকের রাভেনশ কলেজ, সিলোন ওম্যানস কলেজ, জলন্ধরের আর্যকন্যা মহাবিদ্যালয়, বেথুন কলেজ, দমদম কুমার আশুতোষ কলেজ — নানা জায়গায় তিনি শিক্ষকতা করেছেন।
সেই সঙ্গে ছিল লোকসেবা আর স্বদেশি আন্দোলন। ১৯১৭ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি অ্যানি বেসান্তের সভাপতিত্বে যে সম্মেলন হয়, সেখানে তিনি স্বেচ্ছাসেবিকা। নারী স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে মিছিলে হাঁটছেন তিনি। মেয়েদের নির্বাচনী অধিকারের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন। এই উদ্দেশ্যে ১৯২১ সালে কামিনী রায়ের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বঙ্গীয় নারী সমাজ’। জ্যোতির্ময়ী সেই সংগঠনেরও সক্রিয় কর্মী। তারপরে যোগ দিলেন ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’তে। কলকাতার বড়বাজারে বিদেশি কাপড়ের দোকানের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন। তমলুকের নরঘাটে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। কৃষকদের সমাবেশে বক্তৃতা করছেন জ্যোতির্ময়ী। ১৪৪ ধারা অমান্য করে মানুষ এসেছেন তাঁর কথা শুনতে। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করল। তিনি বক্তৃতা থামালেন না। আর মার খেতে্ খেতে কৃষক নারীরা ঘিরে থাকল তাঁকে। যাতে তিনি বক্তৃতা না থামান, যাতে তাঁর মাথায় না পড়ে পুলিশের লাঠির ঘা।
আর এক দৃশ্য দেখা গেল কলকাতার গড়ের মাঠে। ১৯৩১ সালের ২৬ জানুয়ারি। সুভাষচন্দ্র বসু এসেছেন স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য। সুভাষকে বাধা দিতে হবে। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট লেলিয়ে দিলেন অশ্বারোহী সার্জেন্টদের। ব্যাটন নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে সুভাষের দিকে। আর সুভাষকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছেন জ্যোতির্ময়ী।
শেষ দিকে কংগ্রেস সম্বন্ধে হয়তো তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল কংগ্রেস বোধহয় উচ্চবর্গের মানুষদের কথাই বেশি ভাবে। তাহলে নিম্নবর্গের মানুষদের কথা ভাববে কে? জ্যোতির্ময়ী তাই কমিউনিস্ট দলের আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হলেন। যোগ দিলেন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’তে।
কেমন যেনো আরো কিছু জানার ইচ্ছা রয়ে গেলো।
পরাধীন দেশে দেশের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে নিবেদিতপ্রাণ অনেক বহু আত্মত্যাগী আর্দশবাদী যুবক-যুবতী নারী পুরুষের আত্মোসর্গের ঘটনা সাধারণ মানুষের অজানা।
এমন সব ঘটনার কাহিনী ইতস্তত এখান ওখানে ছড়িয়ে আছে, কে রাখে খবর তার! তাই আপনার উদ্যোগ যথেষ্ট প্রশংসার।
আপনার এই “বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনী” সিরিজে যে বিভিন্ন শ্রদ্ধেয় মানুষজনের কথা উল্লেখ করছেন তাঁদের ক্ষেত্র বিভিন্ন জনের বিভিন্ন, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার, কেউ স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত, কেউ সাহিত্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত। এগুলি সম্পাদনা করে বিশেষ ভাবে তালিকাভুক্ত করে ভবিষ্যতে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলে এক গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক হবে বলে মনে হয়।
এই উদ্যোগ সার্থক করতে আপনাকে ভাল থাকতেই হবে।
– প্রবীর সামন্ত।
অসাধারণ সেতুবন্ধন। রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা সবাই জানেন, জানেন দ্বারকানাথ কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর কথা কিন্তু জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলীর কীভাবে জড়িয়ে আছে এঁদের নাম জানতাম না। অনেকেই জানেন না। তাই বলছিলাম আপনার লেখাটি সেতুবন্ধনের কাজ করল।
ধন্যবাদ। এরকম লেখা আরো পড়তে চাই।