৩৬. যদুনাথের সিংহ-বিক্রম
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘মডার্ন রিভিউ’তে একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। ১৯২৮ সালের নভেম্বর মাসে। লেখা চুরির অভিযোগ সম্পর্কে চিঠি। ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল সংখ্যায় সেই পত্রিকায় একই লেখকের আরও তিনটি চিঠি প্রকাশিত হল। লেখা চুরির বিষয়ে আরও তথ্য প্রমাণ দিয়ে লেখা হয়েছে তিনটি চিঠি। সে চিঠি নিয়ে হই হই পড়ে গেছে।
চিঠি যিনি লিখছেন তিনি এক অধ্যাপক। দর্শনের অধ্যাপক। নামডাক তাঁর নেই। অখ্যাতনামাও বলা যায়। যাঁর সম্পর্কে চুরির অভিযোগ এনেছেন, তিনি কিন্তু নামজাদা মানুষ। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান। পরে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তখনকার স্বদেশি নেতাদের সঙ্গেও তাঁর আলাপ-পরিচয় ছিল।
এই রকম একজন নামজাদা মানুষের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ? অভিযোগ করেছেন আবার এক অখ্যাত বাঙালি অধ্যাপক? কে তিনি?
তিনি হলেন অধ্যাপক যদুনাথ সিংহ (১৮৯২-১৯৭৮)। লেখা চুরি নিয়ে পত্রিকায় চিঠি, আদালতে মামলা — এসব বিষয় পরে বলা যাবে। তার আগে যদুনাথের কথা একটু বলে নেওয়া যাক।
১৮৭৮ সালের ১০ আগস্ট বীরভূম জেলার কুরুমগ্রামে এক শাক্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যদুনাথ সিংহ। তাঁর প্রপিতামহ কাশীনাথ সংসার ত্যাগ করে শাক্তপীঠ তারাপীঠে বাস করতেন। যখন যদুনাথের বয়েস মাত্র পাঁচ, তখন তাঁর বাবা মারা গেলেন। এক যৌথ পরিবারে মানুষ হন তিনি। সে পরিবারে ছিলেন তাঁর মা, পিতামহ, বড়দার স্ত্রী, দুই কাকা ও দুই কাকিমা। ছোটকাকার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল যদুনাথের। পরিবারের সকলে দীক্ষা গ্রহণ করেন শিবমন্ত্রে। খুব সকালে উঠতেন তাঁরা, পিতামহের শিবপূজার জন্য ফুল সংগ্র্হ করতেন তাঁরা। ছোটবেলায় রুগ্ন ছিলেন যদুনাথ। টাইফয়েড, আমাশয়ে ভুগতেন।
রুগ্ন হলেও ছাত্র হিসেবে উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। স্বদেশি আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তাঁর মধ্যে ধর্মীয় চেতনার উন্মেষ হয়। সাধক বামাক্ষেপার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়েছিল। যদুনাথ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন :
‘আমরা সকাল দশটায় তারাপীঠে পৌঁছালাম। দ্বারকা নদীতে স্নান করে, তারামার পূজা করে প্রসাদ গ্রহণ করলাম। বামাক্ষেপার দুই মূর্তি দেখলাম। তাঁর জীবিত থাকাকালীন আমি তিনবার তাঁর দর্শন লাভ করেছি। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যা কিছু ভালো কাজ আমি করেছি, তা তাঁরই প্রভাবে। তাঁরই কৃপায় আমি বিশ্বমাতাকে নিজের ভেতরে ও বাইরে দেখতে পেয়েছি। ভণ্ড সাধুদের হাত থেকে তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে আমি স্পষ্টভাবে মা তারার বাণী শুনেছি। এক অপূর্ব স্বর্গীয় চেতনায় আমার মন ভরে গেছে।’
বামাক্ষেপার আর একটি অলৌকিক কাহিনি তাঁর ডায়েরিতে লেখা আছে।
তখন মীরাটে থাকতেন যদুনাথ। ১৯৩৩ সাল। তাঁর স্ত্রী সুনীতিমঞ্জরিদেবীকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। ডেথ সার্টিফিকেটও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শবদাহের আয়োজন শুরু হচ্ছে। শবদেহের কাছে বসে আছেন তাঁদের ছেলে অমিয়কুমার আর এক বন্ধু জ্যোতির্ময় ব্যানার্জী। হঠাৎ তাঁরা দেখলেন সুনীতিমঞ্জরিদেবীর দেহের উপর দাঁড়িয়ে আছেন বামাক্ষেপা, তাঁর ডানহাতটি বরাভয় দিচ্ছে। একটু পরে সুনীতিদেবীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। এই ঘটনার পরে সুনীতিদেবী আরও ২৩ বৎসর বেঁচেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
যদুনাথ ১৯১৫ সালে দর্শনশাস্ত্রে অনার্সসহ বি এ পাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি ফিলিপ স্যামুয়েল স্মিথ ও ক্লিন্ট মেমোরিয়েল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এম এ পাশ করেন। তারপরে তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। এই বৃত্তির গবেষণার কাজ শেষ হয় ১৯২৫ সালে। এই সালেই তিনি পান গ্রিফিত পুরস্কার। ১৯৩৪ সালে তিনি লাভ করেন ডক্টর ডিগ্রি। রিপন কলেজ, ঢাকার জগন্নাথ কলেজ এবং শেষকালে মীরাট কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।
যদুনাথ প্রায় ৪০টি গ্রন্থের লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে : ইণ্ডিয়ান সাইকোলজি পারসেপসন (১৯৩৪), আ ম্যানুয়েল অব এথিক্স (১৯৬২), ইণ্ডিয়ান সাইকোলজি (১৯৩৪), আ হিস্ট্রি অব ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি (১ম খণ্ড ১৯৫৬ ; ২য় খণ্ড), আউটলাইন অব ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি (১৯৯৮)।
আবার ফিরে আসি চুরির প্রসঙ্গে।
১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় ড. রাধাকৃষ্ণানের ‘ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি’র ২য় খণ্ড। সম্ভবত এই বই দৃষ্টিগোচর হয় নি যদুনাথের। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় ড. রাধাকৃষ্ণানের ‘দ্য বেদান্ত অ্যাকর্ডিং টু শঙ্কর অ্যাণ্ড রামানুজ’। এই বই আসলে ছিল তাঁর ‘ইণ্ডিয়ান ফিলোজফি’র ২য় খণ্ডের ৮ম ও ৯ম অধ্যায়ের সংকলন। বইটি যদুনাথের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি দেখলেন এতে তাঁর গবেষণাপত্রের প্রথম দুটি অধ্যায় থেকে অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ অবিকল ব্যবহার করেছেন তাঁর গবেষণাপত্রের পরীক্ষক ড. রাধাকৃষ্ণান। যদুনাথের গবেষণাপত্রের ১ম ও ২য় খণ্ডের পরীক্ষক ছিলেন তিনি। যদুনাথ এই চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে শুধু ‘মডার্ন রিভিউ’তে চিঠি লেখেন নি, তিনি ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসে কলকাতা হাইকোর্টে ক্ষতিপুরণের (২০ হাজার টাকা) মামলা করলেন। বিপরীত দিকে ড. রাধাকৃষ্ণান ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যদুনাথের নামে ১ লক্ষ টাকার মানহানির মামলা করে বসেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় যদুনাথের চিঠি পড়ে ১৯২৯ সালের ৪ এপ্রিল যদুনাথকে লিখলেন :
‘ওহে বাপু! করিয়াছ কি? একেবারে বিষ্টার হাঁড়ি হাটের মাঝে ভাঙ্গিয়া দিলে? তবে তোমারই বা অপরাধ কি? যাহা করিয়াছ আত্মরক্ষার্থে। তুমি এপ্রিল মাসে M.R তে যে (Modern Review) জবাব দিয়াছ তাহার উপরে আর কাহারও কলম চালাইবার সাধ্য নাই। এই প্রকার plagiarism বড়ই আক্ষেপের ও ক্ষোভের বিষয়।’
ভারতের নামি-দামি নেতার সঙ্গে যে রাধাকৃষ্ণানের সখ্যতা আছে, যে রাধাকৃষ্ণানকে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনেছিলেন, যে রাধাকৃষ্ণানের সঙ্গে আশুতোষপুত্র এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের গভীর বন্ধুত্ব — তাঁর সঙ্গে পারবেন কেন নামগোত্রহীন যদুনাথ সিংহ? তাই তাঁর সিংহবিক্রম বিফলে গেল। মামলা লড়ার আর্থিক সঙ্গতি তাঁর ছিল না। তাই নতি স্বীকার করতে হল চাপের কাছে। দুর্জনরা বলে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজের প্রভাব খাটিয়ে মামলাটি চেপে দেবার চেষ্টা করেন। ১৯৩৩ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সামনে দুটি মামলার ডিক্রি জারি করে নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু কোন কোন শর্তে মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল, তা কেউ জানেন না।