৩৮. অভিমন্যু ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়
১৯৮১ সালের ১৯ জুন।
শিক্ষিকা নমিতা মুখোপাধ্যায় স্কুল থেকে বাসায় ফিরলেন। তাঁর বাসা কলকাতার দক্ষিণ অ্যাভিনিউএর এক বহুতলে। ছয়তলার একটি ফ্ল্যাটে। স্বামীকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন নমিতা। তাঁর স্বামী ডাক্তার। তাঁর একটি আবিষ্কার নিয়ে গোলমাল হচ্ছে। স্বীকৃতি না দিয়ে প্রশাসন এবং ঈর্ষানলে দগ্ধ কিছু সহকর্মী তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করে চলেছে। ফলে নমিতার স্বামী মানসিক সমস্যায় জর্জরিত। তাঁর হৃদরোগের সমস্যা দেখা দিয়েছে। সারাক্ষণ কেমন মনমরা হয়ে থাকেন। বড় ভয়ে থাকেন নমিতা।
সেই ভয়টাই সত্য হয়ে দেখা দিল ১৯ জুন।
দরজা খুলে নমিতা দেখলেন গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তাঁর স্বামী। সুইসাইডনোটে লিখে গেছেন, ‘হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলাম না।’
এই ডাক্তারকে নিয়ে ১৯৮২ সালে রমাপদ চৌধুরী লিখলেন একটি উপন্যাস। নাম তার ‘অভিমন্যু’। মহাভারতের অভিমন্যু। সে ছিল কিশোর। সাতজন মহাযোদ্ধা যুদ্ধের বিধি ও নিয়ম উপেক্ষা করে অনৈতিকভাবে অভিমন্যুকে হত্যা করেছিল। রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসের নায়ক ডাঃ দীপঙ্কর রায়ও ক্ষমতাশালী একাধিক ডাক্তার ও আমলার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া আইনের চোখে অপরাধ হলেও সেই ডাক্তার ও আমলাদের কোন শাস্তি হয় নি।
চলচ্চিত্র পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯১ সালে ‘অভিমন্যু’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করেন যে ছায়াছবি, তার নাম ‘এক ডক্টর কি মৌত’। ২০১৯ সালে রাজীব সরকার সেই ডাক্তারকে নিয়ে তৈরি করেন তথ্যচিত্র ‘ব্লাড স্টেইনস নেভার ফেড’।
নমিতা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী সেই ডাক্তারের নাম সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯৩১-১৯৮১)।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগে। সত্যেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর বাবা, জ্যোৎস্না মুখোপাধ্যায় তাঁর মা। বাবা সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন রেডিওলজিস্ট। কলকাতার বউবাজার হাই স্কুলে কৃতিত্বের সঙ্গে সুভাষ স্কুলশিক্ষা শেষ করেন। তারপর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ। ফিজিওলজিতে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন কারার পর তিনি ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন। প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে রিপ্রোডাকটিভ ফিজিওলজিতে পি.এইচ.ডি এবং যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিপ্রোডাকটিভ ফিজিওলজিতে ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে।
বন্ধ্যা নারীদের মর্মবেদনা তাঁকে পীড়িত করত। তাই তিনি প্রজনন চিকিৎসাবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী প্যাট্রিক স্টেপটো ও রবার্ট এডওয়ার্ডেসের আইভিএফ গবেষণা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। হরমোন থেরাপি, ডিম্বস্ফোটন প্ররোচনা, ভ্রূণ হিমায়িতকরণ ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। সহযোগী ছিলেন সুমিত মুখোপাধ্যায় এবং ডাঃ সরোজকান্তি ভট্টাচার্য। গবেষণার পরিকাঠামো? মনে পড়ে যায় প্রায় একশো বছর আগে জগদীশচন্দ্র বসু গবেষণার ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত যে অসুবিধে ভোগ করেছিলেন, সুভাষকেও সেরকম অসুবিধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু অদম্য ছিল তাঁর মনোবল। এই গবেষণার জন্য তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিশ করেন নি; এই গবেষণার জন্য তিনি নিজের সন্তানসুখের কথাও ভাবেন নি। তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর আত্মত্যাগ তুলনাহীন।
১৯৭৮ সালের ৩ অক্টোবর। শারদীয়া উৎসবের সময়।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাফল্য লাভ করলেন গবেষণায়। ভারতে জন্মগ্রহণ করল প্রথম টেস্ট টিউব বেবি। দুর্গা নামে যে কন্যা সন্তান পরিচিত (পরে তাঁর নাম রাখা হয় কানুপ্রিয়া অগ্রবাল)। দুর্গার জন্মের ঠিক ৬৭ দিন আগে ইংল্যাণ্ডে জন্ম নিয়েছিল প্রথম টেস্ট টিউব বেবি, মেরি লুইস ব্রাউন।
কলকাতার বড়বাজারের ব্যবসায়ী প্রভাত অগ্রবালের কোন সন্তান হয় নি। এই ব্যাপারে তিনি এন আর এস হাসপাতালে ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন। ডাক্তার তাঁকে আই ভি এফের কথা বলেন। ডাক্তারের সততা প্রভাতবাবুকে মুগ্ধ করে। ডাক্তার বলেছিলেন, ‘পশুর উপর পরীক্ষামূলকভাবে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের গবেষণা করছি। আপনারা যদি রাজি থাকেন, মানুষের উপর প্রয়োগে আপনারাই হবেন প্রথম। তবে সন্তান সুস্থ না-ও হতে পারে। এসব জেনেও যদি আসতে চান, আসবেন।’
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য সুভাষ মুখোপাধ্যায় হয়তো পেতে পারতেন বিশ্বের সর্বোচ্চ পুরস্কার। হায়, পুরস্কার! পরিবর্তে তিরস্কারে জর্জরিত হতে লাগলেন আবিষ্কারক। কিছু সহকর্মী, কিছু প্রশাসনিক কর্তা সন্দেহ করতে শুরু করলেন। বসে গেল তদন্ত কমিটি। কি রায় দিল তারা? বলল, — ‘Evreything that Dr, Mukherjee claims is bogus’ .
শুধু তাই নয়। এবার ডাঃ মুখার্জীকে অবিরাম পেশাগত ও ব্যক্তিগত প্রতিকূলতার মুখোমুখী হতে হল। আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর গবেষণার ফল প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হল। এখান থেকে ওখানে ক্রমাগত বদলি করা হল তাঁকে। কলকাতা থেকে বাঁকুড়া। হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন তিনি। তবুও রেহাই নেই। তাঁকে ফিরিয়ে আনা হল আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে। কয়েক মাস পরে আবার বদলি। কলকাতার রিজিওন্যাল ইন্সটিটিউট অব অপথ্যালমোলজিতে। এখানে গবেষণার সুযোগ নেই। হৃদরোগের রোগীকে রোজ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হত চারতলায়।
না, এখানেও শেষ নয়।
জাপানের কিয়োটোতে এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে নিজের গবেষণা উপস্থাপন করার আমন্ত্রণ এল। কিন্তু সরকারি অনুমতি পেলেন না তিনি। তাঁর পাশপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল।
আর সহ্য করতে পারলেন না সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আত্মহত্যা করলেন। লিখে গেলেন :
‘হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। ’
দেখে যেতে পারলেন না যে তাঁর দুর্গা তাঁকে ভোলেনি। দেখে যেতে পারলেন না যে ১৯৮৬ সালে আর এক টেস্ট টিউব বেবির জন্মদাতা বিজ্ঞানী টি সি আনন্দকুমার মুক্তকণ্ঠে তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দেখে যেতে পারলেন না যে ২০০২ সালে ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ তাঁর গবেষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আরও কিছু বলার আছে, ডাক্তার অম্বরিশ মূখার্জী তখন অন্যতম রাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাস্থ্য দপ্তর, তিনি যার পর নাই অপমান করে ডাঃ মূখার্জী কে বলেন আপনি কি খাটের নিচে যারণ বিযারণ করেন?
প্রসঙ্গত অম্বরিশ ছিলেন এলএমএফ অর্থাৎ licentiate in medical faculty অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার নন।
এইস্পর্ধা কেবল মুরখারাই দেখাতে পারে।
“Fools dare where angels dare to tread”.
হয়তো কম জানি বা কম বুঝি, তারই মধ্যে যেটুকু বুঝি- মানুষের অন্তর্নিহিত ষড়রিপুর প্রভাব বড় ভয়াবহ, ভয়ানক, ভয়ংকর। মাৎসর্য এক রিপু, এর প্রভাবে ভারতবর্ষতো বটেই তাছাড়া সমগ্র বিশ্বে সভ্যতার অগ্রগতিতে যে কত কত ক্ষতি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এরই কারণে আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কত কত প্রতিভা, কত কত নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার উদ্ভাভকদের সৃষ্টি, নতুন কর্মকান্ডকে ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষমতার উচ্চাসনে থাকা সেই ‘তাঁদের’ দ্বারা।
সেই তেমনই এক গভীর চক্রান্তের শিকার ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই চক্রান্তের ফলে আত্মহননে বাধ্য হয়েছেন ডাক্তার মুখার্জী, ক্ষতি হয়েছে সমাজের, দেশের, সমগ্র মানব সমাজের।
বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে।
এইসব কথা এখন আর আলোচনায় আসে না, হয়তো বিস্মৃতির খাতায় স্থান পেয়েছে।
আপনার এই সিরিজের বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে এমনই সব পুরানো বিস্মৃত মানুষজনের নানান কর্মকান্ডের কথা উল্লেখ করছেন, যা আগামীর মানুষজনের নিশ্চয়ই কাজে আসবে।
এই ধরনের কাজের জন্য শুধুমাত্র সামান্য প্রশংসারই আপনার প্রাপ্য নয়।
ভাল থাকবেন।