৪. রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় ও বিয়ে-পাগলা বুড়ো
কৌলীন্যপ্রথা এক সময় বিভীষিকা হয়ে দেখা দিয়েছিল। কুলীন ব্রাহ্মণেরা অর্থলোভে একাধিক বিয়ে করত। বুড়ো ভামের কচি বউ হত, বালকের সঙ্গে বিয়ে হত প্রৌঢ়ার। রামমোহন রায় তাঁর ‘প্রবর্তক ও নিবর্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ’এ লিখেছিলেন :
‘অনেক কুলীন ব্রাহ্মণ যাঁহারা দশ পোনর বিবাহ অর্থের নিমিত্তে করেন, তাহারদের প্রায় বিবাহের পর অনেকের সহিত সাক্ষাৎ হয় না, অথবা যাবজ্জীবনের মধ্যে কাহারো দুই চারিবার সাক্ষাৎ করেন, তথাপি ঐ সকল স্ত্রীলোকের মধ্যে অনেকেই ধর্মভয়ে স্বামীর সহিত সাক্ষাৎ ব্যতিরেকেও এবং স্বামীর দ্বারা কোন উপকার বিনাও পিতৃগৃ্হে অথবা ভ্রাতৃগৃহে কেবল পরাধীন হইয়া নানা দুঃখ সহিষ্ণুতাপূর্বক থাকিয়াও যাবজ্জীবন ধর্ম নির্বাহ করেন।’
গবেষক স্বপন বসুর বই থেকে সেকালের কুলীন ব্রাহ্মণের বিয়ের এক সংক্ষিপ্ত তালিকা পেশ করছি। ময়াপাড়ার রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের=৬২টি, বলুটির দর্পনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের=৫২টি, জয়রামপুরের নিমাই মুখোপাধ্যায়ের=৬০টি, সাতগাছি-বেগুনির শ্রীধর চ্যাটার্জীর=৬০টি, কলকাতার রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের=৪০টি, বিক্রমপুরের রামরাজা ব্যানার্জীর=৪০টি, মুড়াগাছার কালী ঠাকুরের=৬০টি, বর্ধমানের নিকটবর্তী পাঁচড়ার প্রতাপ ব্যানার্জীর=৭০টি, যশোরের রামকণি ব্যানার্জীর=১০০টি, শান্তিপুরের নিকটবর্তী বালিগাড়িয়ার রঘুনাথ মুখার্জীর=১০০টি।
ঢাকা-বিক্রমপুরের তারপাশা গ্রামের রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় (১৮২৬-১৮৯৫) ছিলেন এক কুলীন ব্রাহ্মণ। ছোটবেলায় তাঁরা মা-বাবা মারা গেলে পিতৃব্য তারকচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁকে প্রতিপালন করেন। কুলীন বংশের মানুষ তিনি। আবার গরিবও। তাই পণের টাকা নিয়ে তারকচন্দ্র বহুবার রাসবিহারীর বিয়ে দেন। বাধা দিয়েছেন রাসবিহারী। তারক শোনেন নি। কৌলীন্য, বহুবিবাহ, পণপ্রথা — এসব ব্যাপারে রাসবিহারীর মনে তৈরি হয়েছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ময়মনসিংহের জমিদারের তহশিলদারের কাজ করছিলেন তিনি। তারই ফাঁকে ফাঁকে লিখে যাচ্ছিলেন ‘বল্লালসংশোধনী’ নামে একটা বই। লিখছিলেন কুপ্রথাবিরোধী গান। ছাপা হবার পরে রাসবিহারী তাঁর ‘বল্লালসংশোধনী’ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। বিদ্যাসাগর চিঠিতে লিখলেন :
‘আপনকার প্রণীত কৌলীন্যবিষয়ক এক খণ্ড পুস্তক পাইয়াছি। আমার পুস্তক মুদ্রিত হওয়ার পূর্বে এই পুস্তক পাইলে আমি তন্মধ্যে ইহার আদ্যন্ত সন্নিবেশিত করিতাম, এবং আপনকার পুস্তক আদ্যন্ত পাঠ করিয়া পরম আহ্লাদিত হইয়াছি ও তাহার ইংরেজী অনুবাদ আরম্ভ করিয়াছি। আমার পুস্তকের ইংরেজি অনুবাদের সহিতেই অনুবাদও মুদ্রিত হইবে।’
বিদ্যাসাগর রাসবিহারীকে জানিয়েছিলেন যে আগামী নভেম্বর মাসে গবর্নর জেনারেল বাহাদুর কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে — ‘তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আমাদের অভিপ্রেত বিষয়ের সবিশেষ জানাইব এবং যাহাতে তিনি এতদ্বিষয়ে অনুকূল হন তাহার যথোচিত চেষ্টা করিব।’
গবর্নর জেনারেলকে চিঠিতে রাসবিহারী লিখেছেন :
‘এদেশে যে অতি জঘন্য বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত আছে, তদ্বারা হিন্দুসমাজের ঘোরতর অনিষ্ট ঘটিতেছে এবং স্ত্রীজাতির দুরবস্থার একশেষ হইতেছে। বিবাহ-ব্যবসায়ী কুলীন ব্রাহ্মণেরা কিঞ্চিৎ লাভের লোভে বহুসংখ্যক বিবাহ করেন, কিন্তু বিবাহিতা স্ত্রীদিগের কোনও কালে কোনও সংবাদ লন না। ঐ সকল চিরদুঃখিনীদিগের লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণার অবধি নাই…’
গবর্নর জেনারেলের ঢাকা আগমন উপলক্ষে রাসবিহারী যে সংগীত রচনা করেন (দাশরথির সুর, তাল ঠেস কাওয়ালী) তার কিছু অংশ পরিবেশন করলাম :
‘নর্থব্রুক! দয়া করে কল্লে যদি পদার্পণ, আমার এই নিবেদন, ধর হে দরখাস্ত ধর, দয়া করে পাঠ কর, বিচার কর জেনে সকল বিবরণ।
‘(দেখ) একজনে করেছে বিয়ে একশ সাত, (ইহার) কারো সনে নাই সাক্ষাৎ, কে দেয় কাপড় কে দেয় ভাত, দেখ কেমন জাতনাশা এ কুলীন জাত, (আবার) ইহারা করেছে কত ভ্রূণপাত, (পূর্বে) প্রাণনাশক যে প্রথা ছিল, তাতে বিধিবদ্ধ হল, আইনে হল সতীদাহ নিবারণ ল
‘এই দেখ সব হিন্দুসভার অভিপ্রায়, (ইহা) সকলেরই অভিপ্রায়, এই প্রথা এই দণ্ডে যায়, বিদ্যাসাগর বিচার বয়ে সব জানায়, হায় হায় ! লর্ড মেও দৈবযোগে মরে যায়, (পূর্বে) কতবার উথ্থাপন ছিল, আইনের পাণ্ডুলিপি হল, (দেশের) দুর্ভাগ্যে ঘটিল সকল দুর্ঘটন।’
রাসবিহারী ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা অঞ্চলে, কৌলীন্যপ্রথার বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেছেন, জনমানসকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়েছেন, ‘ঢাকাপ্রকাশ’ — ‘হিন্দুহিতৈষিণী’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেছেন, তাঁকে অনেক গালাগালি শুনতে হয়েছে, একঘরে করে দেবার হুমকি এসেছে, দমে যান নি তিনি। আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও — তাঁর নীতি। তাই তিনি নিজের ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অকুলীন সমাজে।
তারপাশানিবাসী রাধামাধব মুখোপাধ্যায় কালীপাড়া জ্ঞানদায়িনী সভায় রাসবিহারীকে নিয়ে যে পদ্যটি পাঠ করেন, তার কিছু অংশ :
ধন্য ধন্য অসামান্য শকতি তোমার।
তব সম বাঙ্গালায় আছে কয় জন।।
দেশের মঙ্গল হেতু নিয়ত যাহার।
ভুজ, পদ, মন, প্রাণ, আনন, নয়ন।।
ধনহীন নিরাশ্রয় কুলীন ব্রাহ্মণ।
কত কষ্টে পালিতেছ আত্ম পরিবার।।
তথাপি স্বদেশ হিতে তব প্রাণপণ।
দেশের কুপ্রথা নাশ প্রতিজ্ঞা তোমার।।
দিবানিশি গ্রামে গ্রামে করেছ ভ্রমণ।
তব পদদ্বয় তবু ক্লান্ত হয় নাই।