৫. ইংরেজ পুলিশের গালে থাপ্পড় কষালেন ননীবালা
ননীবালা দেবী। সূর্যকান্ত ব্যানার্জী আর গিরিবালার মেয়ে ননীবালা। ১৮৮৮সালে হাওড়ার বালিতে তাঁর জন্ম। সে কালের রীতি অনুযায়ী কম বয়েসে বিয়ে হয়ে যায় ননীবালার। বিয়ের সময়ে তাঁর বয়েস মাত্র ১১ বৎসর। বিবাহিত জীবন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৫ বৎসর। স্বামী মারা গেলেন। পাঠ উঠল শ্বশুরবাড়ির। এত কম সময়ে স্বামীকে খেয়েছে যে বউ, কে তাকে রাখবে ? ননীবালা চলে এলেন বাপের বাড়িতে। বাবাকে বললেন তিনি পড়াশুনো করতে চান। পড়াশুনো ? শুনে রেগে কাঁই বাবা। যে মেয়ে তাঁর কাছে এখন শুধু বোঝা, সে করবে পড়াশুনো ? ননীবালাও বুঝতে পারলেন নিজের বাড়িতে ঠাঁই নেই তাঁর। স্বদেশে পরবাসী একেই বলে। ঘর ছেড়ে নামতে হল রাস্তায়। পথে এবার নামো সাথি পথেই হবে এ পথ চেনা।
পথের হদিশ দিলেন অমরেন্দ্র। উত্তরপাড়ার অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বিপ্লবের আগুনে টগবগ করে ফুটছিলেন অমরেন্দ্র। তিনি ননীবালাকে বললেন, ‘সংসার তোমাকে ঠাঁই দেয় নি তো কি হয়েছে ? দেশ তোমাকে ঠাঁই দেবে। তুমি চলে এসো গুপ্ত বিপ্লবী সমিতিতে। দেশকে স্বাধীন করার কাজে লেগে যাও।’
অমরেন্দ্র আর তাঁর বিপ্লবী বন্ধদের কাছে ননীবালা জানলেন আর শিখলেন অনেক কিছু। প্রথাগত লেখাপড়া নাই বা থাকল, মনের আবেগ তাঁকে আলো দিল। ছোটখাটো দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন যত্নের সঙ্গে। তাঁর নিষ্ঠা মুগ্ধ করল বিপ্লবীদের। এবার বড় দায়িত্ব দিতে হবে। সালটা ১৯১৫। আলিপুর জেলে বন্দি আছেন বিপ্লবী রামচন্দ্র মজুমদার। তাঁর সঙ্গে দেখা করে জেনে আসতে হবে গোপন তথ্য। কি সেই গোপন তথ্য ? রামচন্দ্রের কাছে ছিল একটা মাউসার পিস্তল। হঠাৎ গ্রেপ্তার হলেন বলে তিনি দলের লোকেদের বলে আসতে পারেন নি কোথায় রেখে এসেছেন সেই পিস্তল।
বিধবা ননীবালা পরলেন সধবার সাজ। যেন তিনি রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী। ভাবা যায় ? স্ত্রী এসেছেন জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে। জেলের কর্তারা সন্দেহ করতে পারলেন না। সেই সুযোগে ননীবালা জেনে এলেন গোপন তথ্য। বড় দায়িত্বের পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ তিনি। খুব খুশি অমরেন্দ্র। তিনি বললেন, ‘মামি, সধবার ছদ্মবেশে তোমাকে থাকতে হবে চন্দননগরের এক বাড়িতে। পুলিশের তাড়া-খাওয়া বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখার্জী, অতুল ঘোষ, ভোলানাথ চ্যাটার্জী, নলিনীকান্ত কর, বিনয়ভূষণ দত্ত, বিজয় চক্রবর্তীরা লুকিয়ে থাকবে সেই বাড়িতে। বাড়ির মালিক যেন মনে করে এটা একটা পরিবার। তুমি তাদের মা। গৃহকর্ত্রী। ছদ্মবেশে বাইরের বিপ্লবীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখবে তুমি।’
কিন্তু এই গোপন ডেরা বেশিদিন গোপন রইল না। পুলিশ জানতে পারল। পালাতে হবে। কোথায় পালাবেন? ননীবালার এক বাল্যবন্ধুর দাদা যাচ্ছিলেন পেশোয়ারে। তাঁর সঙ্গে পেশোয়ারে চলে গেলেন ননীবালা। দিন পনেরো-যোলো পরে সেখানেও পুলিশের হানা। তখন কলেরায় আক্রান্ত ননীবালা। তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসা হল পুলিশ হাজতে। একটু সুস্থ হতে তাঁকে নিয়ে আসা হল কাশীর জেলে। আলো-বাতাসহীন ছোট এক পানিশমেন্ট সেলে আটকে রাখা হল তাঁকে। চলল অমানুষিক অত্যাচার। ডেপুটি পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট জীতেন ব্যানার্জী জেরা করতে লাগলেন। ননীবালার মুখ থেকে কোন কথাই বের করতে পারলেন না নরাধম জীতেন।
কাশী থেকে তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে আনা হল। প্রথম মহিলা রাজবন্দি তিনি। ননীবালা শুরু করে দিলেন অনশন। পুলিশের স্পেশাল সুপারিনটেন্ডেন্ট মিঃ গোল্ডি তখন একটা ছলনার আশ্রয় নিলেন। বললেন, ‘কি করলে আপনি অনশন ত্যাগ করবেন ?’
ননীবালা বললেন, ‘আমাকে বাগবাজারে শ্রীরামকৃষ্ণের স্ত্রী সারদাদেবীর কাছে নিয়ে চলুন।’
–‘সেই মর্মে একটা দরখাস্ত লিখে দিন।’
লিখলেন ননীবালা।
কিন্তু মিঃ গোল্ডি সেটা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। ননীবালা তখন গোল্ডির গালে চড় মেরে বললেন, ‘মিথ্যে বলে এ দেশের মানুষকে অপমান করার এই শাস্তি।’
এরপরেও অনশন চালিয়ে গেছেন ননীবালা। এর মধ্যে তিনি জানতে পেরেছেন অস্ত্র আইনে সাজাপ্রাপ্ত দুকড়িবালাদেবীকে তৃতীয় শ্রেণির বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাঁর খাওয়া জোটে না ঠিকমতো। অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়। ননীবালা একটা মতলব ভাঁজলেন। ম্যাজিস্ট্রেট যখন তাঁকে অনশন ভঙ্গের অনুরোধ করলেন তখন তিনি বললেন, ‘কোন ব্রাহ্মণকন্যা যদি আমার জন্য রান্না করে দেয়, তাহলে আমি খেতে পারি।’
সেই ব্রাহ্মণকন্যা দুকড়িদেবী। তাঁকে বাঁচালেন ননীবালা।
কিন্তু নিজে কি বাঁচতে পারলেন তিনি ? জেল থেকে ফিরে এসে দেখলেন কোথাও তাঁর আশ্রয় নেই। পুলিশ ছুঁলে অঠারো ঘা। আত্মীয়-স্বজন কেউ দিল না আশ্রয়। সুতো কেটে, আধপেটা খেয়ে, পরের বাড়িতে রান্নার কাজ করে বেঁচে ছিলেন ননীবালা। বেঁচেছিলেন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার কুড়ি বছর পরে ১৯৬৭ সালের মে মাসে মারা যান তিনি।
দেশের জন্য জান কবুল করা এই নারী দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও স্বদেশে পরবাসীর জীবন কাটিয়েছেন।