৬. সেই এক হীরালাল সেন, যিনি বানালেন চলচ্চিত্র
ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক কে ?
সঙ্গে সঙ্গে অনেকে বলে উঠবেন, কেন, দাদাসাহেব ফালকে (১৮৭০-১৯৪৪)। বলবেন, ১৯১৩ সালে ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। তারপর ২৪ বছর ধরে তিনি ৯৫টি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের এবং ২৬টি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করেছেন।
মারাঠী বা গুজরাতিকে আপনি মাথায় তুলুন, কিন্তু ইতিহাসের বিকৃতি করবেন না। আরে মশাই, দাদাসাহেব সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হন ১৯১০ সালে, কিন্তু তার অনেক আগে এক বঙ্গ সন্তান, হীরালাল সেন যাঁর নাম, তিনি ১৮৯৭ সালে লণ্ডনের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে চলচ্চিত্র তৈরির যাবতীয় যন্ত্রপাতি আনিয়েছিলেন ; ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল অমরেন্দ্র দত্তের ক্লাসিক থিয়েটারে দেখিয়েছিলেন নিজের তৈরি ছবি। এরপর মিনার্ভা থিয়েটার, ইউনিক ও স্টার থিয়েটারেও তাঁর ছবি দেখানো হয়।
হীরালাল সেন ( ১৮৬৬—১৯১৭)।
বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামের বর্ধিষ্ণু বৈদ্যবংশে হীরালালের জন্ম। হাইকোর্টের আইনজীবী চন্দ্রমোহন সেন তাঁর বাবা। হীরালাল লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু তাঁর মাথায় ক্যামেরার ভূত। ক্যামেরায় ছবি তোলা নেশা। বাবা জানেন সব, কিন্তু বাধা দেন না। একদিন ভাই মতিলালকে নিয়ে হীরালাল গেলেন স্টার থিয়েটারে। সেখানে নাটক দেখবেন আর দেখবেন স্টিফেন্স সাহেবের বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপ দেখে উত্তেজিত তিনি। তিনিও বায়োস্কোপ বানাতে চান। শরণাপন্ন হলেন স্টিফেন্স সাহেবের। কিন্তু চালিয়াত সাহেব খোলসা করে কিছুই জানালেন না তাঁকে। হীরালাল দমে যাওয়ার পাত্র নন। মায়ের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে লণ্ডন থেকে আনালেন জন রেঞ্জ অ্যাণ্ড সন্সের সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্র। তারপর ইলেকট্রিকের সমস্যা। ইনসেন অ্যাণ্ড সিলক কোম্পানি থেকে আনালেন গ্যাস ট্যাঙ্ক। ৪ জন টেকনিশিয়ান এলেন ইতালি থেকে। ভাগনে ভোলানাথ যোগ দিলেন মামার সঙ্গে। ছবি দেখাবার পদ্ধতি শিখলেন ভোলানাথ। এ দেশে তিনিই প্রথম বাঙালি অপারেটর। ১৮৯৮ সাল। নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভূত হল হীরালালের প্রতিষ্ঠান রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি। ১৯০০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নিখিল ভারত শিল্প প্রদর্শনীতে বায়োস্কোপ দেখালেন হীরালাল। তারপর ডাক আসতেই লাগল। ভাওয়ালের রাজা, বনেলির রাজাবাহাদুর, মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ডাকে সাড়া দিলেন। বায়োস্কোপ দেখালেন ক্লাসিক, মিনার্ভা, ন্যাশনাল থিয়েটারে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রেরও জনক। তাঁর চলচ্চিত্রসৃষ্টির তালিকা :
ক] কাহিনি নাটকের খণ্ডচিত্র
বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনির নাট্যরূপ —ভ্রমর, সীতারাম, মৃণালিনী
তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাটক— সরলা
ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের কাহিনির নাট্যরূপ—আলিবাবা
এছাড়া ছিল ‘বুদ্ধদেব’, ‘হরিরাজ’, ‘দোললীলা’, অমর দত্তের ‘দুটি প্রাণ’, প্রফুল্ল মুখার্জীর ‘সোনার স্বপন’, গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘মনের মতন’, অমর দত্তের ‘মজা’।
খ] তথ্যচিত্র
১.চিৎপুর রোডের উপর তথ্যচিত্র। ২.ঢাকায় নিজের গ্রাম বগজুরির বাড়িতে বিয়ের ছবি। ৩. বগজুরি ধলেশ্বরী নদীতে স্নানার্থীদের ছবি। ৪. রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়িতে বিয়ের উৎসব। ৫. দুলিচাঁদ মল্লিকের বাড়ির বিয়ের উৎসব। ৬. শিবচরণ লাহার বাড়ির নানা অনুষ্ঠান। ৭. রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়ির নানা অনুষ্ঠান। ৮. শিবচরণ লাহার বাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
গ] সংবাদচিত্র
১৯০৩ সালে কলকাতা ও দিল্লিতে অনুষ্ঠিত করোনেশন দরবার, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন প্রসঙ্গে টাউন হলে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সভা, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের নেতা রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে শোভাযাত্রা, ১৯১১ সালের ৭ ডিসেম্বর দিল্লিতে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও সম্রাজ্ঞী মেরীর অংশগ্রহণ। দিল্লি ও কলকাতায় ৬খণ্ডে দরবারের ছবি তোলা হয়।
ঘ] বিজ্ঞাপনচিত্র
বটকৃষ্ণ পালের এডওয়ার্ডস ‘অ্যান্টিম্যালেরিয়াল স্পেসিফিক’ ; সি.কে,সেনের ‘জবাকুসুম কেশতৈল’ ; ডব্লিউ মেজর অ্যাণ্ড কোম্পানির ‘সার্সাপেরিলা’ বা সালসা পিল।
কালের আবর্তনে দেশে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির আবির্ভাব ঘটতে লাগল। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারলেন না হীরালাল। তার উপর ভাই মতিলালের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হল। আর তার সঙ্গে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো আবির্ভাব ঘটল অগ্নিদেবতার।
১৯১৭ সাল।
হীরালালদের রায় বাগান স্ট্রিটের বাড়িতে লাগল আগুন। সর্বভূক আগুন গ্রাস করল যন্ত্রপাতি, ফিল্ম, নথিপত্র। সেই বছরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল সেন।