৭. আর এক হীরালাল সেন আর তাঁর ‘হুংকার’
সেনহাটি। একটি গ্রামের নাম। বাংলাদেশের খুলনা জেলার বর্তমান দিঘলিয়া উপজেলার অন্তর্গত। আগে গ্রামের নাম ছিল ছুঁচোখালি। বিচ্ছিরি নাম। সেন উপাধিধারী কোন এক ব্যক্তি এই বিচ্ছিরি নামটা বদলে গ্রামের নাম রাখলেন সেনহাটি। সেখানকার বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন বৈদ্য সম্প্রদায়ভুক্ত। দেশভাগের পরে বৈদ্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা চলে আসেন বেহালায়। এখানে তাঁরা গড়ে তোলেন সেনহাটি কলোনি।
সেনহাটি অনেক কীর্তিমান মানুষের বাসভূমি ছিল। অনুজাচরণ সেন, রসিকলাল দাস, দ্বিজরাজ ভট্টাচার্য, রতিকান্ত দত্ত প্রভৃতি দেশপ্রেমিক বিপ্লবীর পৈত্রিক নিবাস এই গ্রাম। এ ছাড়া নজরুলগীতির শিল্পী যূথিকা রায়, নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত, কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন সেনহাটির মানুষ।
আর যে এক হীরালাল সেনের কথা আমরা বলব. তাঁর বাড়িও সেনহাটিতে। তিনি ছিলেন সেনহাটি জাতীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ব্যস, এইটুকুই। হীরালাল সেনের জন্মসাল, বংশপরিচয় কিছুই জানার উপায় আর নেই। খুলনার ব্রজলাল কলেজের বাংলার অধ্যাপক শংকরকুমার মল্লিকের গবেষণাপত্র জানা যায় হীরালাল সেনের একটি বাজেয়াপ্ত বইএর কথা।
সে বইএর নাম ‘হুংকার’। বইটি গানের সংকলন। ২৪ পাতার বই। বইএর প্রকাশক কে.সি.বসু। কলকাতার ৩৪নং মুসলমান পাড়া লেন থেকে ছাপা হয়েছে এই বই। মূল্য ২ আনা। ছোট এই বই-এর বিষয়বস্তুর পরিচয় পাই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ (আষাঢ়, ১৩১৫) পত্রিকায় :
“হুংকার—শ্রী হীরালাল সেনগুপ্ত প্রণীত। ২৪ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র পুস্তিকা। মূল্য দুই আনা। ইহাতে গ্রন্থকার রচিত কতকগুলি গানের প্রারম্ভে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ ও অবশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ সংযোজিত হইয়াছে। গ্রন্থকারের স্বরচিত গানগুলিতে কবিত্ব, চিন্তা ও দেশপ্রীতি আছে। তিনটি গান রবীন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র ও যুগান্তর সম্পাদক ভূপেন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করিয়াছে। চাষার গান দুইটি বেশ হইয়াছে; চাষার ভাষায় চাষার প্রাণে আঘাত করিতে পারিলেই তাহারা শীঘ্র উদ্বোধিত হইয়া উঠিবে।”
হীরালাল ১৯০৮ সালে প্রকাশিত এই বইটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে কবিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন ‘ঘরে আগুন লাগিয়ে তামাশা দেখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়’।
পুলিশ এই বই-এর জন্য হীরালাল সেনের বাড়ি তল্লাশি করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় মামলা। ইংরেজ শাসকেরা একে রাজদ্রোহের নজির বলে মনে করেছিলেন। হুংকার? কাকে হুংকার দিচ্ছেন হীরালাল সেন? ইংরেজ সরকার ‘হুংকার’কে বাজেয়াপ্ত করে তাকে অচেতনভাবে একটা ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়ে ফেললেন। এটি হল ইংরেজ আমলের প্রথম বাজেয়াপ্ত বই, হীরালাল সেন হলেন প্রথম শাস্তিপ্রাপ্ত কবি।
তবে তার সঙ্গে যুক্ত হলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে উৎসর্গ করা, তাঁর চিঠি, একটা যোগ তো আছেই। কে জানে তখনকার বাংলার লেফটেনান্ট গভর্নর অ্যাণ্ড্রু ফ্রেজার ফৌজদারি মামলায় রবীন্দ্রনাথকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছিলেন কিনা!
বিচারালয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছিলেন আবেগপ্রবণ যুবকের পক্ষে তার দেশ বা জনগণ সম্পর্কে তার স্বপ্ন বা আকাঙ্খা তার কবিতা বা গানে প্রকাশ করা অস্বাভাবিক বা অপ্রাকৃতিক কিছু নয়।
বিচারে কারাদণ্ড হয় হীরালাল সেনের। ১৯০৮ সালে। ১৯১০ সালে মুক্তি পান তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়ে আসেন শান্তিনিকেতনে। সেখানেও নিস্তার নেই। পুলিশের হয়রানি। শেষে রবীন্দ্রনাথ হীরালাল সেনকে জমিদারি কাজে নিযুক্ত করেন।