৯. গোকুলচন্দ্র নাগ ও কল্লোলের কোলাহল
টি.বি হয়েছে গোকুলের। রাজরোগ যক্ষ্মা। অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তারের পরামর্শে তাঁকে দার্জিলিং নিয়ে যওয়া হল। দিনকয়েক পরে তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু দীনেশরঞ্জন ছুটে গেলেন সেখানে। গোকুল তাঁকে বললেন, ‘জীবনের এক দুর্দিনে দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে। ভাবছিলাম আজ আবার এই দুর্দিনে যদি তোমার সঙ্গে দেখা না হয়!’ তারপর একটু থেমে আবার গোকুল বললেন, ‘আমাকে রাখতে পারবে না, কিন্তু কল্লোলকে রেখো।’
চলে গেলেন গোকুল। না ফেরার দেশে। মাত্র ৩১ বৎসর বয়েসে, সাড়াজাগানো ‘কল্লোল’ পত্রিকার এক পথিকৃৎ, গোকুলচন্দ্র নাগ (১৮৯৪-১৯২৫) মায়া কাটালেন পৃথিবীর।
গোকুলের জন্ম কলকাতার অক্রূর দত্ত লেনে। তাঁর মা কমলা, বাবা মতিলাল। ঐতিহাসিক কালিদাস নাগ (১৮৯২-১৯৬৬) তাঁর দাদা। অন্যান্য ভাইবোন হলেন বিভাবতী (মিত্র), প্রভাবতী ( মিত্র), রামচন্দ্র। ছেলেবেলায় মারা গেলেন মা-বাবা। মামা বিজয় বসু গোকুলদের আশ্রয় দেন। বিজয় বসু ছিলেন চিড়িয়াখানার অধিকর্তা। ছোটবেলা থেকে গোকুল রুগ্ন। পড়াশুনো বেশি দূর এগোয় নি। কলকাতার সাউথ সুর্বাবন স্কুলে পড়েছিলেন। পাশ করতে পারেন নি। গেলেন ঘাটশিলা। সেখানেও পড়াশুনো এগোল না।
শখ ছিল ছবি আাঁকার। মামার আপত্তি ছিল। তবু ভর্তি হলেন আর্ট স্কুলে। আলাপ হল ময়মনসিংহের অতুল বসু (১৮৯৮-১৯৭৭), বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের যামিনী রায়ের (১৮৮৭-১৯৭২) সঙ্গে। ছবি এঁকে তেমন কিছু রোজগার হল না। প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৮৫-১৯৩০) অধীনে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ওয়ের্স্টান সার্কেলে কাজে যোগ দিলেন গোকুল। কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে ছাড়তে হল সে কাজ। সেখান থেকে নিউমার্কেটের ফুলের দোকান। তাঁর আর এক মামা সুরেন বসুর ফুলের দোকান ছিল নিউ মার্কেটে। মামা দোকানে বসতেন সকালে, ভাগনে বসতেন বিকেলে। এই ফুলের দোকানেই আলাপ হল দীনেশরঞ্জন দাশের (১৮৮৮-১৯৪১) সঙ্গে। দীনেশ তখন চৌরঙ্গী অঞ্চলে খেলার সরঞ্জাম বিক্রেতা এস. রায় অ্যাণ্ড কোম্পানিতে কাজ করতেন। আলাপ পরিণত হল বন্ধুত্বে।
একদিন গোকুল বললেন, ‘কি ভাবছ বলোতো ?’
দীনেশ বললেন, ‘ভাবছি একটা পান্থশালার কথা — যেখানে মানুষ এসে শ্রান্ত জীবনভার নিয়ে বিশ্রাম করতে পারবে। জাতি, sex ও position সেখানে কোনও বাধা হবে না। আপন আপন কাজকে মানুষ আনন্দময় করে তুলবে।’
গোকুল জোরে হাততালি দিয়ে মহা আনন্দে বলে উঠলেন, ‘আমারও যে এটা জীবনের স্বপ্ন।’
এই ভাবনা থেকে জন্ম হল ‘ফোর আর্টস ক্লাবের’। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা দেখা করলেন অধ্যাপক বিজলীবিহারী সরকারের স্ত্রী সুনীতিদেবীর সঙ্গে। তিনি রাজি। ক্লাবের প্রথম অধিবেশন হল ৮৮বি হাজরা রোডে। একে একে জুটতে লাগলেন মণীন্দ্রলাল বসু, উমা দাশগুপ্ত, সতীপ্রসাদ সেন, মীরা সান্যাল, দ্বিজেশ সেন, কিরণ দে, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, নিরুপমা দাশগুপ্ত প্রভৃতিরা। শুধু সাহিত্য নয়, এখানে ছিল চিত্রশিল্প, সংগীত, কারুশিল্প — এইসব।
এই ফোর আর্টস ক্লাবই ছিল ‘কল্লোলে’র অগ্রদূত।
১৩৩০ সালের বৈশাখ মাসে প্রকাশিত হল ‘কল্লোল’। প্রথম সংখ্যার প্রথম রচনা দীনেশরঞ্জনের কবিতা ‘কল্লোল’ :
আমি কল্লোল শুধু কলরোল ঘুমহারা নিশিদিন,
অজানা জানার নয়নের বারি
নীল চোখে মোর ঢেউ তুলে তারি
পাষাণশিলায় আছাড়িয়া পড়ি ফিরে আসি নিশিদিন।
‘কল্লোল’ পত্রিকার সহ সম্পাদক হলেও সজনীকান্ত দাসের মতে তিনি ছিলেন পত্রিকার আসল কর্ণধার। প্রত্যেকটি লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, কাটছাঁট – যোগবিয়োগ করে প্রকাশের উপযোগী করে তুলতেন, চিঠিপত্রে লেখক-লেখিকাদের সঙ্গে আলাপ করতেন, প্রতি সংখ্যার রূপসজ্জা ও রচনাসূচি নির্ধারণ করতেন, প্রুফ দেখতেন, প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, দপ্তরির কাজও করতেন।
গোকুলচন্দ্রের রচনার তালিকা :
ক] ‘ঝড়ের দোলা’( ১৯২২) গল্প সংকলনের ‘মাধুরী’ গল্প।
খ] টেনিসনের ‘দ্য প্রিন্সেস’ অবলম্বনে কিশোরদের জন্য ‘রাজকন্যা’( ১৯২২)।
গ] দশটি রচনা সম্বলিত ‘রূপরেখা’ ( ১৯২২)।
ঘ] ‘সোনার ফুল’ ( ১৯২২)।
ঙ] মেটারলিঙ্কের রচনা অবলম্বনে কিশোরদের জন্য রচিত ‘পরীস্থান’ (১৯২৪)।
চ] ‘পথিক’ নামক উপন্যাস (১৯২৫)।
ছ] গল্প সংকলন ‘মায়ামুকুল’ ( ১৯২৭)
গোকুলচন্দ্রের অকালমৃত্যুর পর ঢাকা থেকে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন :
তুমি নব বসন্তের সুরভিত দক্ষিণ বাতাস
ক্ষণতরে বিকম্পিত করি গেলে বাণীর বন্দনা।