১. ইংরেজ পুলিশের কোপে বিধুভূষণ বসু ও তাঁর পত্রিকা
যে সব বাংলা পত্রিকায় স্বাধীনতার কথা, ইংরেজ শাসনের সমালোচনা প্রকাশিত হত, ইংরেজ শাসক সে সব পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। কখনও ধমক-চমক করা হত, কখনও বাজেয়াপ্ত করা হত, কখনও সম্পাদক বা পত্রিকার অন্যান্য কর্মচারীকে করা হত গ্রেপ্তার। প্রয়োগ করা হত নানা আইন। যেমন — ক] কোড অব ক্রিমান্যাল প্রসিডিয়োর (১৮৯৮)-এর ৯৯ ধারা, খ] ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২৪-এ ধারা, গ] ইণ্ডিয়ান প্রেস অ্যাক্ট ১৯১০-এর ধারা (১)-এর ৪ ও ১২ উপধারা, ঘ] ইণ্ডিয়ান প্রেস এমার্জেন্সি পাওয়ার অ্যাক্টের (১৯৩১) ১৯ ধারা।
বাগেরহাট থেকে প্রকাশিত হচ্ছিল ‘পল্লীচিত্র ‘নামে একটি মাসিক পত্রিকা। সম্পাদক বিধুভূষণ বসু। লোকটির জন্ম বাগেরহাটের বিষ্ণুপুরে। মা-বাপ মরে যায় ছোটবেলায়। এক আত্মীয়ের ঘরে মানুষ হন বিধুভূষণ। পড়তেন মূলঘর স্কুলে। সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক নেপালচন্দ্র রায়ের প্রভাব পড়ে। স্বদেশি আন্দোলনে মেতে ওঠার প্রভাব। বিধুভূষণ তাঁর নাটক, গল্প আর উপন্যাসের মাধ্যমে তাঁর মনের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘সতীলক্ষ্মী’ উপন্যাসকে বাজেয়াপ্ত করে ইংরেজ শাসকরা। এটি নাকি ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বাজেয়াপ্ত বই।
বিধুভূষণ ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ পর্যন্ত সম্পাদনা করেছেন ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকা। তারপর তিনি প্রকাশ করেন একটি মাসিক পত্রিকা। তার নাম ‘পল্লীচিত্র’। ১৯০৬ (কারোর মতে ১৯০৮) সালে প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি। গরম গরম লেখা থাকত পত্রিকায়। পুলিশের নজর ছিল। তারপর ১৯০৯ সালের জুন–জুলাই মাসে সে পত্রিকায় যখন প্রকাশিত হল নগেন্দ্রনাথ চন্দের ‘এসো মা পল্লীরাণী’ কবিতা এবং বিধুভূষণ বসুর ‘শিকার’ নামক গল্প, তখন তৎপর হয়ে উঠল পুলিশ।
১৯০৯ সালের ২১ ডিসেম্বর পুলিশ সুপার (এস পি) মিঃ ডব্লু. এ, পি স্যালে সদলবলে হাজির হলেন পত্রিকার অফিসে। বিধুভূষণ বললেন, কি ব্যাপার স্যার !
স্যালে বললেন, আপনাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছি।
— আমার অপরাধ ?
— পত্রিকার লেখার মাধ্যমে আপনি ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে খেপিয়ে তুলছেন।

বিধুভূষণ বসু, লেখক নগেন্দ্রনাথ চন্দ, পত্রিকার মুদ্রাকর ও প্রেসের মালিক শরৎচন্দ্র মিত্রকে গ্রেপ্তার করা হল। বাজেয়াপ্ত করা হল পত্রিকার সব কপি। ১২৪(ক) ও ১৫৩(ক) ধারা অনুযায়ী খুলনা ম্যাজিস্ট্রের কোর্টে দায়ের করা হল মামলা। ১৯১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয় বিচার। বিধুভূষণ ২ বছর ও শরৎচন্দ্র মিত্র ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। [‘After pronouncing Bose guilty of sedition under section 124A on the Indian Penal Code, the judge declared that he deserved to be transported for life, so heinous was his crime, In the end he was sentenced to two years of rigorous imprisonment’ ]
বিধুভূষণ বসুর নাম আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে নেই। এই দেশপ্রেমিক সাহিত্য সাধক অনেকগুলি বইএর রচয়িতা – ‘লক্ষ্মীমেয়ে’, ‘লক্ষ্মীমা’, ‘লক্ষ্মীবউ’, ‘সতীলক্ষ্মী’, ‘সুভদ্রা’, ‘পাপিষ্ঠা’, ‘গোধন’, ‘কামিনী কাঞ্চন’, ‘প্রখরা’, ‘কুলের কালি’, ‘বিষের বাতাস’, ‘জ্যাঠাইমা’, ‘পরিণাম’। গল্প উপন্যাস ছাড়াও বেশ কয়েকটি নাটক লিখেছিলেন তিনি। যেমন : ‘দাদা’, ‘মীরকাশিম’, ‘রক্তষজ্ঞ’, ‘বিমাতা’, ‘দুই বিঘা জমি’, ‘কালাপাহাড়’। বিধুভূষণ তাঁর ‘বনমালা’ গল্পগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন :
‘আমি তোমার বনমালা গলায় পরলাম, দীর্ঘজীবী হয়ে বনফুল তুলে এমনি করে মালা গাঁথো। কিরাত কবি যদি হও, লেখো। এমনি হদয়ের জয় তার জন্য তোমার আঙুল কেটে দক্ষিণা নিতে ইচ্ছা হয়।’
সাংবাদিক ও সম্পাদক বিধুভূষণ ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের এক সৈনিক। আইন অমান্য আন্দোলনে তিনি কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করে প্রসঙ্গ শেষ করব। একবার গোবরডাঙার এক জমিদার এম এল এ পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। সে জমিদার স্বদেশি আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করতেন। চটি চাটতেন ইংরেজের। বিধুভূষণ বসু তাঁকে ব্যঙ্গ করে লিখলেন ‘ভোটরঙ্গ’ নামে কবিতা। জমিদারমশাই বেজায় চটে গিয়ে মানহানির মামলা করলেন বিধুভূষণের বিরুদ্ধে।