পূর্ব-ভারতে ব্রিটিশদের সঙ্গে মুঘলদের প্রথম সম্মুখ সমর হয় বাংলায় পলাশীর ৮ দশক আগে। প্রভূত দ্বন্দ্বের শুরু মীরজুমলার নবাবির সময়। আওরঙ্গজেবের ঘনিষ্ঠতম সমরনায়ক মীরজুমলার (যাকে ঐতিহাসিক জগদীশ নারায়ণ সরকার আখ্যা দিচ্ছেন জেনারেল অব আওরঙ্গজেব) ১৬৬০-তে আওরঙ্গজেবকে সিংহাসনে বসিয়ে বাংলায় সুবাদারিতে আসেন। বাংলায় এসেই নতুন নবাব [সুবাদারকে নবাবও বলা হত] ১৬৬০-এ ব্রিটিশদের চাহিদামতো সোরা সরবরাহ করার প্রস্তাব দিলেন। কোম্পানি এই প্রস্তাব মানে না। মীরজুমলা ব্রিটিশদের মুক্ত বাণিজ্যের পরওয়ানা দিলেও পাটনা থেকে ব্রিটিশদের যে কয়টা সোরা ভরতি নৌকো আসছিল সব কটাকে তিনি আটক করান। কোম্পানির হুগলীর মধ্যস্থ যখন দেখল নবাব তাদের সমস্ত দিকে আটকে দিয়েছে, সে তখন মীরজুমলার একটি নৌকো জামিন হিসেবে আটকে রাখে যাতে তাদের নৌকাগুলি উদ্ধার করা যায়। ক্ষিপ্ত সুবাদার ব্রিটিশদের সব কটা কুঠি ধ্বংস করে ব্রিটিশদের বাংলা ছাড়া করতে উদ্যোগী হয়। মীরজুমলার হুমকিতে আতঙ্কিত মধ্যস্থ ট্রাভিস্টা এই বিষয়টা মাদ্রাজে লেখে এবং মীরজুমলার আটক করা নৌকোটি ছেড়ে দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। মীরজুমলার সঙ্গে বিবাদ বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানির নবযুগের সূচনা করল। ব্রিটিশেরা ভাবতে শুরু করল কিভাবে মজবুত সেনাবাহিনী তৈরি করা যায়, নিজেদের সুরক্ষিত করে রাখা যায় আর কীভাবে মুঘল কেন্দ্র ঢাকা/হুগলী থেকে দূরে নিরাপদে ঘাঁটি গাড়া যায়। অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। যে কুঠিয়ালেরা ১৬৬১-এ নৌকো দখল করার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তারা ২৫ বছরের মধ্যে ১৬৮৬-তে মুঘলদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে দ্বিধা করে নি। তারা নবাবি জাহাজ দখল করে। হুগলী বন্দর পুড়িয়ে দেয়।

যশুয়া চাইল্ড
ভারতে ব্যবসা বাড়াবার এবং স্থিতিশীলতার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে কড়া আগ্রাসী এবং তেজি নীতি নিয়ে খোলামেলা যুদ্ধ করার প্রথম ডাক দেন ১৬৬৯-তে কোম্পানির সুরাটের প্রেসিডেন্ট এবং বম্বের গভর্নর গারল্যান্ড অঙ্গিয়ার। ১৬৭৭-এ তিনি লন্ডনের কর্তাদের লিখলেন,— ‘জাস্টিস এন্ড নেসেসিটি অব ইয়োর স্টেট নাউ রিকোয়ার্ড দ্যাট ইন ভায়োলেন্ট ডিস্টেম্পারস, ভায়োলেন্ট কিওর্স আর অনলি সাকসেসফুল; দ্যাট দ্য টাইমস নাউ রিকোয়ার ইয়ু টু ম্যানেজ ইয়োর জেনারেল কমার্স উইথ ইওর সোর্ড ইন ইয়োর হ্যান্ডস’। অঙ্গিয়ারের প্রস্তাবনা খতিয়ে দেখা শুরু করল কোম্পানি। ১৬৮১-তে যশুয়া চাইল্ড গভর্নর হওয়ার পর আরও সক্রিয়তার নীতিতে (ফরোয়ার্ড পলিসি) এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। একইভাবে বাংলায় হেজেস এবং সুরাটে স্যর জন চাইল্ড আলাদা আলাদা ভাবে বারবার কোম্পানির কর্তাদের অনুরোধ করছিলেন তাদের বাসস্থান আর কুঠিগুলিকে সুরক্ষা কবচ দেওয়ার জন্যে।

মীরজুমলা
কর্তারা যুদ্ধের বিস্তৃত পরিকল্পনা করে প্রস্তুত। তখনও সমুদ্রে তারা যেসব বাহিনী নামায় নি, সেই বিশাল বাহিনীগুলিকে বাংলায় পাঠান হল। কোম্পানির এডমিরাল হিসেবে মনোনীত হল নিকলসন। তাকে রসদ, বাহিনী আর কোম্পানির অন্যান্য আমলা নিয়ে বালেশ্বরের দিকে রওনা হতে বলা হল। নিকলসন নবাবকে হুঁশিয়ারি দিলেও নবাবের দিক থেকে কোনো সদর্থক উত্তর পাওয়া গেল না। বাহিনী চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়ে শহর, দুর্গ এবং জনপদ দখল করে। এই বহর বাংলার জন্যে আলাদা ভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এতে ছিল ছটা জাহাজ — কিন্তু ১৬৮৬-তে অক্টোবরে হুগলীতে যখন লড়াই শুরু হল তখন মাত্র তিনটে জাহাজ অকুস্থলে পোঁছয়। হুগলী থেকে ২৬ মাইল দূরে সুতানুটিতে বাহিনী পশ্চাদপসরণ করে। কথাবার্তা চলতে থাকে কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। তারা শাহি লবন গুদাম পুড়িয়ে দেয়, থানা তছনছ করে এবং হিজলি দ্বীপ দখল করে। মুঘলেরা ব্রিটিশদের হিজলি থেকে তাড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয় এবং আবার নতুন করে দরকষাকষি শুরু হয়। ইতোমধ্যে ক্যাপ্টেন হিথের নেতৃত্বে নতুন বাহিনী পাঠানো হয় বাংলায়। আওরঙ্গজেব তখন দাক্ষিণাত্য বিজয়ে ব্যস্ত, এইরকম ছোটোখাট বিষয়ে মন দেওয়ার তার সময় ছিল না। তিনি যখন ঘটনাটা জানলেন, তার প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশ সূত্রে পাচ্ছি, বাদশাহ হুগলীর ঠিকঠাক মানচিত্র খুঁজে তাকে পাঠানোর নির্দেশ দিলেন। কথাবার্তা চলাকালীন হিথ এবং চার্ণক বাহিনী নিয়ে বালেশ্বর আক্রমণ করে এবং তারপর চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়ে পৌঁছে সেখানে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ব্রিটিশরা মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আরাকান রাজকে প্রস্তাব দিলেও আরাকান রাজ তাদের প্রস্তাবে কান দিলেন না। তারা বাহিনী নিয়ে মাদ্রাজে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ফেব্রুয়ারি ১৬৮৯-তে।

ব্রিটিশ-মুঘল শান্তি চুক্তির পরে ব্রিটিশ কোম্পানি আবার বাংলায় ফিরে আসে। তাদের ডেকে আনেন গুড এন্ড ওয়ার্দি নবাব ইব্রাহিম খান। বাংলার নতুন সুবাদার। তিনি তাদের বললেন সম্রাট তাদের অনুশোচনা খোলা মনে গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে বাংলার নবাব আওরঙ্গজেবকে লিখলেন, ব্রিটিশেরা আমায় খুব বিনীত আবেদন করে বলেছেন তারা যে হীন দুষ্কর্ম করেছে তা যেন আমি ক্ষমা করে দিই, এবং মাত্র ৩০০০ টাকার বিনিময়ে তাদের শুল্কবিহীন বাণিজ্য করার অনুমতি দিই। এ বিষয়ে হাসবুলহুকুম বা শাহিনির্দেশ ১৬৯১-তে জারি করা হয় শাহি দেওয়ান আসদ খানের পাঞ্জা এবং স্বাক্ষর-সহ। বাংলার কুঠিয়াল আনন্দে লিখল, আমরা ঢাকা থেকে মাত্র ৩০০০ টাকার বাৎসরিক পেশকাশের বিনিময়ে সম্রাটের হাসবুলহুকুমের নকলটি পেয়েছি, এবার থেকে সম্মানিত কোম্পানিকে আর কেউ রুখতে পারবে না, কেউ খারাপ ব্যবহার করতে পারবে না।
কোম্পানি এবার থেকে তার প্রধান প্রশাসনিক দপ্তর সুতানুটিতে সরিয়ে আনল।
কলকাতা শহরের পত্তনের ভ্রুণ স্থাপিত হল।