প্রারম্ভ
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের ভুমিকা নিয়ে বিশ্লেষণ করার জন্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সম্মন্ধে অল্পবিস্তর ধারনা থাকার প্রয়োজন আছে৷ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখা ‘কৃষ্ণচরিত্র” গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৪১০ সাল নাগাদ৷ আবার ড. করুনা সিন্ধুর দাসের মতানুযায়ী “সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতাব্দী বা তারও আগে একটা মহাযুদ্ধ হয়েছিল যাতে ভারতবর্ষের সমগ্র ক্ষত্রিয় সমাজ কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে৷ এবং তারই স্মৃতি নির্ভর করে রচিত হয়েছিল মহাভারত৷ শুধুমাত্র যুদ্ধের বর্ণনা নয়, সাথে যুক্ত হয়েছিল বহু শতাব্দীব্যাপী প্রচলিত বীরত্ব, ত্যাগ, মহত্ব, নীচত্ব, কলঙ্ক ও ছলনার বহু কাহিনী৷ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল মোট আঠারো দিন ধরে৷ মহর্ষি বেদব্যাস রচিত মূল মহাভারতের যুদ্ধ পর্ব থেকে জানা যায় যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী জেনে উভয় পক্ষই সৈন্য সংগ্রহ শুরু করেছিলেন৷ কৌরব পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন রাজা ভগত্ মহাবীর ভুরিশ্রবা, হার্দিক্য, কৃতবর্মা, সিন্ধুসৌরীর রাজা জয়দ্রথ প্রমুখ, কম্বোজ দেশের রাজা সুদক্ষিন, মহিষ্মতি নগরীর রাজা নীল, অবন্তী দেশের রাজদ্বয় বিন্দ ও অনুবিন্দ, কৈকেয় দেশের রাজা পঞ্চসহোদর, অঙ্গ দেশের রাজা ও দুর্যোধনের প্রধান মিত্র কর্ণ প্রমুখ সকলেই তাঁদের বিরাট বাহিনী ও অস্ত্রসস্ত্র সহ দুর্যোধনের পক্ষে যোগদান করেছিলেন৷ এদিকে মদ্র রাজা শল্য সম্পর্কে পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে নকুল ও সহদেবের মামা। কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী জেনে বিশাল সৈন্য সামন্ত নিয়ে পাণ্ডবপক্ষে যোগদান করার জন্য যাত্রা শুরু করেছিলেন৷ কিন্তু পথিমধ্যে দুর্যোধন তাঁকে প্রভূত আপ্যায়ন ও বিনোদনের দ্বারা তুষ্ট করে ও প্রধান সেনাপতি পদের প্রলোভন দিয়ে হাইজ্যাক করে নিলেন৷ এই সংবাদ যুধিষ্টিরের কানে পৌঁছালে তিনি শল্যরাজ্যের সাথে দ্যাখা করে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলেন, অর্জুন ও কর্ণ যখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে রাজা যেন সেই সময় কর্ণকে ভুল পথে চালিত করেন এবং কর্ণের মনসংযোগ নষ্ট করে দেন, যাতে করে কর্ণ অর্জুনকে কিছুতেই বধ করতে না পারে৷ রাজা শল্য তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে যান৷ রাজা যুধিষ্ঠিরের এক নাম ধর্ম পুত্র৷ তিনি কি তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করলেন? শ্রীকৃষ্ণের কাছে দুর্যোধন ও অর্জুন উভয়েই একই সাথে প্রার্থনা করেছিলেন৷ তিনি উভয়কেই সাহায্য করলেন৷ দুর্যোধনকে দিলেন যুদ্ধে পারদর্শী দশ লক্ষ নারায়নী সেনা এবং নিজে যুদ্ধ না করে পাণ্ডব পক্ষ অবলম্বন করবেন বলে জানিয়ে দিলেন৷ (অযুধ্যমানঃ সংগ্রামে ন্যস্তশাস্ত্রো হমকেতঃ) । এরপর কৃতবর্মাও দুর্যোধনকে এক অক্ষৌহিনী সেনা দিয়ে সাহায্য করলেন৷ ফলে দুর্যোধনের দিকে মোট একাদশ অক্ষৌহিনী সেনা সংগৃহীত হল৷ তুলনামূলক ভাবে পাণ্ডবদের সৈন্য অনেক কম ছিল মোট সাত অক্ষৌহিনী সেনা৷ পাণ্ডব পক্ষে যে সব রথী-মহারথীরা যোগদান করেছিলেন তাঁরা হলেন যথাক্রমে, মহাবীর সাত্যকি তাঁর অশ্বারোহী, গজারোহী, রথারোহী ও পদাতিক সহ বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে পাণ্ডব পক্ষে যোগদান করলেন। এছাড়াও চেদীরাজ ধৃষ্টকেতু, জরাসন্ধের পুত্র জয় সেন, পাণ্ড্যরাজ, সকলেই বিশাল সেনা বাহিনী নিয়ে যোগদান করায় পাণ্ডব পক্ষের সৈন্যদল ও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠল৷ এছাড়াও পাঞ্চালরাজ মহাবীর দ্রুপদ ও মৎস্যরাজ বিরাট তাঁদের বিশাল সৈন্য সম্ভার নিয়ে পাণ্ডব পক্ষে যোগদান করলেন৷ এরপরেও যাদের কথা মহামতি ব্যাসদেব শুধুমাত্র উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হয়েছেন, যাদের শৌর্য, বীর্য, পরাক্রম ও আত্মত্যাগ একপ্রকার উহ্যই রয়ে গিয়েছে মহাভারতে, পঞ্চপাণ্ডবের শৌর্য ও বীর্যের নীচে তাঁদের যাবতীয় কৃতিত্ব চাপা পড়ে গিয়েছে তাঁরা হলেন দ্রৌপদীর গর্ভজাত পাঁচ পুত্র৷ যুধিষ্টিরের ছেলে শ্রুতিবিন্ধ্য, ভীমের ছেলে সুতসোম, অর্জুনের ছেলে শ্রুতকর্মা, নকুলের ছেলে শতানীক ও সহদেবের ছেলে শ্রুতসেনা৷ সাধারন পাঠকুলও তাঁদের কোনও খোঁজ রাখেন না । এছাড়াও যুধিষ্টিরের অপর স্ত্রী শৈব সম্প্রদায়ের দেবিকা ও তাঁদের সন্তান যৌধ্যেয়৷ নকুলের আরেক স্ত্রী চেদী রাজকন্যা করেনুমতি এবং তাঁদের ছেলে নিরমিত্র৷ মদ্রদেশের রাজকন্যা বিজয়া ছিলেন সহদেবের অপর স্ত্রী ও তাঁর সন্তান সুহোত্ৰ৷
পাণ্ডব সন্তানদের মধ্যে সবার চাইতে বয়সে বড় ছিলেন ঘটোৎকচ্। ভীমের অপর স্ত্রী রাক্ষস কন্যা হিড়িম্বীর সন্তান৷ আর অর্জুন ও সুভদ্রার পুত্র অভিমুন্য ছিলেন সর্বকনিষ্ট৷ ঘটোৎকচ্ ও অভিমুন্যর বীরত্বের কথা যদিও সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন মহর্ষি বেদব্যাস, কিন্তু ততখানি উল্লেখ করেননি অর্জুনের ও নাগাল্যান্ডের রাজকন্যা উলুপীর সন্তান, শৌর্য ও বীর্যে যিনি কোনও অংশে কারোর থেকে কম ছিলেন না, তিনি হলেন ইরাবান৷ অর্জুনের অপর স্ত্রী ছিলেন মনিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা ও তাঁদের ছেলে বব্ৰুবাহণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি৷ তার কারণ’ চিত্রাঙ্গদার সাথে অর্জুনের চুক্তিই ছিল তাঁদের সন্তান শুধুমাত্র মনিপুরের রাজপাট সামলাবে, হস্তিনাপুরে যাবেনা৷ সেই হেতু বব্ৰুবাহণ অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হলেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি৷
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে একটা অকল্পনীয় ঘটনা ঘটেছিল৷ হটাৎই রাজা যুধিষ্টির তাঁর অস্ত্রসস্ত্র, বর্ম, প্রভৃতি পরিত্যাগ করে রথ থেকে নেমে করজোড়ে দ্রুতগতিতে একে একে পিতামহ ভীষ্ম, কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য সম্পর্কে মাতুল শল্যরাজের কাছে উপস্থিত হলেন৷ এবং তাঁদের সকলকে প্রণাম করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন৷ প্রত্যেকেই তাঁকে আশীর্বাদ করলেন এবং তাঁদের জয় কামনা করলেন৷ পিতামহ ভীষ্ম আশীর্বাদ করে বললেন৷
“অর্য্যস্য পুরাষো দাসো দাসত্বৰ্যোন কস্যাচিৎ।
ইতি সত্যং মহারাজ বদ্ধো স্ম্যর্থেন কৌরবৈঃ”।।
এরপর যুধিষ্টির কুরুসৈন্যদের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে বললেন যে বা যারা তাঁদের পক্ষে যোগদান করতে ইচ্ছুক, তাঁদের তিনি মুক্তকণ্ঠে স্বাগত জানাচ্ছেন৷ এর ফলে ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসজাত ও তাঁর রক্ষিতার গর্ভজাত পুত্র এবং দুর্যোধনের ১০১তম ভ্রাতা যুযুৎসু তাঁর দলবল নিয়ে পাণ্ডবপক্ষে যোগদান করলেন৷ এই যুদ্ধে দুর্যোধন ও দুঃশাসন সহ নিরানব্বই জন ভাইকে একাই সংহার করেছিলেন মধ্যম পাণ্ডব ভীম এবং শততম ভাই দুষ্মরণকে হত্যা করেছিল নকুলের পুত্র শতানিক। পান্ডবপক্ষে যোগদান করেছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলেন একমাত্র কৌরব ভ্রাতা যুযুৎসু পরবর্তীকালে পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদী-সহ যখন মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেছিলেন তখন অভিমুন্যর নাবালক পুত্র পরীক্ষিৎকে সিংহাসনে বসিয়ে, যুযুৎসু উপর পরীক্ষিৎ ও হস্তিনাপুর সহ সমস্ত রাজ্যের দেখাশোনার ভার দিয়ে গিয়েছিলেন৷
ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের কার্যাবলী সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. বিমান চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর গ্রন্থে যে মন্তব্য করেছেন, সেটই এখানে উল্লেখ করা হল৷ “কৃষ্ণের চরিত্র ও কার্যাবলির ব্যাপারে দুটি পরস্পর বিরোধী মত পরিলক্ষিত হয়৷ Weber, Winternitz প্রমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ মনে করেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পরাজয়ের মূল কারণ হল, পাণ্ডবদের বিশ্বাসঘাতকতা ও অধর্ম যুদ্ধ এবং কৃষ্ণই পাণ্ডবদের সকল দুর্নীতিতে সাহায্য, করেছিলেন এবং উৎসাহও দিয়েছিলেন৷ তাঁদের মতে ‘মূল মহাভারতের কৃষ্ণ একজন যোদ্ধা মহাবীর বিচক্ষণ রাজনীতিক, কূটকৌশলী৷ ভগবানের অবতার রূপে তিনি সেখানে কীর্তিত হন নাই, বরং ছলে বলে কৌশলে যুদ্ধ জয় করার নীতিতেই তিনি পাণ্ডবগণকে দীক্ষিত করেছিলেন৷ কৌরব রাজবংশের হাত থেকে রাজশক্তি পাণ্ডব বংশে হস্তান্তরিত করার জন্য পাণ্ডবদের সমস্ত অন্যায়ের সমর্থন কল্পে কৃষ্ণকে দেবতা রুপে তুলে ধরা হয়েছে ।
এছাড়াও বহু গবেষক বিভিন্ন আঙ্গিকে মহাভারতকে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁদের গবেষণালব্ধ মতবাদ লিখে গিয়েছেন তাঁদের সেই মতবাদের উপর ভিত্তি করেই এই প্রবন্ধে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ভুমিকার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
১. ইরাবানের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও শ্রীকৃষ্ণ তাকে অষ্টম দিনের যুদ্ধে রক্ষা করলেন না কেন?
অর্জুনপুত্র ইরবান সৈন্য সামন্ত সহ ভয়ংকর যুদ্ধে কৌরব সৈন্য গনকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করতে লাগলেন । দুর্যোধনের মামা শকুনি ও তাঁর অন্যান্য ভাইয়েরা একযোগে আক্রমণ করেও তাঁকে পরাজিত করতে পারছিলেন না। তাই দেখে দুর্যোধন আর্জশৃঙ্গ নামে এক মায়াবী রাক্ষসকে পাঠালেন ইরাবানের সাথে যুদ্ধ করতে৷ সেই রাক্ষসের মায়াজালে ইরাবান বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল এবং আর্জশৃঙ্গের তরবারির আঘাতেই ইরাবানের মৃত্যু হল।।
শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু জানতেন যে মায়াবী রাক্ষস আর্জশৃঙ্গের সাথে যুদ্ধে ইরাবানের মৃত্যু নিশ্চিত৷ তবুও কৃষ্ণ তাকে রক্ষা করলেন না৷ কারণ পঞ্চপাণ্ডবের পরে অর্জুনের পুত্র হিসাবে হস্তিনাপুরের সিংহাসনের সেও একজন দাবিদার৷ কিন্তু পঞ্চপাণ্ডবদের অন্যান্য সন্তানেরা তার কর্তৃত্ব মেনে নেবেনা কারণ সে নাগরাজ্য থেকে এসেছে। সুতরাং তাকে সরানো খুবই জরুরী ।
২. ঘটোৎকচের মৃত্যুতে শ্রীকৃষ্ণ খুশি হয়েছিলেন কেন?
“The official answer is this when Ghatothkacha was killed by karna using the weapon called ‘Indra’s shakti’ Krishna Celebrates because he knows that karna was planning to use that deadly weapon against Arjunna & now he can not Mahabharata that you can peel like an onion to expose so many layers of complexity that you will find” — By Ajit Narayan, A prof of Hindu Philosophy.
ঘটনাটা সত্যি কর্ণের হাতে মধ্যম পাণ্ডব ভীমের রাক্ষসপুত্র ঘটোৎকচের মৃত্যুতে প্রিয় সখা অর্জুনের প্রানহানির শঙ্কা দূর হল যেমন একটা কারণ৷ তেমনই অন্য কারণ হল পঞ্চপাণ্ডবদের সন্তানদের মধ্যে ঘটোৎকচ্ সবার বড় হলেও সে ছিল আধা রাক্ষস ও আধা মানব৷ তাই পাণ্ডবদের উত্তরাধিকারী হিসেবে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসলে তাকে রাজা হিসেবে অন্যান্য পাণ্ডব সন্তানরা মেনে নেবেনা তাই ঘটোৎকচেরও পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়াটা জরুরী ছিল।
৩. ঘটোৎকচ তনয় বারবারিককে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যোগদানের পূর্বেই শ্রীকৃষ্ণের ছলনায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হল কেন?
ভীমের পৌত্র বারবারিক অতি অল্প বয়সেই অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিল৷ তার প্রথম অস্ত্রগুরু ছিলেন তাঁর মা। এরপর কঠোর তপস্যার দ্বারা মহাদেব কে তুষ্ট করে মাত্র তিনটি ভয়ানক শক্তিশালী অস্ত্র লাভ করে ছিল৷
ক) প্রথম অস্ত্রে বারবারিক যা কিছু ধ্বংস করতে চাইবে নিশ্চিত ভাবে সেটাই হবে৷
খ) দ্বিতীয় অস্ত্রে যে সমস্ত প্রাণী বা মনুষ্য অথবা সম্পত্তি যা সে রক্ষা করতে চাইবে সেগুলি রক্ষা পাবে৷
গ) তৃতীয় ও মোক্ষম অস্ত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় অস্ত্র দ্বারা যেগুলি ধ্বংস হয়নি সেগুলি সব ধ্বংস হবে৷
বারবারিকের পরাক্রম কৃষ্ণের আগোচরে ছিলনা। বারবারিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করার সময় তার ইচ্ছার কথা মাকে জানিয়েছিল, যে পক্ষকে দুর্বল মনে হবে বা হেরে যাচ্ছে বলে মনে হবে তাহলে সেই পক্ষের হয়েই যুদ্ধ করবে৷ শ্রীকৃষ্ণ আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন যুদ্ধে কৌরব পক্ষকে যেভাবেই হোক পরাজিত করতে হবে৷ সেক্ষেত্রে বারবারিকের কৌরবপক্ষের হয়ে যুদ্ধ করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল এবং কৌরবদের হয়ে যুদ্ধ করলে কৌরবদের জয় সুনিশ্চিত৷ অতএব শ্রীকৃষ্ণ ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাকে এমনই বশীভূত করলেন যে বারাবারিক স্বেচ্ছায় নিজের শির কৃষ্ণকে উপহার দিল৷ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এক ঢিলে দুই পাখী মারলেন৷ একদিকে ভীমের ঔরসজাত রাক্ষস বংশের বিনাশ হল এবং পাণ্ডবত্তোর প্রজন্মে সিংহাসনের একজন দাবিদারের সংখ্যা হ্রাস পেল৷
৪. চক্রব্যুহে প্রবেশ করলে অভিমন্যুর মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও শ্রীকৃষ্ণ কেন নিজের প্রিয় ভাগ্নাকে চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে নিষেধ করলেন না?
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ত্রয়োদশ দিনের দিন অভিমন্যুর মৃত্যু হয়েছিল৷ কৌরব পক্ষের দ্রোণাচার্য দুর্ভেদ্য চক্রব্যুহে তৈরী করেছিলেন দুর্যোধন দুঃশাসন, শল্য, শকুনি, ভুরিশ্রবা এবং জয়দ্রথকে সঙ্গে নিয়ে, জয়দ্রথ ছিলেন দুর্যোধনের একমাত্র বোনের স্বামী৷ চক্রব্যুহে চক্রাকারে সৈন্য সাজানো থাকে এবং তাতে প্রবেশ করার জন্য একটি মাত্র পথ খোলা থাকে৷ অভিমন্যু চক্রব্যুহে প্রবেশের উপায় জানতেন কিন্তু কিভাবে বেরিয়ে আসতে হবে সেই কৌশল জানতেন না৷ সেটা শ্ৰীকৃষ্ণ জানতেন তবুও কেন এই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর হাত থেকে নিজের প্রিয় ভাগ্নেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন না৷ মাত্র ১৬ বছর বয়সেই যুদ্ধক্ষেত্রে বীরগতি লাভ করেছিলেন অভিমন্যু৷ এর পিছনে শ্রীকৃষ্ণের কোন উদ্দেশ্য পূর্ণ হল৷ গবেষকরা এর উত্তর দিয়েছেন৷ পাণ্ডবদের অন্যান্য সন্তানদের মধ্যে (দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তান এবং পাণ্ডবদের অন্যান্য পত্নীদের সন্তানেরা) সব চাইতে ছোট ছিলেন অভিমন্যু। পাণ্ডবদের অন্যান্য চার ভাইদের যেমন অগ্রজ যুধিষ্টিরের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে৷ কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের ভিতর সেই ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আনুগত্যের যথেষ্ট অভাব ছিল৷ সেটাও শ্রীকৃষ্ণ জানতেন এবং এটাও জানতেন সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতাকে অন্যান্য পাণ্ডবপুত্ররা সিংহাসনের দাবীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেবেনা৷ সিংহাসন নিয়ে বিরোধ এড়াতেই তিনি একে একে ঘটোৎকচ, ইরাবান এবং নিজের প্রাণাধিক প্রিয় ভাগ্নে অভিমন্যু কেও বলি দিলেন সুচতুর ভাবে৷ অথচ অশ্বাত্থমার নিক্ষিপ্ত ব্রহ্মাস্ত্রে উত্তরার (অভিমন্যুর পত্নী) গর্ভপাত হলেও সেই ভ্রূনের প্রাণসঞ্চার করেছিলেন কৃষ্ণ নিজেই৷ এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি পাণ্ডবদের পরে সিংহাসনের একমাত্র দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন অভিমন্যুর সন্তান পরীক্ষীৎ, সেই সাথে হস্তিনাপুরের সিংহাসন থাকবে প্রিয় সখা অর্জুণ ও প্রিয় ভগ্নী সুভদ্রার বংশধরের হাতেই।
৫. অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধ শেষে দৌপদী সহ পঞ্চপাণ্ডবকে কৌরব পক্ষের ফাঁকা শিবিরে নিয়ে চলে গেলেন অথচ পাণ্ডব পুত্রদের শিবিরে থাকতে বললেন কেন?
অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধ শেষ, একে একে নিহত হয়েছেন, দ্রোণাচার্য্য, কর্ণ, শকুনি সহ দুর্যোধনের একশ ভ্রাতা৷ কৌরব বংশে বাতি দেবার মতন আর কেউই নেই৷ পাণ্ডব শিবিরে যুদ্ধ জয়ের উল্লাস৷ মহারথী পিতামহ ভীষ্ম যুদ্ধক্ষেত্রের একপাশে একান্তে শরশয্যায় শায়িত৷ এমতাব্যস্থায় দূরদর্শী কৃষ্ণ দৌপদী সহ পঞ্চপাণ্ডবকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন কৌরবদের ফাঁকা শিবিরে৷ যদিও তিনি আগাম আভাষ পেয়েছিলেন, কৌরব পক্ষে এখনও জীবিত আছে দ্রোণপুত্র বীর অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা। রাতের অন্ধকারে গেরিলা কায়দায় পাণ্ডব শিবিরে হামলা হতে পারে৷ তবুও দৌপদীর পাঁচপুত্র ও পাণ্ডবদের অন্যান্য জীবিত সন্তানদের এবং দৌপদীর দুইভাই ধৃষ্টদ্যুম্ম ও শিখণ্ডীকে পাণ্ডব শিবিরে থাকতে নির্দেশ দিলেন৷ আর সেই রাত্রিতেই গেরিলা কায়দায় হামলা হল অশ্বত্থমার নেতৃত্ব। একে একে নিহত হলেন দৌপদীর পাঁচপুত্র সহ অন্যান্য সন্তানেরা ধৃষ্টদ্যুম্ম, শিখণ্ডী সহ সমস্ত বীর যোদ্ধারা।
অর্থাৎ পাণ্ডবত্তোর প্রজন্মে সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে থাকল প্রিয় সখা অর্জুন ও প্রিয় ভগ্নী সুভদ্রার বংশধর পরীক্ষিৎ। পূর্ণ হল শ্রীকৃষ্ণের যাবতীয় অভিলাষ৷
অর্থাৎ
১) পাণ্ডবদের জয় এবং হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসবেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির।
২) প্রিয় সখা তথা ভগ্নীপতি অর্জুনকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করা।
৩) পাণ্ডবত্তোর প্রজন্মেও হস্তিনাপুরের সিংহাসন অর্জুনের বংশধরদের হাতেই থাকবে৷ তাই প্রয়োজনে কখনও নির্দয় ও নির্মম হতে হয়েছিল তাঁকে৷
তথ্য সূত্রঃ
১) সংক্ষিপ্ত মহাভারত – গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর
২) What was the role of Lord Krishna in the war of Mahabharata? By Nataraj, A Software Engineer of cisco.
৩) Why did Krishna celebrate when Ghatohkoch was Killed? By Ajit Narayan, A prof of Hindu Philosophy.
৪) সংস্কৃত সাহিত্যের রূপরেখা – By Dr. Biman Ch. Bhattacharya.
৫) সম্পূর্ণ মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ