গত কয়েক মাসে করোনা-ভাইরাসের দৌরাত্ম্যে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। চীন থেকে এই ভাইরাসটি একে একে পৃথিবীর নানা দেশে, পশ্চিম ইয়োরপের ইটালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ইরান, স্পেন, ইংলন্ড হয়ে আমেরিকা, কানাডা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর প্রায় ১৫ লক্ষর ওপর লোক আক্রান্ত, প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভারতবর্ষে এই ভাইরাসটি আসতে একটু দেরি হয়েছে—তা সত্ত্বেও ইতিমধ্যেই নানা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসটি এদেশে এসেছে—মূলত বিদেশ থেকে আসা, ভাইরাস সংক্রমিত যাত্রীদের মারফত। সোজাসুজি বিদেশ থেকে এ দেশের যে শহরগুলিতে মানুষজন এসেছেন—তাঁদের দ্বারা সংক্রমণ শুরু হয়েছে—অর্থাৎ দিল্লী, বম্বে, কলকাতায়—এবং অন্যান্য সংযুক্ত শহরগুলিতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
৩০ জানুয়ারি প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে ভারতের মাটিতে। আজ প্রায় ৯ সপ্তাহ হল এবং তা এসেছে বিমানবাহী হয়ে। পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক সেভাবেই কলকাতা এয়ারপোর্ট দিয়ে করোনা সংক্রমিত যাত্রীদের দ্বারা করোনা ভাইরাসের প্রবেশ ঘটে। বিষয়টি আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে বিচলিত করে। উনি কেন্দ্রীয় সরকারকে এ বিষয় অনুরোধ করেন যাতে সমস্ত বিমানের ওঠানামা বন্ধ হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় তা বন্ধ হল। তবে ইতিমধ্যেই যে সব বিদেশ থেকে আসা মানুষজন কলকাতায় এসেছেন, সোজাসুজি, কিংবা দিল্লী-বম্বে হয়ে তারা এখানকার মানুষজনকে সংক্রমিত করতে শুরু করে। আমরা জানি যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকে রোধ করা না গেলে তা ক্রমশঃ খুব অল্প সময়ের মধ্যে multiplied হতে হতে সমস্ত জনসাধারণকে রোগাক্রান্ত করে ফেলবে। ফলে জনজীবনে সামাজিকভাবে অদ্ভূত বিপর্যয় শুরু হবে। রোগটি তীব্রভাবে ছোঁয়াচে। একটু অবহেলা করলেই তা থেকে রেহাই নেই। ফলে অসংখ্য মানুষ একসঙ্গে অসুস্থ হলে, হাসপাতালে তাদের বেড তৈরী করা, ছোঁয়া থেকে ডাক্তার নার্সদের নিজেদের রক্ষা করে চলা, সাধারণ মানুষদের মধ্যে সংক্রমিত গোপন রোগাক্রান্তদেরকে চিহ্নিত করা—তার সাজ সরঞ্জাম, ওষুধ পত্র জোগাড় করা—সব মিলে একট অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরী হয়—তাকে সামাল দেওয়া সহজ কাজ নয়।
এই অবস্থায়, সদা সতর্ক এবং তৎপর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাল বিলম্ব না করে—বলা যেতে পারে—এই কঠিন পরিস্থিততে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে এলেন। বলতেই হয়, তা যেন পরিবারের একজন কর্ত্রী বা মায়ের মতো। পশ্চিমবঙ্গের সকল মানুষের জন্য যা কিছু করণীয় তার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রাজ্যবাসীর প্রতি ক্রমাগত আবেদন করতে লাগলেন, কীভাবে এই রোগটিকে তাঁরা মোকাবেলা করবেন। তাঁদের অভয়বাণী দিচ্ছেন। আতঙ্কিত হবেনা না, সাবধানে থাকবেন। কীভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন। বাজারের তৈরী মাস্ক না পেলে কীভাবে শুধু কাপড় বা রুমাল জড়িয়ে সংক্রমণ এড়াতে হবে। ঘন ঘন প্রশাসনিক বৈঠক ডাকলেন, ডাক্তার প্রশাসনিক লোকজন, এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে আলোচনা করলেন। যখন লকডাউন হল—তখন দোকান বাজারের সামনে ভিড় না করে সোশ্যাল ডিসটেন্স বজায় রেখে কিভাবে দূরত্ব রেখে দাঁড়াতে হবে তার জন্য নিজে গিয়ে রাস্তায় খড়ির গণ্ডি কেটে দেখাচ্ছেন। এই সব কিছুই রাজ্যবাসীর জন্য শুভকামনা করে তাদের সুরক্ষার কথা ভেবে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা। মমতা শাসন ব্যবস্থায় আসার পর রাজ্যের হাসপাতালগুলির প্রভূত উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। অনেক নতুন হাসপাতাল হয়েছে জেলায় জেলায়। তা সত্ত্বেও মেডিক্যাল কলেজকে দ্রুত উন্নীত করলেন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল হিসেবে। দেখছিলাম, রোদের মধ্যে সমস্ত হাসপাতালগুলোতে ঘুরে ঘুরে দেখে আসছেন। একজন মুখ্যমন্ত্রী যে এভাবে দিনরাত্রি পরিশ্রম করে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কী করে তার রাজ্যের মানুষদের এই অবস্থা থেকে সুস্থ রাখবেন, ভাল রাখবেন, এ না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পাশাপাশি এ বিষয়টাতেও তিনি সতর্ক যে করোনা ভাইরাসের থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে যে লকডাউন দীর্ঘ দিন ধরে চলছে ভবিষ্যতেও চলবে, ফলে সাধারণ মানুষ, গ্রামের মানুষ, ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন—তাঁদের অর্থকরী সুরাহা দেবার জন্য তাঁদের সকলকে ৬ মাস ধরে বিনামূল্যে রেশন দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কলকারখানা বন্ধ, বেকারী-সম্ভাবনা রয়েছে—সে বিষয়ে কীভাবে তার মোকাবেলা করা যায়—তার জন্য মমতা, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, একটি Global Advisory Board গঠন করেছেন। তার শীর্ষে থাকছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি।

এতকিছু বলার দরকার এই কারণেই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত একজন মুখ্যমন্ত্রী পেয়েছি বলেই, আজকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যবাসী অনেকটাই তাঁর সচেতন, কঠোর পরিশ্রম ও সুচিন্তিত কর্মকাণ্ডের ফলে করোনা ভাইরাস ঘটিত বিপর্যয় থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত আছে—আশা করি—তাঁর আন্তরিক চেষ্টা ও সুসংগঠিত কর্মকাণ্ডের ফলে শেষ পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। আজকের হিসেব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সংখ্যা ৮৯। সেরে উঠেছেন ১৬ জন এবং মৃত ৫ জন, যা অন্যান্য কয়েকটি প্রদেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, অনেক কম।
এখানে একটি কথা বলা যেতে পারে—সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার তার নীতি করোনাভাইরাস ও সংক্রমণ চিকিৎসা বিষয়ে সকল রাজ্যকেই নির্দেশ পাঠাচ্ছে। সেই নির্দেশ কার্যকরী করবে—রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় সরকার সে ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত নয়। আজ পশ্চিমবঙ্গ মমতার তৎপরতা ও কর্মনিষ্ঠার জন্য করোনা ভাইরাসের বিপর্যয়কে দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করতে পেরেছে। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকাতে যদি কাজ হতো তা হলে সমস্ত রাজ্যগুলিই বিপর্যয়কে ঠেকাতে পারতো। বাস্তবে তা হয়নি। যেহেতু এ কাজটি বাস্তবিক রাজ্যের মানুষের কাছাকাছি যে সরকার—অর্থাৎ রাজ্য সরকার এবং যে রাজ্য সরকার আন্তরিক ভাবে কাজ করে, তারাই এই কাজটি সার্থক ভাবে করতে সমর্থ হয়। আমরা এ কথা মেনে নিতে পারি যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা তার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিক চেষ্টা ও পরিশ্রমই পশ্চিমবঙ্গবাসীকে বর্তমান বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। আজ এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে আজ মমতা না থাকলে আমাদের সমূহ বিপদ ও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হত। তাঁকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাই। এই সঙ্গে অনুরোধ করবো—এই সময়ে নিজেকে সুরক্ষিত করে চলতে হবে—শুধু নিজের জন্য নয় দেশের কথা ভেবে।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা দরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দীর্ঘ দিন ধরে আর্থিক দিক থেকে জর্জরিত। কেন্দ্রের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া প্রাপ্য অর্থ এবং একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস-এর প্রতিরোধের জন্য যে হাজার কোটি টাকার তহবিল সৃটি করেছেন—তার থেকে প্রাপ্য অংশ পশ্চিমবঙ্গকে এই সময় পাঠান তাহলে বাস্তবিকভাবে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সমস্ত কাজে তা ব্যবহৃত হতে পারে। কারণ মানুষের কাছাকাছি যে সরকার অর্থাৎ রাজ্য সরকারগুলিই—এই সমস্যাকে বাস্তবিকভাবে সোজাসুজি মোকাবেলা করে—তারাই এই সমস্যাকে সমাধান করবে এবং তার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ প্রয়োজন।